মিসেস টড এই নতুন হুজুগের ঠিক জোয়ারের মুখে ইনভারনেসে ফিরে এসে নিজের সেকেলে বাড়ির ঘরটর একেলে বড় হোটেলের ভাড়ায় বিলি তো করেই দেন, সেই সঙ্গে তাঁর একটি বাড়ির নীচের তলার হলঘরে নেসি মিউজিয়াম নাম দিয়ে একটি দোকানও খুলেছেন এই অজানা জলার দানব সম্বন্ধে যা-কিছু বেচাকেনার জন্য। হ্যাঁ, প্রত্যক্ষদর্শীর নেসি সম্বন্ধে বিবরণ, তাদের ফ্ল্যাশ ক্যামেরায় তোলা নির্ভেজাল বলে দাবি করা নেসির যথার্থ ছবির প্যাকেট তো বটেই, নেসি সম্বন্ধে আরও যা-কিছু সম্ভব সবকিছু সেখানে যেমন পাওয়া যায়, তেমনই বিক্রিও করা যায় মিসেস টডের কাছে।
মিসেস টডের স্বামী এককালে ভারতবর্ষে চাকরি করতে গিয়েছিলেন। মিসেস টডও তখন ছিলেন তাঁর সঙ্গে। ভারতবর্ষে যে কবছর ছিলেন, তাতে মিসেস টডের মনে ভারতীয় সাধু-সন্ন্যাসী, জ্যোতিষীদের মতো মানুষদের সম্বন্ধে একটা গভীর কৌতূহল আর সম্ভ্রমের ভাব গড়ে উঠেছিল। দেশে ফিরে আসবার পরেও সে ভাবটা তাঁর মন থেকে দূর হয়ে যায়নি। আমি তাঁর বাড়ির একটা কামরা ভাড়া নেওয়ার সময় ভারতীয় বলে জেনে আমায় কটি বিশেষ সুযোগসুবিধে তো দিয়েছিলেনই, ভারতীয় যোগবিদ্যা আর জ্যোতিষ ইত্যাদি সম্বন্ধে তাঁর আগ্রহ আর অনুরাগের কথাও প্রকাশ না করে পারেননি। মিসেস টডের মনের ভাবটা জানা ছিল বলে দিন দুই ইনভারনেসে থাকার পরেই আমি তাঁর কাছে আমার প্রস্তাবটা জানাই। আর কিছু নয়, প্রস্তাবটা শুধু এই যে, তাঁর দোকানে অন্য অনেক কিছু যেমন বিক্রির জন্য রাখা আছে, তেমনই নেসি সম্বন্ধে আমার বিশেষ রহস্য-সংকেতও আমি রাখতে চাই। আমার সে জিনিসটি রাখবার জন্য আমি অবশ্য তিনি যত চান সেই দৈনিক ভাড়াই দেব। কিনতে চাওয়া খরিদ্দারদের জন্য আমার দেওয়া রহস্য-সংকেতের একটা দাম ঠিক করা থাকবে। কোনও খরিদ্দার সেই দাম দিয়ে সংকেতটি কিনলে মিসেস টড তাঁর প্রাপ্য দোকানভাড়া তা থেকে কেটে নিয়ে বাকিটা আমায় দেবেন, এই হল আমাদের মধ্যে চুক্তি। আমার রহস্য সংকেত বিক্রি না-ও হতে পারে বলে আমি হপ্তাখানেক তা দোকানে রাখবার ভাড়া মিসেস টডকে অগ্রিম দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তা নেননি।
আশ্চর্যের কথা এই যে, আমার রাখা তিন-তিনটি রহস্য-সংকেত দোকানে রাখবার পর দু-দিনের মধ্যে বিক্রি হয়ে যায়। যে তিনজন আমার দিয়ে রাখা-সংকেত প্রায় আকাশছোঁয়া চড়া দামে কিনে নিয়ে যায়, তাদের তিনজনকেই আমি মিসেস টডের অনুগ্রহে দোকানের মধ্যে অন্য জায়গা থেকে লক্ষ করবার সুযোগ পাই, এবং আমার ধারণা, অত্যন্ত নিপুণভাবে ছদ্ম চেহারায় সেজে এলেও তাদের মধ্যে আসল ধুরন্ধরকে চিনতে আমার ভুল হয়নি।
আমার রহস্য-সংকেত যারা কিনেছে, আর একদিন বাদে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাদের এক-একজনের আমার সঙ্গে একটি বিশেষ ঠিকানায় দেখা করবার কথা। ওই বিশেষ দেখা করবার ঠিকানাটা মিসেস টডের অনুগ্রহে পাওয়া গেছে। রহস্য-সংকেত আর যা ছিল, তা শুধু একটি সংস্কৃত শ্লোকের অংশ। আর তার চারপাশে জ্যোতিষের কয়েকটা চিহ্নের সঙ্গে একটা জিজ্ঞাসা। যেমন,
নেসির রহস্যভেদ করতে শুনুন:
প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসিবেদং
বিহিতবহিত্ৰচরিত্রমখেদম্…
গীতগোবিন্দর সংস্কৃত শ্লোকটার কিছুটা আবৃত্তি করবার পর শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালোকে বললাম, তোমাদের হয়ে যাকে খুঁজছিলাম, সেই ধুরন্ধরকে আমার এই নতুন প্যাঁচে ছাড়া ন-মাসে ছ মাসেও খুঁজে পেতাম কি না সন্দেহ। কিন্তু আমার এই ফন্দিতে আমার বদলে সে-ই যাতে আমায় খোঁজে তার ব্যবস্থা করে কাজটা অনেক সহজ করে ফেলেছি। রাত প্রায় ভোর হয়ে এসেছে। ইনভারনেসে পৌঁছতে আমাদের ঘণ্টা-দেড়েকের বেশি দেরি নেই। সেখানে পৌঁছে আমার বাসাতেই তোমাদের নিয়ে যাব, তারপর তৈরি হয়ে এক এক করে আমাদের তিন মক্কেলের সঙ্গে–
ব্যস, ওই পর্যন্ত বলার পর একেবারে বেহুশ হয়ে ট্রেনের কামরার সিটের ওপরেই লুটিয়ে পড়লাম।
শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালো এরপর যা করল এবার তা-ই বলি।
আমি কামরায় আসনের ওপর হাত-পা এলিয়ে পড়ে যাবার পরেই ডুগান আর কার্ভালো দুজনে চটপট উঠে দাঁড়িয়েছিল।
আমার দিকে চেয়ে কার্ভালো তার মুঠো করে ঘুসিটা আমার মাথার কাছে একটু নেড়ে বললে, দেব আর একটা ঘা?
না, তার দরকার হবে না মনে হচ্ছে, বলল শুঁটকো ডুগান, একটা মোক্ষম ঘায়েই যা ঘায়েল হয়েছে, দটোয় একেবারে কাবার না হয়ে যায়। এমনিতেই কাজ হাসিল হলে সে-সব হাঙ্গামায় যাওয়ার দরকার কী? এখন চটপট হাত-পাগুলো বেঁধে মুখে রুমাল গুঁজে দাও দিকি। পকেটগুলো হাতড়ে যা পাও তা আগে বার করে নিতে অবশ্য ভুলো না।
ডুগানের নির্দেশমতো কার্ভালোর কাজ সারবার মধ্যে ট্রেনটা একটা স্টেশনে একটু থামে।
তখন প্রায় শেষ রাত। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটা আলোয় ঝলমল করলেও একেবারে নির্জন।
স্টেশনে থামবার আগে গাড়িটার গতিবেগ একটু কমতে দেখেই বুদ্ধিটা শুঁটকো ডুগানের মাথায় আসে নিশ্চয়। তাদের গাড়িটা থামবার সঙ্গে সঙ্গেই বাইরের দরজাটা খুলে ফেলে সে বলে, শিগগির ওর হাত-পা বাঁধা, মুখে রুমাল-গোঁজা পোঁটলাটা দাও এই প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে।
গোরিলা কার্ভালো তাই যখন করতে যাচ্ছে, তখন শুঁটকো ডুগানের মাথায় আরও ভাল একটা বুদ্ধি আসে। আলোয় ঝলমল অথচ একেবারে নির্জন প্ল্যাটফর্মের অন্য দিকে একটা মালগাড়ি দাঁড়িয়ে। এ-প্ল্যাটফর্মের দিকে আসার পথেই ওদিকের মালগাড়ির ইঞ্জিনটা দেখা গেল বলেই, সেটা যে উলটো মুখে যাচ্ছে তা বোঝা গেছল নিশ্চয়। ডুগান তাই আবার মতটা পালটে ব্যস্ত হয়ে হুকুম দিলে, না, প্ল্যাটফর্মে নয়। ওধারের মালগাড়িটার প্রায় সব কোচগুলোই খালি মনে হচ্ছে। ওর একটায় ওটাকে ফেলে এসো।
