তা তাজ্জব হবারই কথা। সেখানে আর কাউকে নয়, আমাকেই বসে থাকতে দেখার কথা তারা কল্পনাও করেনি।
তুমি—তুমি—কার্ভালো প্রায় তোতলা হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল।
হ্যাঁ, আমি, আমি একটু হেসে বলেছিলাম, অশরীরী ছায়াটায়া নয়, একেবারে সশরীর হাজির। আর তাও বেশ অনেকক্ষণ থেকে আছি। আর তাই আছি বলেই তোমাদের পরামর্শটা জেনে গোলমেলে প্রশ্ন এড়াবার বুদ্ধিটার তারিফ করছি।
তারিফ করছ আমাদের বুদ্ধির? গোরিলা কার্ভালোর মাথায় কথাটা যেন ঠিক ঢুকছে না।
কী জন্য তারিফ করছ? শুঁটকো ডুগানের এবার কড়া গলায় সোজাসুজি প্রশ্ন, কী জানো আমাদের পরামর্শের?
তোমরা যা বলেছ, তার বেশি আর কী করে জানব? যে সোফাটায় বসে ছিলাম, তার একটা পায়ার পেছন থেকে কিছু একটা প্যাঁচ দিয়ে খুলতে খুলতে আমি বললাম, মক্কেলদের বেয়াড়া প্রশ্ন এড়াবার জন্য ভারতীয় জ্যোতিষ-গণনা কঠিন বলে যে দোহাই পাড়ার কথা তোমরা বলাবলি করেছিলে, সেইটে শুনেই তোমাদের বুদ্ধির প্রশংসার কথা মনে হয়েছিল। আর—
আমার কথার মধ্যেই থামিয়ে দিয়ে যেমন উত্তেজিত, তেমনই কেমন-একটু হতভম্বভাবে কার্ভালো বললে, কিন্তু আমাদের কথা তুমি শুনলে কী করে? তখন এখানে আমরা দুজন ছাড়া আর কেউ তো ছিল না!
তা ছিল না বটে, আমি যেন বাধ্য হয়ে স্বীকার করলাম।
তবে? প্রায় গর্জন করে উঠল কার্ভালো, আমাদের পরামর্শের কথা তুই—
আপনি তো নয়ই, সম্বোধন তুমি থেকে তুই-এ নামাতে কার্ভালোর গায়ের জ্বালা কত সেলসিয়াসে পৌঁছেছে তা বোঝা গেল। তার কথার মাঝখানে তাই বাধা দিয়ে বললাম, সাবধান! সাবধান! হঠাৎ অত গরম হয়ে উঠলে স্ট্রোক হয়ে যেতে পারে। তোমাদের কাছে যা ধাঁধা, তার উত্তরটা তাই শুনিয়ে দিচ্ছি। আমি নিজে সশরীর এখানে উপস্থিত না থাকলেও না, আমার আত্মাটাত্মা নয়, আমার প্রতিনিধিস্বরূপ এই যন্ত্রটা এখানেই সোফার পায়ার পেছনে লুকিয়ে লাগানো ছিল। দেখতে খুদে হলে কী হয়, এই রেকর্ডার যন্ত্রটা দারুণ কাজের। তোমাদের সব কথা তাই স্পষ্ট করে ধরে রেখেছে।
ধীরে বন্ধু, ধীরে! কার্ভালো আবার লাফিয়ে ওঠার উপক্রম করতেই তাকে একটু ঠেলা দিয়ে তার আসনে বসিয়ে দিয়ে বললাম, এ যন্ত্র এখানে কেমন করে এল, এই তো জানতে চাও? বলছি, শোনো। না, কোনও ভোজবাজিতে এটা এখানে আসেনি। আমিই ওটা এখানে লাগিয়ে রেখেছিলাম। কখন লাগিয়ে রেখেছিলাম? তোমরা এখানে এসে এ বাসার চাবি খুলে ভেতরে ঢুকে সব দেখেশুনে নিয়ে একবার কিছুক্ষণের জন্য দরজার ল্যাচ-কি লাগিয়ে বাইরে গেছলে। আমি সেই সুযোগেই এসে এটা লাগিয়ে রেখে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি ঠিক সেই সময়ে এখানে এলাম কী করে, এই ধাঁধাটার উত্তর পাচ্ছ না, কেমন? উত্তর শুনতে হলে একটু ধৈর্য ধরে খানিকক্ষণ শুনতে হবে। হ্যাঁ, ট্রেনের কামরায় আমার গর্দানে গোরিলা কার্ভালো যখন একটা রামরদ্দা চালায়, সেই তখন থেকে যা হয়েছে সব।
মোক্ষম রদ্দাই চালিয়েছিলে বটে তুমি, মানে গোরিলা কার্ভালো। ও রদ্দা খেয়ে আমার সত্যিই বেহুঁশ হবার কথা। কিন্তু তা যে আমি হইনি, তার কারণ তোমাদের মতো পেঁচি বদমাশদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। তাই তোমাদের সঙ্গে আলাপ চালাতে-চালাতে চোরা নজরটা আমি ঠিকই রেখেছিলাম তোমাদের ওপর। মাথায় রামটুসকির ধাক্কা সামলে উঠে আর-একটা রামরদ্দা পাড়বার জন্য মুঠো পাকানো থেকে হাত চালানো পর্যন্ত সবই আমি সজ্ঞানে ঘটতে দিয়েছি। রদ্দাটাকে এমন তাল মিলিয়ে ঘাড়ের ওপর নিয়েছি যে, মনে হয়েছে, তাইতেই আমি কাত আর বেহুশ হয়ে গেলাম। গোরিলা কার্ভালোর অবশ্য আর-একটা রদ্দা দিয়ে জখমটা পাকা করবার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু কার্ভালো তা করতে গেলে ওকে একটু শিক্ষা দিয়ে আমার খেলাটা অন্যভাবে সাজাতে হত। তোমার, মানে শুঁটকো ডুগানের সুপরামর্শে তার অবশ্য দরকার হয়নি।
আমার পকেট-টকেট থেকে যা হাতড়াবার হাতড়ে আমায় বাঁধাছাঁদা করে, মুখে রুমাল গুঁজে বোবা করবার ব্যবস্থার মধ্যে ট্রেনটা মিনিট খানেকের জন্য একটা স্টেশনে থেমেছিল। এইটাই একটা পরম সুযোগ মনে করে প্রথমে আমায় নির্জন প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে দিয়ে যাওয়ার মতলব করে পরে আবার তা পালটে প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকের থেমে থাকা একটা উলটোমুখো মালগাড়ির একটা ফাঁকা কোচে ফেলে দিয়ে আসার ব্যবস্থা করেছিলে। কিন্তু ধর্মের কল সত্যিই কখনও বাতাসে নড়ে। তোমাদের দেখা উলটোমুখো মালগাড়ি আমার খাতিরে সোজামুখো হয়ে গিয়েছিল খানিকবাদে। ইঞ্জিনটা মালগাড়ির মাথার থেকে সেটাকে সামনে টেনে নিয়ে যাওয়ার বদলে সেটা পিছন দিক থেকে গাড়িটাকে ঠেলে ইনভারনেস স্টেশনের মাল খালাসের রেলইয়ার্ডে পৌঁছে দিয়েছে।
পৌঁছে দিয়েছে রেল কোম্পানিরই নিজেদের দরকারে নিশ্চয়, পৌঁছেছে তোমাদের প্যাসেঞ্জার ট্রেনের অনেক পরে। কিন্তু তাতে আমার লাভই হয়েছে। যে খোলা-দরজার মালগাড়িটায় আমায় পুঁটলির মতো বেঁধে ফেলে আসার বন্দোবস্ত করেছিলে, তাতে তোমাদের গাড়ি ছাড়বার প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই আমি আমার হাত-পায়ের বাঁধন খুলে ফেলে উঠে বসেছিলাম। ইচ্ছে করলে মালগাড়িটা থেকে নেমে একটা ছুট দিয়ে তোমাদের গাড়িটার পেছনের কোনও কামরায় উঠতেও হয়তো পারতাম, কিন্তু সে চেষ্টা করিনি।
তার বদলে বেশ একটু দেরিতে স্টেশনের যাত্রীদের প্ল্যাটফর্মে নয়, মাল খালাসের গুডস ইয়ার্ডের এক জায়গায় ধীরেসুস্থে নেমে সেখান থেকে শহরে বেরিয়ে এসে তোমাদের খোঁজ করাটা সহজই হয়েছে।
