হ্যাঁ, ওই কিন্তুটাই বড় ভয়ানক, ঘনাদার গলায় একটু উৎসাহের আভাসই পাওয়া গেল এবার, সাধারণ চুরি-ডাকাতি নয়, কিন্তু আমেরিকা জার্মানি ফ্রান্সের মতো বড় বড় দেশের শেয়ার মার্কেট মানে ব্যবসার বাজারে যেন ভূমিকম্প লেগেছে। একটা ধুরন্ধর ধাপ্পাবাজ সেখানে শেয়ার বেচাকেনার এমন কারসাজি করেছে যে, তার ফাঁপানো সুদিনের খোয়াব দেখানো ফাঁপানো ফানুস হঠাৎ ফেঁসে গিয়ে একদল লোভী ফাটকাবাজারির একেবারে সর্বনাশ হয়েছে। সেই ফেঁসে-যাওয়া ফাটকাবাজারিরাই এখন দুশমনকে খুঁজছে হন্যে হয়ে। কিন্তু খুঁজলে কী হবে? ক-দিনের জন্য দুনিয়ার বাজারে দেখা দিয়ে প্যাঁচালো বুদ্ধির জোরে ছড়ানো ধাপ্পায় লোভীদেরই বেশি করে ফাঁদে ফেলে যে একেবারে খতম করে দিয়ে গেছে, তার পাত্তা আর কে কোথায় পাচ্ছে?
তা হলে? দ্বিধাভরেই জিজ্ঞেস করলাম আমরা, সেই ধুরন্ধর ধড়িবাজকে ধরার দায় শেষ পর্যন্ত আর নিলেন না?
নেবার ইচ্ছেই তো ছিল না, কিন্তুঘনাদা যেন স্বীকার না করে পারলেন না— কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজেরই যে লোভ হল দুনিয়ার ধড়িবাজ চূড়ামণিকে স্বচক্ষে একবার দেখে তার সঙ্গে পাঞ্জা লড়ার। তাই কিংকং-এর ছোট ভাইয়ের হাতের মোচড়ে যেন ককিয়ে উঠেই তার হুকুমটা মেনে নিলাম শুধু একটা শর্তে।
শর্ত! তোর আবার শর্ত কী রে উচ্চিংড়ে, দুশমন দানোটা দাঁত খিঁচিয়ে বলল, কাজটা হাসিল করলে তোরই পছন্দ মতো হয় ডান নয় বাঁ কানটা ছিঁড়ব। এই একটা শর্ত তুই অবশ্য করতে পারিস বটে!
না, অমন অবুঝ হবেন না, যেন মিনতি করে বলেছিলাম, আপনাদের কাজ হাসিল করবার জন্যই এ-শর্তটা আমার রাখা দরকার।
বেশি বকবক করিসনি, ধৈর্য হারিয়ে কিংকং-এর ভাই ছোট কং এবার ধমক দিয়ে বলেছে, কী তোর শর্ত বলে ফ্যাল, শুনি।
এমন কিছু নয়, আমি যেন ভয়ে ভয়ে বলেছি, শর্ত শুধু এই যে, আমি আপনাদের মক্কেলকে এক বছরের মধ্যে খুঁজে বার করব ঠিক, কিন্তু আমাকে তারপর আপনাদের খুঁজে বার করতে হবে।
তার মানে? ছোট কং মানে ঘটোৎকচের দাদা রাগে রক্তচক্ষু হয়ে আমার দিকে চেয়ে এবার গর্জে উঠেছে, তুই খুঁজে বার করবি আমাদের ধুরন্ধরকে? আর তার পর তোকে খুঁজতে হবে আমাদের? এ কী উলটো-পালটা রসিকতা হচ্ছে আমাদের সঙ্গে? দেব এবার মুণ্ডুটা সত্যি উলটো দিকে ঘুরিয়ে।
ছোট কং তখনই আমায় ধরবার জন্য হাত বাড়ায় আরকী!
তার নাগালের বাইরে একটু সরে গিয়ে বললাম, মিছিমিছি রাগ করছেন কেন? আপনাদের যা আসল উদ্দেশ্য তার সিদ্ধির জন্যই এ-শর্তটা যে দরকার, তা বুঝতে পারছেন না কেন? আপনাদের মক্কেল তো বলছেন ধড়িবাজ চূড়ামণি। তাকে খুঁজে বার করে সামনাসামনি কোতল করতে গেলে আপনাদের হবে কিছু? যা আপনাদের বিশেষ দরকার, তার সেই গোলমেলে কাজ-কারবার আর লেনদেনের গোপন কাগজপত্র তখন কি আর হাত করতে পারবেন? সে আগেই সব দেবে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নষ্ট করে। তাই বলছি, আমি এক বছরেরই মধ্যে তাকে খুঁজে বার করবার কড়ার করছি। কিন্তু খুঁজে বার করে আমি শুধু তার ওপর নজর রাখার বেশি আর কিছু করব না। করলে সব কাজ যাবে ভেস্তে! আপনাদেরই তাই তখন আমায় খুঁজে বার করার চেষ্টা করে আপনাদের সেই ধড়িবাজের সঠিক সন্ধান পেতে হবে।
ব্যাপারটা ইচ্ছে করেই বেশ একটু জটিল গোলমেলে করে তাদের কাছে সাজিয়ে ধরেছিলাম। ঠিক মতো কিছু না বুঝলেও নিজেদের গরজে শেষ পর্যন্ত আমার শর্ত মানতে তারা আর আপত্তি করেনি।
গল্প যেন এখানেই শেষ, ঘনাদা এমনভাবে থেমে যাওয়ায় নবীনবাবুই প্রথম প্রতিবাদ করলেন, ও কী, থামলেন যে? সেই শুঁটকো চামচিকে আর কিংকং-এর ভাই ছোট কং আপনার শর্ত না হয় মেনে নিল, তাতে হল কী? ধরতে পারলেন সেই ধড়িবাজ চূড়ামণিকে? কোথায় কেমন করে ধরলেন?
ধীরে, বন্ধু ধীরে, আমাদেরই এবার নবীনবাবুকে সামলাতে হল, কোথা দিয়ে কেমন করে কী হল, শুনুনই না একটু ধৈর্য ধরে।
ধৈর্য ধরে লব? আমাদের বকুনিতে একটু যেন অপ্রস্তুত হয়ে নবীনবাবু বললেন, কিন্তু শেষ ফলটা না জানলে স্বস্তি পাচ্ছি না যে!
ও, আপনি তা হলে তাদেরই একজন, গোয়েন্দা-গল্প পড়তে শুরু করে প্রথমেই শেষ পাতাগুলো উলটে যারা অপরাধীটা কে জেনে নিতে চায়। না মশাই, ওই ধৈর্যটুকু না থাকলে বাহাত্তর নম্বরের মজলিশে বসে আপনি সুখ পাবেন না।
কেন? নবীনবাবু এবার একটু যেন গরম, এখানে গল্প তৈরি হতে হতে বুঝি বদলেও যায়? আসামি যায় পালটে?
না, তা যাবে না! নবীনবাবুর কথার প্রতিবাদে আমরা কেউ কিছু বলার আগে ঘনাদারই বাজখাঁই গলা শোনা গেল, বরং শেষ দিক থেকেই শুরু করে উজানে পিছিয়ে যাচ্ছি।
উজানে পিছিয়ে যাচ্ছি মানে? গৌর আমাদের সকলের হয়ে প্রতিবাদ না জানিয়ে পারল না, ঠিক ধারা ধরার বদলে উলটো দিক থেকে শুনে গল্পের সেই আসল মজা আর থাকবে?
থাকবে, থাকবে! আমরা সমস্বরে আশ্বাস দিলাম, এ একরকম বাহবা, বুঝেছ? যেদিক দিয়ে শুরু করো, একই দাঁড়ায়।
আমাদের যুক্তিটা জোরালো না হলেও সমর্থনটায় ঘনাদা অখুশি হলেন না বলেই মনে হল। প্রসন্ন মুখেই বললেন, তারপর ঠিক এক বছর কোনও সাড়াশব্দ আর করিনি। ঠিক বার-তারিখ ধরে একটি বছর শেষ হবার পর ছোট কং আর তার চিমসে সঙ্গী একটা চিঠি পেয়েই নিশ্চয়ই একেবারে হতভম্ব। আমাদের মতো আঠারো মাসে বছরের দেশ নয়, খাস মার্কিন মুলুকের রাজধানী ওয়াশিংটন শহরের লাগাও মেরিল্যান্ড-এ একটা পাঁচতারা হোটেল। ডাকে চিঠি দিলে সেখানে মারা যাবার কি বিলি হতে দেরি হবার কোনও ভয় না থাকলেও নিজের হাতে হোটেলের চিঠির বাক্সে আমার দুই মুরুব্বির নামের চিঠিটা ফেলেছি।
