বৈজ্ঞানিক মহল কিন্তু তখন আর ঘুমিয়ে নেই। যেমন-তেমন নয়, লন্ডন সান-এর মতো পত্রিকা একটু বাড়াবাড়ি করেই লিখল যে, বোস্টনের বৈজ্ঞানিক সন্ধানী দল লকনেসের রহস্য-দানবের যে খবর ও ছবিটবি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছে, তা চার্লস ডারউইনের বিবর্তনবাদের সূত্র আবিষ্কারের মতোই। যুগান্তকারী। এই যুগান্তকারী আবিষ্কারের সন্দেহাতীত সম্পূর্ণ সাক্ষ্য-প্রমাণ কবে পাওয়া যাবে, এই প্রশ্নের উত্তর জানার জন্য যেমন সাধারণ মানুষ, তেমনই বৈজ্ঞানিকেরাও উৎসুক হয়ে আছেন। চেষ্টায় তাঁদের ত্রুটি নেই। কোন দিক দিয়ে এই রহস্যভেদের চেষ্টা কে করছেন তা অবশ্য সম্পূর্ণ গোপনই রাখা হচ্ছে। আসল খবর খুব বেশি না বার হলেও একটা তীব্র উত্তেজনার বিদাৎ-স্পন্দন যেন ছড়াচ্ছে। চারদিকে।
এই পর্যন্ত বলে ছোট কং ও তার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে হেসে বললাম, মধ্যোপসাগরের সেই ছোট্ট দ্বীপে তোমাদের কাছে দুনিয়ার ফাটকাবাজার ওলটপালট করা সেই এক ধুরন্ধর ধড়িবাজ চূড়ামণিকে ধরবার ফরমাশ পেয়ে এদিকে ওদিকে একটু ঘুরে ফিরে বিলেতে হিথরোতে এসে নামবার পরই এয়ারপোের্ট থেকে আমি বুঝতে পারি যে, আমার খোঁজাখুঁজির দায় প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।
০৫. মানুষকে চিনতে হয় চরিত্র দেখে
একটু থেমে থেকে ঘনাদা বললেন, মানুষকে চিনতে হয় চরিত্র দেখে। চেহারা ঢেকে রাখা যায়, কিন্তু চরিত্র তো আর ঢাকা যায় না।
শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালোর মতো আরও অনেকে হন্যে হয়ে যাকে খুঁজছে, সে-মানুষটার চেহারা যতটা তার চেয়ে বেশি আসল চরিত্রটা আমি তখন প্রায় অঙ্ক কষার মতো গণনায় বুঝে ফেলেছি। ফাটকাবাজারে সে রাশি রাশি টাকা উপায় করবার ফন্দি বার করে, কিন্তু সেটা তার আসল নেশা নয়। নানা বড় বড় দেশের শহরের কারবারি জগতের কলকাঠি নেড়ে প্রায় যেমন খুশি পয়সা কামাবার অদ্ভুত ক্ষমতা সত্ত্বেও, একবার কোথাও দাঁও মারবার পর কিছুদিন তার আর পাত্তা পাওয়া যায় না। তখন স্বনামে ছদ্মনামে নানারকম দানধ্যানে টাকা ছড়াতে ছড়াতে সে দুঃসাহসিক দুঃসাধ্য কিছু সাধন করবার জন্য দেশ-দেশান্তরে ঘোরে।
ডুগান আর কার্ভালোকে বললুম, তোমাদের কাছে তার চেহারার যা বর্ণনা পেয়েছিলাম শুধু তাই দিয়ে তাকে চিনে খুঁজে বার করা যে যাবে না, তা আমি জানতাম। তোমরা যে চেহারার বর্ণনা দিয়েছিলে তা হল সোনালি চুল, নীল চোখ আর একেবারে ধপধপে ফরসা নর্ডিক অর্থাৎ নরওয়ে সুইডেনের খাস বাসিন্দাদের। কিন্তু সে চেহারা তো খুশি মতো বদলানো যায়! অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু সোনালি চুলগুলো লালচে, গায়ের রঙ ঠিক মতো আরক লাগিয়ে তামাটে, আর চোখের নীল তারাগুলোও কনট্যাক্ট লেন্সের সাহায্যে অনায়াসে ব্রাউন, এমনকী কালোও করা যায়। সুতরাং আমি চেহারা দিয়ে নয়, চরিত্র দিয়েই সেই ধুরন্ধরকে খুঁজে বার করতে চেষ্টা করেছি।
কিন্তু সেটাও কি সোজা কাজ? লকনেসের জলচর দানবের খবর চালু হওয়ার পর থেকে দেশ-বিদেশের সন্ধানীরা দলে দলে ছুটে এসেছে এই অঞ্চলে। স্কটল্যান্ডের উত্তরের নির্জন একটা পাহাড়ি শহর আর তার আশপাশের অঞ্চলে গিজগিজ করছে সত্যিকার সন্ধানীদের সঙ্গে হুজুগে মেতে আসা টহলদারের দল।
স্কটল্যান্ডের লোকেদের একটু বেশি হিসেবি আর কৃপণ বলে খ্যাতি আছে। ব্যবসাটা তারা ভালই বোঝে। তাই লকনেসের রহস্য নিয়ে হুজুগটা তারা ভাল করেই কাজে লাগিয়েছে। ছোট শহরের সরু সরু নুড়ি বসানো রাস্তায় সাধারণ দোতলা একতলা সব সেকেলে প্যাটার্নের বাড়ি। যাত্রীদের ভিড়ে সেইসব বাড়ির এক-একটা ঘরের জন্য বড় বড় শহরের চার-পাঁচতারা হোটেলের কামরার ভাড়া তারা আদায় করছে। হোটেল-রেস্তোরাঁ দু-চারটে নতুন হয়েছে, কিন্তু তাতে সব সময়ে জমজমাট ভিড়, ভিড় রাস্তায় ঘাটে আর দোকানে-দোকানে তো বটেই, লকনেসের লম্বা পাড় ধরে কিছু দূর অন্তর পাতা সব তাঁবুতেও। ইউরোপ আমেরিকার উত্তর-দক্ষিণ
পূর্ব-পশ্চিমের তো বটেই, আফ্রিকা-এশিয়ার লোকেরও একেবারে অভাব নেই।
এর মধ্যে আমার সেই লোকটিকে খুঁজে বার করব কোন ফুসমন্তরে?
ফুসমন্তরে নয়, একটু সজাগ চোখে আর ভাগ্যের একটু দয়া থাকলে সে অসাধ্যসাধনও হয়ে যায়। আমার বেলাতেও হল।
ইনভারনেসে পৌঁছে কদিন থাকবার জন্যে গলাকাটা ভাড়ার একটি পুরনো সেকেলে বাড়ির দোতলার একটা ঘরে থাকবার ব্যবস্থা করেছিলাম। বাড়িটি একটি বয়স্কা স্কট মহিলার। বাড়িটি ভাড়া দেওয়া ছাড়া ইনভারনেসে তিনি শৌখিন জিনিসপত্রের একটি জমজমাট মনিহারি দোকানও চালান তাঁর অন্য একটি বাড়িতে। ভদ্রমহিলার নাম মিসেস টড। ইনভারনেসেই তাদের বাড়ি। স্বামীর মৃত্যুর পর বছর পনেরো আগে সেখানকার ঘর-বাড়ি-সম্পত্তির একরকম ব্যবস্থা করে তিনি এডিনবরায় শেষ ক-টা বছর কাটাবার জন্য চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তারই মধ্যে এই লকনেসের জলচর দানবের রহস্য জমাট বেঁধে উঠতে উঠতে ইনভারনেস শহরের ভাগ্যের চাকাই দিলে ঘুরিয়ে। খুঁটেকুড়ুনির হঠাৎ রাজরানি হওয়ার উপমা দিয়েও ভাগ্যের এ পরিবর্তন বুঝি বোঝানো যায় না। লকনেসের অজানা আদিম জলচর দানবের রহস্যভেদের হুজুগে দেশবিদেশের সব ধনকুবেররা খোলামকুচির মতো ডলার, পাউন্ড, মার্ক আর ফ্রাঁ ছড়াতে লাগল ইনভারনেসের রাস্তায় ঘাটে হাটে বাজারে। এমনিতে সবকিছু দরকারি জিনিস আসলের চেয়ে পাঁচগুণ দামে বিক্রি তো হয়ই, তার ওপর লকনেসের রহস্য-দানবের সঙ্গে একটু সংস্রব থাকলে তো কথাই নেই। সাচ্চা-ঝুটা আসল-নকল লকনেসের নেসি রহস্যের সঙ্গে জড়ানো কোনও কিছু বাজারে দেখা দিতে না দিতেই লুট হয়ে যায় হুজুগে-মাতা খরিদ্দারদের হাতে। কোনও কারণ না থাকলেও ব্যবসাদারেরা সবকিছুতে নেসির একটু ছোঁয়া লাগিয়ে দিয়েই বাজিমাত করে। ইনভারনেসের ট্রেনে আসতে আসতেই চায়ের ট্রে, টি-পট, কাপ-ডিশ, কেক-বিস্কুট-টোস্ট, সবকিছুতেই নেসি নামে চালু অজানা প্লিসিওসোরাসের একটু ছাপ রাখবার চেষ্টা দেখা যায়। ইনভারনেসের দোকানে দোকানে নেসির ছাপমারা জিনিসপত্র তো বিক্রি হয়ই, সেইসঙ্গে নেসির বিষয়ে আসল-নকল ছবি, সত্য-মিথ্যা কাল্পনিক বিবরণের বই, নেসিকে শিকারের সরঞ্জাম ও উপায় ইত্যাদি নিয়ে বই রাশি রাশি বিক্রি হয়।
