কিন্তু ফ্যাসাদ বেধেছে নকল বেদব্যাস সাজানো নরহরি কি নরেশ্বরকে নিয়ে নয়, জলের কলের কনট্রাকটর নেহাত সাদাসিধে নবীনবাবুকে নিয়ে।
সম্পূর্ণ বিনা দোষে অকারণে তাঁকে টিটকিরির শিকার করে তোলার অবিচারে নরহরি বা নরেশ্বর নয়, নেহাত সাদাসিধে নবীনবাবু যখন বিগড়ে গিয়ে বেঁকে দাঁড়িয়েছেন, তখন ঘনাদা সত্যিই পড়েছেন বিপদে।
আপনি মানে, ঘনাদা বিব্রত অপ্রস্তুত হয়ে বলেছেন, ও সব পণ্ডিতটণ্ডিত, ওই কী বলে, শব্দকল্পদ্রুম গোছের কিছু নন তা হলে? মাফ করবেন, নরহরি, না না, নরেশ্বর, থুড়ি নবীনবাবু, আমি আমার ভুলের জন্য বারান্দা থেকে ন্যাড়া ছাদ পর্যন্ত সব কটা সিঁড়ি নাকখত দিয়ে উঠতে রাজি আছি। আপনি শুধু আমায় ক্ষমা করবেন।
ঘনাদার কথাগুলো শুনব কী, তাঁর কাণ্ড দেখে তখন আমাদের হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধোবার অবস্থা।
ঘনাদা তখন উঠে দাঁড়িয়েছেন। শুধু উঠে দাঁড়াননি, বারান্দার দরজার দিকে পা বাড়িয়ে বলেছেন, মিছিমিছি কটা বাজে বুকনি ছেড়ে বাহাদুরি নেবার চেষ্টায় আপনার সময় নষ্ট করেছি বলে আমি সত্যিই আপনার কাছে মাফ চাইছি। আচ্ছা, নমস্কার!
নমস্কার, বলে ঘনাদা সত্যি তখন রওনা দিয়েছেন বারান্দার দরজা দিয়ে ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ির দিকে।
হায়, হায়! একেবারে ঘাটের কাছে এসে ভরাড়ুবি! শিবুকে শিক্ষা দিতে গিয়ে ঘনাদা তো হাজার একের ওপর আরও ক-টা আরব্যরজনী নামিয়ে এনেছিলেন।
সে সব তো গেল গাঢ় অমাবস্যায় হারিয়ে।
এখন ঘনাদাকে আর কি ফেরানো সম্ভব? ছিঁড়ে যাওয়া তার আবার জুড়ে আর কি সুরে বাঁধা যায় ভাঙা সারেঙ্গি?
যায়, যায়। ব্যাপারটা একরকম হোমিওপ্যাথিই বলা যায় নিশ্চয়। রোগ যা ধরায়, দাওয়াই জোগায় তা-ই।
ঘনাদার বিদায়-নমস্কারের প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আর একটা ধমকই যেন শোনা গেল। শুধু ধমক অবশ্য বলব না, ধমকেরই সুরে যেন একটা নালিশ, নমস্কারের মানে? নমস্কার মানে চলে যেতে চান আমাদের কী জানো, কী হল, কী হবের ভয়-ভাবনা-সন্দেহের কাঁটাতারের বেড়ার ওপর ঝুলিয়ে? না, না, সেটি হবে না। গণপতি না গজেশ্বরবাবু, এলোপাতাড়ি সন্দেহ-সংশয়ের কাঁটা যা-সব ছড়িয়েছেন, তা সাফ না করে আপনার যাওয়া চলবে না।
আরে, আরে, করেন কী নরহরি, না, থুড়ি নবীনবাবু?
নবীনবাবুর এর আগের প্রাণখোলা বক্তৃতায় আর ব্যবহারে যতই খুশি হয়ে থাকি, এবার তাঁকে সামলাবার জন্য এগিয়ে গিয়ে ধরতে হল।
ধরতে হল তখন তিনি ঘনাদাকে প্রায় জাপটে ধরে আবার বসাবার চেষ্টা করছেন বলে।
কী, করছেন কী, নবীনবাবু! সঠিক নামটা ধরেই তাঁকে শাসন করতে হল এবার, টানাটানি করছেন কেন ওঁর হাত ধরে?
বেশ, হাত ছেড়ে দিয়ে পাই না হয় ধরছি,নবীনবাবু তা-ই করতে গিয়ে ঘনাদা সরে যাওয়ার জন্যই বিফল হয়ে বললেন, আমাদের মনের খোঁচাগুলো উনি শুধু বাড়িয়ে দিয়ে যান। শুধু জিজ্ঞাসাগুলো জানিয়ে উত্তরগুলো চেপে চলে যাওয়াটা কি ওঁর উচিত হচ্ছে?
আচ্ছা বলুন, কোন উত্তরটা চান? ঘনাদাই এবার ফিরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইলেন।
একটাই তো নয়, অনেক জিজ্ঞাসারই উত্তর চাই,নবীনবাবুই আমাদের সকলের মনের কথাটা জানিয়ে বললেন, কিন্তু আপনার কী বলে, একটু বসলে ভাল হত না?
আমাদের সকলকে অবাক করে, লজ্জা দিয়ে নবীনবাবু এবার ঘনাদার মৌরসি কেদারাটাই টেনে তাঁর কাছে এনে পেতে দিলেন।
ঘনাদা কি বিরক্ত? ভেতর থেকে রাগটা কি ফোঁস করে ওঠার উপক্রম করছে?
মুখ দেখে তা অবশ্য বোঝা গেল না। শুধু গলাটা একটু গম্ভীর রেখে ঘনাদা জিজ্ঞেস করলেন, বলুন, কোন উত্তরটা চান প্রথম?
প্রথম? নবীনবাবু বলতে গিয়ে হঠাৎ যেন নিজের কর্তব্যটা স্মরণ করে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, বলুন না আপনারাই, প্রথম কোন জবাবটা শুনতে চান?
না, না, আপনি বলুন, এ-মজলিশের মেজাজ যিনি শুধরেছেন, তাঁকেই অধিকারটা আমরা সানন্দে দিলাম।
তা হলে, অনুমতি পেয়ে নবীনবাবু খুশিমুখে বললেন, ওই যে বিলেতের ওয়েলস-এর কোন খুদে স্টেশনের আটান্ন হরফের এক ঘটোৎকচ-মাকা নামের বানান শোনালেন, সে-বানান যে ঠিক, তার প্রমাণ কোথায় মিলবে?
তার প্রমাণ? ঘনাদার মুখের ছায়াটা একটু হালকা হচ্ছে কি? তার প্রমাণ। মিলবে বিলেতের স্টাউট নামে পানীয়ের জন্য বিখ্যাত কোম্পানির গিনেস বুক অব রেকর্ডস নামের বইতে। সেই বই দেখে এক-এক করে আটান্নটা অক্ষর মিলিয়ে দেখতে পারো। আচ্ছা, এ-প্রশ্ন তো হল, তারপর?
তারপর? তারপর? শিশিরই এবার জিজ্ঞেস করলে, আচ্ছা, মহিষাসুরের মতো বিরাট আর চামচিকের মতো চিমসে যে দু-জন আপনাকে অনেক খুঁজে শেষ পর্যন্ত মধ্যোপসাগরের এক প্রায় অজানা জেলেদের দ্বীপে গিয়ে দেখা পায়, তারা কে, কেনই বা আপনাকেই অত করে খুঁজছিল?
কেন খুঁজছিল তা তো আগেই শুনেছ। ঘনাদার স্বর কি একটু ক্লান্ত?
০৩. পাছে তিনি ধৈর্য হারান
পাছে তিনি ধৈর্য হারান সেই ভয়ে তাঁর মেজাজকে তোয়াজ করার সুরেই বললাম, আপনি যা বলেছেন তা যে বুঝতে পারিনি, তা ঠিক। জোচ্চোর বাটপাড় ধাপ্পাবাজ হলে তাদের ব্যবস্থা করবার জন্য তো কোর্ট কাছারি, পুলিশ আর গোয়েন্দাটোয়েন্দা আছে।
তা আছে! ঘনাদা একটু যেন হাসলেন, কিন্তু পুলিশ-গোয়েন্দারা যখন কূল পায় না, খনই তো হয় মুশকিল। ওদের হয়েছিল তাই।
ব্যাপারটা কী হয়েছিল যদি দয়া করে একটু বুঝিয়ে দেন, নবীনবাবুর সঙ্গে আমরাও মিনতি জানালাম, এ তো সাধারণ চুরি-ডাকাতি, তহবিল তছরুপ গোছের কিছু মনে হচ্ছে না, কিন্তু–
