চিনতে পারলে না তো? ওভার কোটটা শুধু উলটে পরে, মাথায় একটা লাল ব্যান্ডেজ বেঁধে, একটা চোখ একটা ঠুলিতে ঢেকেছিলাম। তাতেই অমন বোকা বনার পর দুনিয়ার ফাটকাবাজার ফাটানো সেই ধড়িবাজ চূড়ামণিকে তোমরা খুঁজে বার করতে পারবে, এ আশা আর করতে পারি? অন্য সব কথা বলার আগে আমার ওভারকোটটার কথাই বলে দিই। ওটি সরল সোজা ছদ্মবেশ। ওর এক দিকটা ছেঁড়াখোঁড়াময়লা একটা ওভারকোটের যেন শেষ অবস্থা। ওভারকোটটা ওলটালেই অন্য দিক কিন্তু একেবারে হাল ফ্যাশনের ঝকঝকে তকতকে নতুন সাজ। উলটো দিকটা বাইরে রেখে পরে ক্যাসিনোর বেয়ারাকে তোমাদের হাতে পৌঁছে দেবার চিঠিটা দিয়েছিলাম। তারপর বাইরে আসবার আগেই একটা বাথরুমে ঢুকে মাথায় মিথ্যে ব্যান্ডেজ বেঁধে আর চোখে ইলি লাগিয়ে ওভারকোটটা উলটে পরে এসেছিলাম। যাই হোক, তোমাদের বুদ্ধির পরীক্ষা করে আর সময় নষ্ট করতে চাই না। যাকে খুঁজছ, সত্যিই যদি তার হদিস পেতে চাও, কাল দিনের প্রথম ফ্লাইটে এখান থেকে বিলেতের হিথরোতে গিয়ে নামবে। তারপর কী করতে হবে, সেখানকার এয়ারপোর্ট থেকে উড়োজাহাজ কোম্পানির বাস-এ তাদের শহরের আস্তানা মানে সিটি অফিসে গিয়ে পৌঁছবার আগেই তার হদিস পাবে নিশ্চয়।
হদিস তারা যা পেয়েছিল, তাতে তাদের নিরেট মাথা দুটো ঠুকে দেওয়াই উচিত ছিল। তবু তা না করে ধৈর্য ধরে তাদের বলেছিলাম, এই বুদ্ধি নিয়ে তোমরা দুনিয়ার এক ধড়িবাজ চূড়ামণিকে ধরার আশা রাখো? হিথরোতে নেমে তোমরা শেষ পর্যন্ত এই ঘোড়দৌড়ের মাঠে এলে তার খোঁজে? আগে দুনিয়ার সেরা সব জুয়ার আড্ডায় তাকে খুঁজেছ, তারপর এই বিলেতে এসে নেমে এলে কিনা ঘৌড়দৌড়ের মাঠে!
মানে–, ছোট কং অর্থাৎ আসলে গোরিলা কার্ভালোর শুঁটকো সঙ্গী ডুগান একটু বুঝি লজ্জিত হয়েই বলেছিল, আমরা ভাবলাম যে, আজ বিলেতে দুনিয়ার সেরা ঘৌড়দৌড় ডার্বির খেলা হচ্ছে, তাই সে ধড়িবাজটা
থামো, ধমক দিয়েই বলেছিলাম, তোমরা যাদের সঙ্গে কারবার করো, এ সেই হেঁজিপেজি ধড়িবাজ নয়, এত দিনেও তা বোঝোনি! টাকা রোজগারটা এদের মতো মানুষের কাছে কোনও সমস্যাই নয়। কারবারে দুনিয়ায় এদিকে ওদিকে ক-টা প্যাঁচ কষে এরা যখন যত খুশি মুনাফা লুটতে পারে বললেই হয়। যাকে তোমরা খুঁজছ, সেই ধুরন্ধরের আবার টাকায় লোভ নেই বললেই হয়। তার আগের দুটো দাতব্যের কথা তোমরা আগেই শুনেছ, এখন জেনে রাখো, মন্টিকার্লো থেকে ছেড়ে আসবার আগে সেখানেই সে একটা বড় ক্যানসার হাসপাতালের জন্য মোটা সাহায্যর টাকা দিয়ে এসেছে। না, টাকার কুমির হওয়া নয়, এ মানুষের নেশা হচ্ছে মানুষের জীবন। আর জগতের যে সব ব্যাপার আজও পরম ধাঁধা হয়ে আছে, বুদ্ধি দিয়ে তাদের রহস্য ভেদ করা। মহাভারতের যুগে জন্মালে এ মানুষ অর্জুনের সঙ্গে ধ্রুপদরাজের লক্ষ্যভেদের বাহাদুরির খেলায় পাল্লা দিত। গান্ডিবীকে লজ্জা-দেওয়া সেই মানুষকে। তোমরা খুঁজতে এসেছ এই এপসম ডাউনস-এ?
ইংল্যান্ডের বিখ্যাত ঘোড়দৌড় ডার্বি খেলার মাঠ এপসম ডাউনস-এর মধ্যে দাঁড়িয়েই কথা হচ্ছিল। হিথরোতে প্লেন থেকে নেমে তারা আর কোথাও নয়, এই বিখ্যাত ঘোড়দৌড়ের মাঠেই প্রায় ছুটে আসবে, তা বুঝে এখানে এসেই দুই মূর্তিমানকে ধরেছিলাম। তাদের বুদ্ধির দৌড়ে আর একবার ধিক্কার দিয়ে সেই কথাই আর একবার বললাম, মন্টিকালো থেকে বিলেতের হিথরোতে এসে নেমে লন্ডন শহর পর্যন্ত আসার পথে এই ডার্বির ঘৌড়দৌড়ের মাঠ ছাড়া আর কোনও কিছুর কথা তোমাদের মনে পড়ল না? ওই নিরেট দুটো মাথার ঘিলুতে আর কোনও ভাবনা একটু নাড়া দিল না?
না, দিল না! এতক্ষণ পর্যন্ত অনেক বাক্য সয়ে ছোট কং, বা তার আসল যা নাম তাই ধরে বলি, গোরিলা কার্ভালো খেপে গেছে বললেই হয়। ডার্বি-দৌড়ের দিন এপসম ডাউনস-এর সেই মাঠ-ভর্তি দিনমজুর থেকে লাট-বেলাট, বড়লোকের ভিড়ের মধ্যে আমার একটা হাত ধরে মোচড় দিয়ে প্রায় ছিঁড়ে নেবার চেষ্টা করে বললে, আমরাই যদি ভাবব, তা হলে তোকে হুকুম দিয়ে কাজে লাগিয়েছি কেন? নে, খুঁজে বার কর তোর সেই মক্কেলকে। নইলে তোর দুটো হাত আর মাথাটা এখানেই ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে যাব। কী? বুঝলি, যা বললাম? এক্ষুনি বার কর তোর মক্কেলকে।
এক্ষুনি বার করতে হবে? যেন কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, কিন্তু তা হলে এ জায়গা ছেড়ে একটু যেতে হবে যে!
যেতে হবে? ছোট্ট কং মানে গোরিলা কার্ভালো আগুনের হলকা বার করা গলায় জিজ্ঞেস করলে, কোথায়?
বেশি দূরে নয়, যেন ভয়ে-ভয়ে বললাম, এই ওয়াটার্ল স্টেশনে।
ওয়াটাৰ্ল স্টেশনে! শুঁটকো ডুগান আর গোরিলা কার্ভালো দু-জনেরই গরম গলায় এবার খিচুনি শোনা গেল, রসিকতা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে?
তারপর ছোট কংই আলাপের মওড়া নিয়ে বললে, জিভটা ছিঁড়ে নেব, এইটা মনে রেখে যা বলবার বলবি। কোথাও এতদিনে যার খোঁজ মেলেনি, ওই ওয়াটার্ল স্টেশনে গেলেই তার দেখা মিলবে? সে আমাদের জন্য সেখানে অপেক্ষা করে বসে আছে?
তা কি আর আছে! সবিনয়ে স্বীকার করলাম। তবে তাকে খুঁজে বার করতে হলে ওই ওয়াটার্ল স্টেশনে যাওয়া ছাড়া তো আর কোনও উপায় দেখছি না।
তা ছাড়া উপায় দেখছিস না! ছোট কং মানে গোরিলা কার্ভালো তার মুঠো করা ডান হাতটার রদ্দাটা আমার বাঁ কানের ওপর চালাবে কি না, তক্ষুনি ঠিক করতে না পেরে কী ভেবে নিজেকে তখনকার মতো সামলে বললে, বেশ, তোর ওয়াটার্ল স্টেশনেই চল। সেখানে আজ তোর এসপার কি ওসপার, এইটে শুধু মনে রাখিস।
