ভোরবেলা জরুরি ছাপ দেওয়া চিঠিটা ফেলেছি, সুতরাং ব্রেকফাস্টের সময়েই সে চিঠি তাদের হাতে পৌঁছেছে নিশ্চয়ই। খাম খুলে সে চিঠি পড়তে পড়তে আর সঙ্গীকে শোনাতে শোনাতে দুজনের মুখের অবস্থা কী হয়েছে দেখতে না পেলেও অনুমান বোধহয় ঠিকই করতে পেরেছি।
চিঠিটার ভাষা ছিল:
মনিব বাহাদুর, ছোট কং ও চিমসে চামচিকে মহোদয়, দেখতে দেখতে এক বছর তো হয়ে গেল। আমার কাজ তো আমি ঠিক মতো শেষ করছি, কিন্তু এখনও আপনাদের দেখা নেই কেন? কথা ছিল আমি এক বছরে আমার কাজ সারব, আর আপনারাও তখন আমায় খুঁজে নেবেন। আপনাদের শ্রীমুখ এখনও পর্যন্ত একবারও না দেখে মনে হচ্ছে, এখনও আমার সঠিক পাত্তা আপনারা পাননি। তা হোক, হতাশ না হয়ে চেষ্টা করে যান। অধ্যবসায়ে সব কিছু সম্ভব।
ইতি বশংবদ ঘনশ্যাম
এ-চিঠির পরে আবার একটু পুঃ দিয়ে লেখা:
আপনাদের ধুরন্ধর ধড়িবাজ মক্কেলকে তাড়াতাড়ি খুঁজে বার করবার একটা হদিস এখানে দিচ্ছি। মনে রাখবেন, আপনারা যাকে খুঁজছেন, সেই মক্কেল এক পাকা জাত-জুয়াড়ি। মাছের আঁশটে গন্ধ যার ধ্যানজ্ঞান, সেই বেড়ালকে যেমন মাছ কোটার হেঁশেলে, তেমনই রক্তে যার জুয়ার নেশা তেমন পাকা জাত-জুয়াড়িকে কোথায় পাওয়া যায়, একটু ভেবে দেখুন না। হ্যাঁ, স্যার, একটা কথা, আপনাদের ধড়িবাজ চুড়ামণি পাকা জাত-জুয়াড়ি, ইতিমধ্যে এই মেরিল্যান্ড-এর এক হাসপাতালে একরাশ ডলার এই কিছুদিন হল দান করেছে। এ খবরটা যাচাই করে নেবেন। ধড়িবাজ চূড়ামণিকে কিন্তু খুঁজে যান।
তা খুঁজতে তারা কি আর কিছু বাকি রেখেছে?
কিন্তু এরপর তাদের অবস্থা যা হল তা আরও করুণ ছাড়া আর কী বলা যায়!
মেরিল্যান্ড-এর হোটেলে যে চিঠি পেয়েছিল তাতে গায়ের জ্বালায় ছটফট করে তারা অ্যাটলান্টিকের এপার-ওপার হয়ে তখন মন্টিকালোয় এসে একটা ভিলাবাড়ি ভাড়া নিয়ে আছে।
মন্টিকালো নামটা উচ্চারণ করবার পর আর বোধহয় কোনও বিবরণ দিতে হয় না। হ্যাঁ, ফ্রান্সের দক্ষিণে ভূমধ্যসাগরের উপকূলে দুনিয়ার সেই জুয়াড়িদের অমরাবতী মন্টিকালো। ভাগ্যের রুলেট চাকা সেখানে এক-এক চক্করে দু-দশ লাখ নয়, অমন কোটি কোটি টাকার বরাত ঘুরিয়ে আনে কি উড়িয়ে দেয়।
ছোট কং আর তার চিমসে দাদা সেখানে ক-দিন হল এসে সমদ্রের তীরে রিভিয়েরায় একটা স্বর্গপুরীর মতো ভিলা ভাড়া করে আছে।
আছে মানে ভিলায় নয়, ঠিকানাটা তাই রেখে সারা দিন-রাত তারা সব জুয়ার ঘাঁটি ক্যাসিনো থেকে ক্যাসিনো ঘুরে তাদের মক্কেলকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। এর আগে মেরিল্যান্ড-এ পাওয়া চিঠিটায় উচ্চিংড়ে সেই দাসটা লিখেছিল সারা দুনিয়ার ফাটকা বাজারে যে ধড়িবাজ সব বাঘা বাঘা কারবারি আর দালালদের ঘোল খাইয়ে ছেড়েছিল, সে যে আসলে একজন জুয়াড়ি, সে কথা মনে রাখতে। সে কথা মনে রাখলে সেই ধড়িবাজকে দাতব্য লটারির মজলিশে খোঁজার কোনও মানে হয় না নিশ্চয়।
কথাটা মনে ধরেছিল বলেই কং আর তার শুঁটকো সঙ্গী এদিক-ওদিক একটু ঘুরেফিরে এই মন্টিকার্লোয় এসে উঠেছে। জুয়াড়ির এমন স্বর্গ আর কোথায় আছে দুনিয়ায়।
কিন্তু কই! এখানে আসা অবধি সারা দিনরাত সব কটা ক্যাসিনোতে পালা করে সারাক্ষণ ধরনা দিয়েও সেই ধড়িবাজের টিকিটি পর্যন্ত দেখতে পেল না।
সে ধড়িবাজের দেখা পাওয়ার বদলে পেল সেই গায়ে জ্বালা-ধরানো চিঠিটা। চিঠিটা সেই শুঁটকো উচ্চিংড়ে দাসটার।
দাস লিখেছে:
আরে ছ্যা ছ্যা। তোমরা যে এমন নিরেট আহাম্মক তা ভাবতেই পারিনি। সমস্ত দুনিয়ার কারবারের চাকা স্রেফ বুদ্ধির প্যাঁচে যে উলটে-পালটে যেমন খুশি ঘুরিয়ে দিয়ে সিসের গাদ থেকে সোনার তাল বানিয়ে নিয়ে গেছে, তাকে খুঁজতে এসেছ জুয়োর চাকতিতে, ভাগ্য ফেরাবার ছেলেখেলা যেখানে হয় সেইসব ক্যাসিনোয় রুলেটের টেবিলে গাওস্কর তার হাতের মার ঠিক রাখতে গেছে ডাংগুলি খেলতে? না হে, উজবুকরা, তা নয়। যাকে তোমরা খুঁজছ রুলেটের জুয়ায় হাত নোংরা করবার মানুষ সে নয়। মন্টিকালো কি তোমরা এর আগে যেখানে খোঁজ করে এসেছ, সেই লাসভেগাস-এর দশ-বিশ লাখ ডলার লাভে তার লোভই নেই। সাগর হেন পাঁচ-দশটা দিঘি যে বাগিয়েছে, দুটো পাতকোর জন্য হ্যাংলামি সে করবে কেন? তার আবার দানের কথা শুনেছি, আর কটা নতুন দানের কথা শোনো। ইউরোপে যেমন তেমনই আফ্রিকাতেও দু-দুটো নতুন বিরাট হাসপাতাল বসাবার সমস্ত খরচ সে দেবার ব্যবস্থা করেছে। যা গচ্চা দিয়ে তোমরা হন্যে হয়ে তাকে ধরবার জন্য ছোটাছুটি করছ, তোমাদের সেই লোকসানের টাকা দিয়েই সে এ সব দানধ্যান যে করছে, তা বুঝতে পেরে তোমরা যে দাঁত-কিড়মিড় করছ, তা টের পাচ্ছি। কিন্তু উপায় তো নেই। তোমাদের নাক-কান যে এমন করে মলে দিয়েছে, তার হদিস পেতে হলে বড়ের চালে যেখানে কিস্তিমাতের খেলার কেরামতি দেখা যায়, সেখানে যেতে হবে। তোমাদের ওই ফাটকাবাজারি বুদ্ধি নিয়ে শুধু নিজেদের চেষ্টায় সেখানে পৌঁছবার আশা অবশ্য কম। তবু চেষ্টা করে যাও, করে যাও চেষ্টা।
চিঠিটা পড়তে-পড়তে ছোট কং আর তার শুঁটকো সঙ্গীর চেহারা যা হয়েছিল, তা যে এঁকে রাখবার মতো তা নিশ্চয়ই বলতে হবে না। একজন যেন মাটিতে পোঁতা মাইন, আর অন্যজন, যাকে ক্ষেপণাস্ত্র বলে, সেই মিসাইল।
চিঠিটা যখন তারা পেয়েছে তখন নিজেদের শিকার খুঁজতে একটা ক্যাসিনোর মধ্যে বসে নজর রাখছিল বলেই কোনওরকমে নিজেদের সামলে তারা আগুনের হলকার মতো রুলেট-টেবিল ছেড়ে ক্যাসিনোর বাইরে বেরিয়ে এসেছে।
