কার্ভালোর এই হুকুম তামিল করতে দেরি হল না। প্ল্যাটফর্মের ওদিক থেকে কাজ সেরে আসতে আসতেই তাদের গাড়িটা ছেড়ে দিলেও, ছুটে এসে নিজেদের কামরায় উঠতে তার অসুবিধে হল না। শাবাশ! বলে তাকে তারিফ জানিয়ে ডুগান বললে, যাক, এখন হপ্তাখানেকের জন্য অন্তত নিশ্চিন্ত থাকব বলতে পারি। দু-চার ঘণ্টা বাদে জ্ঞান যদি হয়ও, কোথায় গিয়ে যে হতভাগা জাগবে তার কোনও ঠিক নেই।
০৬. চা এসে গিয়েছিল
চা এসে গিয়েছিল। ধীরেসুস্থে চা শেষ করে, সিগারেট ধরিয়ে, ঘনাদা ফের শুরু করলেন তাঁর গল্প: ভোর হবার পর ইনভারনেস স্টেশনে গিয়ে নামবার আগে ট্রেনের কামরায় আমার জামা আর প্যান্টের পকেট থেকে পাওয়া কাগজপত্র ইত্যাদি ঘাঁটাঘাঁটি করে নিয়ে তারা অন্য দু-চারটে দামি খবরাখবরের সঙ্গে মিসেস টডের দোকানের হদিস আর তাঁর কাছে আমার ভাড়া-নেওয়া কামরাটার ঠিকানা আর ল্যাচ-কি হাত করতে পেরেছে।
তারা তখনই মিসেস টডের দোকানে কি আমার ভাড়া-নেওয়া তাঁর বাড়ির কামরায় যায়নি। স্টেশনের একটি ওয়েটিংরুমেই সারারাত্রির ট্রেনযাত্রার পর একটু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে নিয়ে, শহরটায় একটু ঘুরে দরকারি ঠিকানাগুলো জেনে নিতে বেরিয়েছে।
আমার জামা ও প্যান্টের পকেট থেকে যেসব কাগজপত্র তারা বার করে নিয়েছিল, তার মধ্যে একটা বিশেষ আকর্ষণের ব্যাপার না থাকলে তারা হয়তো তখনকার মতো লন্ডনে ফিরে গিয়ে এখানকার বোঝাপড়ার জন্য একটু তৈরি হয়ে আসবারই চেষ্টা করত। কিন্তু সে সময় তখন তাদের নেই।
তাদের কাছে অমন বিশেষ আকর্ষণের ব্যাপারটা যে কী, তা বোধহয় বুঝিয়ে বলার দরকার নেই। হ্যাঁ, ভারতীয় জ্যোতিষী হিসেবে সংস্কৃত শ্লোক দিয়ে শুরু করা মিসেস টডের দোকানে রাখা আমার সেই রহস্য-সংকেতগুলি কিনে যারা পড়ে আমার সঙ্গে দেখা করবার দিনক্ষণ লিখিয়ে নিয়েছিল, সেই তিনজন অজানা রহস্য-সন্ধানীর সাক্ষাতের আশাটাই ছিল ডুগান ও কার্ভালোর কাছে দুনির্বার আকর্ষণ। ব্যাপারটা নেহাত হুজুগের প্রলোভনের চেয়ে বেশি কিছু যাতে হয়, তারই জন্য সংস্কৃত শ্লোক দেওয়া রহস্য-সংকেত আর তার দরুন সুবিধের জন্য দামটা ধরা ছিল প্রায় গলাকাটা। সংস্কৃত শ্লোক লেখা ভারতীয় জ্যোতিষের চিহ্ন আঁকা এক-একটা রহস্য-সংকেতলিপির দামই ধরা ছিল পাঁচ পাউন্ড করে। সেই রহস্য-সংকেত কেনবার পর তারই জোরে মূল যোগী-জ্যোতিষীর সঙ্গে দেখা করবার সুযোগ আর তার নির্দিষ্ট সময় স্থির করে জেনে নেবার জন্য আরও দশ পাউন্ড খরচ।
শতকরা নিরানব্বইজন যে ব্যাপারটা বুজরুকি আর ধাপ্পা বলে ধরে নিয়ে কাছে ঘেঁষবে না, তারই জন্য যে তিনজন নিজে থেকে অমনভাবে এগিয়ে এসেছে, তাদের মধ্যেই ধড়িবাজ চূড়ামণি, দুনিয়ার ফাটকাবাজারের বাজিকর ভোজরাজকে পাওয়া যাবে, আমার দেওয়া এই ইঙ্গিত শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালোর মনে বিশেষ করে ধরেছিল।
তাই লন্ডনে ফিরে না গিয়ে একটু বেলা হবার পর তারা প্রথমে মিসেস টডের দোকানটা সাধারণ খরিদ্দার হিসেবে একটু দেখে নিয়ে সেখান থেকে আমার ভাড়া করা বাসাটা খুঁজে বার করে আমার পকেট ঘেঁটে পাওয়া ল্যাচ-কি দিয়ে আমার কামরাটা খুলেছিল।
ছোট একটা বাসা। কিন্তু ব্যবস্থাটা তাদের পছন্দ হয়েছিল। ভারতীয় যোগী-জ্যোতিষীদের সঙ্গে দেখা করবার সুবিধের জন্য যে তিনজন অত চড়া দামের টিকিট কিনেছে, বিকেল তিনটে থেকে পাঁচটা পর্যন্ত পর পর তাদের আধ ঘণ্টা করে দেখা দেওয়া তো যাবেই, তারপর অবস্থাটা যেমন দাঁড়ায় সেই মতো এই কামরাটাই সেদিনকার রাতের মতো নিজেদের কাজে তারা ব্যবহার করবে।
কিন্তু মুশকিল হল একটা সমস্যা নিয়ে। গোরিলা কার্ভালো সেটা তুলে ভাবনায় ফেললে। কী এক বিদঘুটে হরফের ভারতীয় ভাষায় রহস্য-সংকেতের কাগজগুলোয় যা লেখা আছে তা-ই জানতে যারা আসছে তাদের কাছে তার কী ব্যাখ্যা তারা করবে? রহস্য-সংকেতের টিকিট নিয়ে যারা আসছে, তাদের মধ্যে নিজেদের শিকারকে খুঁজৈ বার করা তাদের আসল কাজ। কিন্তু সে-কাজ সারবার জন্যই পর পর এক-একজনকে ডেকে পাঠাতে হবে। উত্তরও দিতে হবে তাদের জিজ্ঞাসার। সে-জিজ্ঞাসা কী বিষয়ে হবে, তা তো বোঝাই যাচ্ছে। কিন্তু উত্তরটা কি তারা দিতে পারবে?
ঠিক আছে। শুঁটকো ডুগানই বুদ্ধিটা বাতলালে। আসছে তোত পরপর তিনজন। তাদের মধ্যে নিজেদের শিকারকে খুঁজে নেওয়াই হল ডুগান আর কার্ভালোর উদ্দেশ্য। যাকে তারা খুঁজছে, সেই ধুরন্ধর যদি প্রথমেই আসে তা হলে তোত সব সমস্যা ওখানেই মিটে যাবে। আসল মানুষটিকে কবজা করে বাকি দুজনকে তারা বিদায়ই করে দেবে সরাসরি। কিন্তু অত সুবিধে যদি না-ই হয়, তাতেই বা কী? টিকিট নিয়ে যারা আসছে, তাদেরও, আসল শিকার না হলে, দেখা করতে আসার আর-একটা দিনক্ষণ জানিয়ে দিলেই চলবে। বললেই হবে যে, ভারতীয় জ্যোতিষের গণনা বড় কঠিন। আরও কিছু সময় লাগবে তা শেষ করতে। সেই জন্য আর-একটা তারিখ মায় সময় ঠিক করে দেওয়া হচ্ছে।
নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা ঠিক করে নিয়ে দুজনে এর পর দুপুরের লাঞ্চ সেরে আসবার জন্য কিছুক্ষণের জন্যে বাইরের একটি রেস্তোরাঁয় গিয়েছিল।
ফিরে এসে অ্যাপার্টমেন্টের দরজা খোলা দেখে তারা অবাক। দরজা খোলা হলেও ভেজানো ছিল ভেতর থেকে। সে দরজায় ঠেলা দিয়ে খুলে তারা একেবারে তাজ্জব।
