এইমাত্র চিঠিটা একজন বেয়ারার হাতে তাদের কাছে পৌঁছেছে। বেয়ারাকে খুঁজে পেতে দেরি হয়নি। কিন্তু খুব ফ্যাশনদুরস্ত পোশাক পরা অজানা এক ভদ্রলোক দূর থেকে তাদের দুজনকে দেখিয়ে দিয়ে জরুরি চিঠিটা তাদের দেবার নির্দেশ দিয়ে চলে গেছে। এর বেশি সে বেয়ারা আর কিছু হদিস দিতে পারেনি।
রীতিমত ফ্যাশনদুরস্ত দামি পোশাকের ভদ্রলোক যে চিঠিটা যথাস্থানে দেবার জন্য মোটা বকশিসও দিয়ে গেছে, বেয়ারা শেষ পর্যন্ত তা স্বীকার না করে পারেনি।
কিন্তু চিঠি দিয়ে লোকটা গেল কোথায়? ক্যাসিনোর মধ্যে সে ঢোকেনি, ক্যাসিনোর বাইরেও তার কোনও চিহ্ন দেখা যায়নি। সেখানকার ক্যাসিনোর বাহারে উর্দিপরা নেহাত শোভা হিসেবে বসিয়ে রাখা এক দ্বারপাল তার নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই ঘুমোচ্ছে বলা যায়। আর এ সব ক্যাসিনোতে যেমন থাকে, তেমনই দু-একজন হাড়হাভাতে ফতুর-হওয়া জুয়াড়ি, ভাগ্যের কৃপায় মোটা দাঁওটা যারা মেরেছে, এমন কারও কাছে নানা ছুতোয় কিছু ভিক্ষে পাবার আশায় ঘঘারাঘুরি করছে।
ছোট কং আর তার সঙ্গী ক্যাসিনোর বাইরে বেরিয়ে আসতেই তেমনই একজনের পাল্লায় পড়ে।
মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা, একটা চোখ কালোঠলিতে ঢাকা, পকেট আর বোতাম-ঘর ভেঁড়া একটা ওভারকোট কাঁধে ঝোলানো লোকটা ছোট কং আর তার সঙ্গীর জন্যই যেন অপেক্ষা করছিল। তারা বাইরে আসতেই তাদের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্যাকুলভাবে বলে, শুধু একটা ফ্রাঁ মঁসিয়ে, শুধু একটা ফ্রাঁ ঢাকা দিয়ে বরাতের চাকা একেবারে ঘুরিয়ে দেব দেখুন।
ছোট কং আর তার সঙ্গী রাগে বিরক্তিতে তাকে ঠেলে দিয়ে যত সামনের দিকে এগগাবার চেষ্টা করে, সে নাছোড়বান্দা হয়ে ততই তাদের প্রায় জড়িয়ে ধরে থামাবার চেষ্টা করে বলে, দোহাই আপনাদের, লাখে একজনের ভাগ্যে একবারই যা কখনও আসে, এমন করে সেই আশীর্বাদ পায়ে ঠেলবেন না। শুনুন, শুনুন, আজ এই বিকেল ঠিক চারটের পর তিনের পড়তার দিন। হ্যাঁ, লাল চৌকো আর তিনের নামতার পড়তা চলবে। সারা রাত জেগে দিনক্ষণের জ্যোতিষী হিসেব কষে আমি দেখেছি। একটা ফ্রাঁ দিয়ে শুরু করতে পারল আমি ক্যাসিনোর গোটা জুয়ার ব্যাঙ্ক ফেল করিয়ে দিয়ে যেতে পারতাম। শুধু একটা ফ্রাঁ পেলে—যা আমার নেই–
মন্টিকালোর মতো বড় বড় জুয়াড়িদের সাধের শহরে এরকম পাগল নানা আস্তানায় প্রায়ই দেখা যায়। জুয়ার নেশায় সর্বস্ব খুইয়ে তারা আবার জ্যোতিষ গণনায় নির্ভুল লাভের ছক বার করবার স্বপ্ন দ্যাখে। আইনের শাসন আর পুলিশের চোখ এড়িয়ে ভিক্ষে করে বেড়ায় এমনই করে।
ছোট কং আর তার সঙ্গী নাছোড়বান্দা ভিখিরিটাকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলেই শেষ পর্যন্ত ক্যাসিনোর বাইরে এসে দাঁড়িয়ে ছিল, কে তাদের চিঠিটা পাঠিয়েছে তা জানবার আশায়।
কিন্তু শান্ত নির্জন দুনিয়ার কুবের হেন ধনীদের জুয়ার নেশা মেটাবার অমরাবতীর মতো শহরের বাইরে তখন দক্ষিণের উপসাগর থেকে মধুর সমুদ্রের হাওয়া বইছে। দূরে-দূরে ক্যাসিনোগুলোর বাহারি আলোর মালা এক এক করে জ্বলে উঠতে শুরু করেছে।
রাগে দাঁত ঘষতে ঘষতে দুই দুশমন আবার ক্যাসিনোর দিকেই ফিরতে গিয়ে দ্যাখে, সেই গাঁয়ে ছেঁড়াখোঁড়া ওভারকোট ঝোলানো নাছোড়বান্দা ভিখিরিটা একটু যেন খোঁড়াতে খোঁড়াতে তাদের দিকেই আসছে।
ছোট কং তখন রাগে প্রায় বুঝি ফেটেই পড়ে। খবরদার বলছি গিরগিটিটা, একটু থেমে বুনো বরার মতো ঘোঁতঘোতিয়ে সে বললে, আর এক পা যদি এদিকে আসিস তা হলে তোর পলকা শিরদাঁড়াটাই মটকে দেব। সত্যি ভেঙে দেব।
লোকটা ভয় পেয়েই নিশ্চয়ই অতদূর এসেছিল। তারপর আর না এগিয়ে যেন হতাশ হয়ে বললে, আমায় একটা ফ্রাঁ দিয়ে বরাত ফেরাবার মওকা তো দিলে না। তা না দাও, তবু তোমাদেরই বরাত ফিরুক। এই কাগজটায় আজকের জ্যোতিষের গণনায় পড়তার নম্বর কী, তা লিখে কষে দেওয়া আছে। তোমরাই একটু গা ঘামিয়ে ভাগ্যের চাকাটা ঘোরাতে পারো কি না দ্যাখো।
লোকটা দর থেকে একটা কাগজের পাকানো ডেলা তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়েছিল। ছোট কং রাগে সেটা পা দিয়ে মাড়িয়ে ছিড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু তার সিঁড়িঙ্গে সঙ্গী তার আগেই কাগজের ডেলাটা কুড়িয়ে নিয়ে পকেটে রাখল।
ওটা তুমি কুড়িয়ে নিলে ডুগানচাচা? তোমার ঘেন্না হল না? ছোট কং প্রায়। দাঁত খিঁচিয়ে বললে।
না, ঘেন্না হবে কেন? হেসে জবাব দিলে ছোট কং-এর সিঁড়িঙ্গে সঙ্গী ডুগান, কাগজের ডেলাটা তো আর পকেটে কামড়াচ্ছে না?
০৪. ঘনাদা একটা সিগারেট ধরিয়ে
ঘনাদা একটা সিগারেট ধরিয়ে ফের শুরু করলেন তাঁর গল্প:
পকেটে না কামড়াক, সেই নাছোড়বান্দা ভিখিরির ছুঁড়ে দেওয়া কাগজের ডেলাটা অমন লজ্জা আর অপমানের জলবিছুটির জ্বালা যে সারা শরীরে ধরাবে, তা কি ওরা জানত! আসল নামগুলো যখন জানাই হয়ে গেছে, তখন তা-ই ব্যবহার করে বলি, শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা-মার্কা কার্ভালো তা ভাবতেই পারেনি।
ক্যাসিনোর বাইরে থেকে বৃথাই ঘুরে এসে নিজেদের রুলেটের মজলিশে গিয়ে বসবার আগে পকেটে রাখা কাগজটা খুলে বার করে পড়তে গিয়ে দুজনের চোখ প্রায় ছানাবড়া।
এ কার চিঠি! কী নিয়ে চিঠি? না, এ চিঠি জুয়ায় ফতুর হওয়া কোনও হেরো ভিখিরির নয়, যাকে কুচিকুচি করে কেটে গায়ের জ্বালা যায় না, সেই উচ্চিংড়ে দাসের।
দাস লিখেছে,
