ও, বললেন ঘনাদা, ওই নাম দিয়েছে ওরা? দক্ষিণ—কী বলে—দক্ষিণ গঙ্গোত্রী।
কী ইচ্ছে করে এর পরে? ঘনাদার এই বেয়াড়া রোগের সূত্রপাত যার জন্য হয়েছে তাকেই এই বাহাত্তর নম্বর থেকে নির্বাসন দিতে ইচ্ছে করে নাকি?
কিন্তু তার দরকার হয় না।
রোগ যার বাধে, দাওয়াইয়ের ব্যবস্থাটাও সেই করে।
দাওয়াইটা বেশ অদ্ভুত। প্রথমে দাওয়াই বলে ধরাই যায়নি।
বাহাত্তর নম্বরের এখনকার নিতান্ত জোলো মজলিশে কদিন আগে হঠাৎ একটা নতুন মুখ দেখা গেছে। কার এ মুখ, কোথা থেকে আমদানি এ সব কিছু জানবার আগে শিবুর কাছে সামান্য দু-একটা ইশারা আমরা অবশ্য পেয়েছি।
শব্দ-কল্পদ্রুম-এর নাম শুনেছ তো? শিবু যেন জনান্তিকে জানিয়েছে আমাদের, এ তা হলে আর-এক নিখিল বিশ্ব শব্দকল্পদ্রুম। এমন কিছু ভূ-ভারতে নেই, যা ওই মানুষটাকে একটু নাড়া দিয়ে বার করতে পারা যায় না। আর একবার মুখ খুললে সে অনর্গল কথার ফোয়ারা বন্ধ করে কে? শুধু একটু বুঝেসুঝে ফোয়ারাটা চালু করতে হয়। মেজাজি মানুষ তো, এমনিতে মুখ যেন খুলতেই চায় না।
যাঁর সম্বন্ধে কথাগুলো বলা হয়েছে, তাঁকে মাত্র একদিনই বাহাত্তর নম্বরে আমাদের দেখবার সৌভাগ্য হয়েছে। শিবুর সঙ্গে সন্ধের দিকে এসে সম্পূর্ণ নির্বাক হয়ে আড্ডাঘরে খানিক বসে শিবুর সঙ্গে তিনি আবার ঘর ছেড়ে চলে গেছেন।
ওপরে যাঁর কথা লেখা হল, প্রথম দিনের নীরব সাক্ষাতের পর দ্বিতীয় দিনে শিবু যখন প্রথম তাঁর বিশদ পরিচয় দিয়েছে, তিনি নিজে তখন সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। ওপরের টঙের আড্ডাঘরে তাঁকে তখনও দেখা না গেলেও ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িতে তাঁর বিদ্যাসাগরি চটির চটপটানি সিঁড়ি থেকে বারান্দায় পৌঁছবার শব্দ তখন পাওয়া গেছে।
শিবু অবশ্য তার নতুন আবিষ্কার সম্বন্ধে উচ্ছ্বাস যেরকম তারস্বরে প্রচার করেছে, তাতে সিঁড়িতে পা দেবার আগে নিজের টঙের ঘর থেকেই ঘনাদার তা শুনতে খুব অসুবিধে হত না।
বাইরে বারান্দা থেকে ঘনাদা যখন ঘরে ঢুকেছেন, শিবু তখন তার নতুন আবিষ্কারের নামটা আমাদের জানিয়ে বলেছে, ওঁর নামটা ভাল করে জানার সুযোগ অবশ্য হয়নি। হবে কোথা থেকে? এমনিতে থাকেন একেবারে স্ফিংসের মতো বোবা হয়ে, আর কথা যখন একবার শুরু করেন তখন তার মধ্যে তাঁকে নাম জিজ্ঞেস করবার ফুরসত থাকে কখন। তবে নামটা ওই নবীন না নরেশ্বর না নরহরি গোছের কিছু বলে যেন হচ্ছে।
শিবুর কথা শেষ হবার আগে ঘনাদা ঘরের যথাস্থানে এসে তাঁর মৌরসি কেদারাটি দখল করতে করতে বলেছেন, ভাল, ভাল, নামটা ঠিক না-ই জানো, আবিষ্কারটা করেছ তো ঠিক। যা-তা নয়, একেবারে নিখিল বিশ্ব শব্দকল্পদ্রুম। অর্থাৎ ইউনিভার্সাল এনসাইক্লোপিডিয়া। মানে বিশ্বকোষ। শুকনো পুঁথির কাগজের নয়, জীবন্ত বিশ্বকোষ মানে দ্বিতীয় ব্যাসদেব আরকী!
ঘনাদা তখন তাঁর যা বলবার বলেই যাচ্ছেন, আর আমরা ঠিক সজ্ঞানে আছি কি না জানবার জন্য নিজেদের চিমটি কাটব কি না ভাবছি।
চিমটি সত্যি অবশ্য কাটিনি। কিন্তু আমাদের মাঝখানের মৌরসি কেদারায় আসীন মানুষটি যে আমাদের এ ক-দিনের ঘনাদা, তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
কী তাঁর হয়েছিল, তা একেবারে অজানা না হলেও, হঠাৎ এ-রূপান্তর কী করে যে তাঁর হল, তার রহস্যটা যে ধরতেই পারছি না।
এ কি আমাদের টঙের ঘরের সেই তিনি, এই গত কালই যাঁকে রাম বলাতে হন্যে হয়ে গিয়ে মরা পর্যন্ত বলাতে পারিনি। হঠাৎ তাঁর বাবা গলায় কথার যেন বান ডেকেছে। সে-বান আবার বাঁধভাঙা হয়ে উঠেছে ঠিক সেই সময়ে শিবুর আবিষ্কার বিশ্ব-শব্দকল্পদ্রুম নরহরি না নরেশ্বরবাবুর ঘরে এসে ঢাকায়।
আসুন, আসুন, নরহরি না নরেশ্বর না দ্বিতীয় ব্যাসদেবঠাকুর, আপনার জন্যই অপেক্ষা করছি আমরা। বসুন, বসুন। হ্যাঁ, হাত-পা ছড়িয়ে আরাম করে বসুন। আপনি নাকি কথা আরম্ভ করলে তার অবিরাম তোড়ে আর কারও কোনও কথা পাত্তা পায় না, তাই আমার কথাটা আগেই বলে রাখছি সেই শব্দকল্পদ্রুম নিয়ে। আমাদের এই বাংলা ভাষায় প্রথম শব্দ-কল্পদ্রুম কবে কে প্রকাশ করেছিলেন তা আপনাকে নতুন করে কী শোনাব? স্যার রাধাকান্ত দেববাহাদুরের সেই আশ্চর্য কীর্তিটি তখনকার হিতবাদী মেশিনের যন্ত্রে মুদ্রিত হয়েছিল বলেও মনে করতে পারছি। শুধু কোন সালে ছাপা হয়েছিল আর মুদ্রাকর কে ছিলেন, তাই নিয়ে মনে যা একটু সংশয় আছে। তা আপনি নিশ্চয় নিরসন করে দেবেন। আপনার অপেক্ষায় সেই আশাতেই আছি
ঘনাদা যেন ভক্তিভরে শিবুর আনা নতুন অতিথির দিকে চেয়ে প্রায় হাত জোড় করে মিনতি করবার ভঙ্গি করেছেন এবার।
কিন্তু শিবুর আনা নরহরি বা নরেশ্বরবাবু কেমন অসহায় অস্থিরভাবে, আজ্ঞে— আমায় বলছেন, মানে—আমি বলতে গিয়ে প্রায় তোতলা হবার উপক্রম হতে, থাক, থাক, আপনি স্বয়ং যখন উপস্থিত তখন যা জানবার সবই ঠিক সময়ে জানব, বলে তাঁকে তখনকার মতো রেহাই দিয়ে ঘনাদা তাঁর লাগাতার একক ভাষণ কোথায় যে নিয়ে গেছেন তা আগেই জানানো হয়েছে।
এর আগে ক-দিন যাঁর গলা দিয়ে একটা হাঁচিকাশির আওয়াজও আর বার হবে বলে সন্দেহ হচ্ছিল, সেই ঘনাদা হঠাৎ মুখে কেন যে বুকনির বান ডাকাচ্ছেন তা বুঝতে আমাদের তখন আর বাকি নেই। আহাম্মক শিবুকে একটু ভাল করে শিক্ষা দেবার জন্যই তার আমদানি করা পণ্ডিতকে একেবারে ছাল ছাড়িয়ে নেবার কী অবস্থায় যে এনে দাঁড় করিয়েছেন তা আমরা দেখেছি।
