আর-এক মানুষ সাজা কীরকম? কীরকম আর, কতকটা ভ্যাবাগঙ্গারামেরই কুটুম-ভাই বলা যায়।
যেন নেহাত ভালমানুষ। রাগ নেই, বিরক্তি নেই, নেহাত ঠাণ্ডা মেজাজের মানুষ। কিন্তু ক-এর কোন দিকে আঁকড়ি আর র-এর শূন্যটা কোন দিকে পড়ে, তাও যেন জানেন না।
মুখে একবার ম উচ্চারণ করলে যিনি মহাভারত না-আউড়ে থামতে পারেন না, সেই ঘনাদার কানের ফুটো যেন বন্ধ, আর জিভটা যেন অসাড়।
সাত চড়ে কেন, সাত-সাতে ঊনপঞ্চাশ সিধে আর বাঁকা জেরার খোঁচাতেও তাঁর মুখে রা নেই।
শুধু কি রা নেই! সাড়ই যেন নেই মগজে।
তাঁকে একটু জাগাবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি কি কিছু করেছি? বলতে গেলে বিশ্বকোষের স্বরে-অ থেকে শুরু করে অনুস্বর বিসর্গ পর্যন্ত হরফের কিছু না কিছু একবার করে নাড়া দিয়ে গেছি, কিন্তু ফল যা হয়েছে, তাতে আমাদের প্রায় দেওয়ালে মাথা খোঁড়া না হোক, দু-হাতে মাথার চুল ছেঁড়ার অবস্থা!
আড্ডাঘরে মজলিশ শুরু হবার কিছু পরে ইচ্ছে করেই একটু দেরি করে হাঁফাতে হাঁফাতে ঢুকে গৌর উত্তেজনায় যেন প্রায় তোতলা হয়ে বলেছে, শুনেছেন ঘনাদা, শুনেছেন, কুমেরু অভিযান থেকে কী খবর পাঠিয়েছে আমাদের এবারের কুমেরু অভিযাত্রী-দল?
কী খবর? আমরা উদগ্রীব হয়ে প্রায় ধরা গলায় জিজ্ঞেস করেছি, ভাল খবর, মন্দ?
ভাল খবর কী আর হবে! শিশির যেন এরই মধ্যে হতাশায় কাতর হয়ে বলেছে, খারাপ খবর নিশ্চয়ই। যেখানে ছ-মাসের শীতের রাতের জন্য ডেরা বাঁধা হয়েছিল, সেই গঙ্গোত্রীই বোধহয় ধসে তলিয়ে গেছে বরফের তলায়।
কী যা-তা বলছিস, আমি ওদের ধমক দিয়ে ঘনাদার শরণ নিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, সত্যি সেরকম কিছু হতে পারে, ঘনাদা? অতসব ঝানু ঝানু বৈজ্ঞানিকের দল বেছে বেছে অমন কাঁচা জায়গায় ডেরা পাততে পারে?
পারে না-পারে সে পরের কথা, শিবু আমায় ধমক দিয়ে থামিয়ে বলেছে, খবরটা কী, তা-ই আগে শোনো না। কী বলেন ঘনাদা, কাকে কান নিয়ে গেছে শুনে কানটা ঠিক আছে কি না, হাত বুলিয়ে না দেখেই কাকের পিছনে দৌড় দেওয়া কেন?
ঠিক, ঠিক, বলে শিবুর কথায় সায় দিয়ে এবার গৌরকে চেপে ধরা হয়েছে, খারটা কী তা জানবার জন্য।
কিন্তু গৌর তা বলতে পারেনি। তার কৈফিয়ত হল এই যে, বাস-এ আসতে আসতে ফুটপাতে বিকেলের বিশেষ খবর বলে এক ফেরিওয়ালাকে সে কুমেরুর জবর খবর! এই বেরিয়ে গেল বলে হাঁকতে শুনে এসেছে।
তা হাঁকতে শুনেও একটা বিশেষ খবরের পাতা কিনে নিয়ে আসেনি কেন?
তা কিনতে নামলে আর সেবাস কেন, কোনও বাস-এ কি ফিরতে পারত? গৌর চটপট জবাব দিয়ে জানিয়েছে।
খবরটা কী তাই যদি না জোগাড় করতে পেরে থাকে, তা হলে মিছিমিছি এখানে এসে আমাদের অমন অস্থির করে তোলবার দরকার কী ছিল?
আমাদের এ নালিশের উত্তর যেন গৌরের মুখস্থ ছিল। সে চটপট জবাব দিয়ে বলেছে, বাঃ, কাগজে ছাপা খবরটা না দেখেও ঘনাদা ব্যাপারটা শুনলে সেটা কি
অনুমান করতে পারবেন না? তাই জন্যই তো সেই শুধু জবর খবরটুকু শুনেই ঘনাদাকে সেটা জানাবার জন্যে ছুটে এসেছে।
শাবাশ! শাবাশ! গৌরের অকাট্য যুক্তিতে আমাদের বাহবা দিতেই হয়েছে।
কিন্তু লাভ কি কিছু হয়েছে তাতে? দিনকাল যখন আলাদা ছিল, তখন ওই একটা খেই ধরিয়ে দিলেই ঘনাদা তা থেকে কোন না পঞ্চাশটা ফ্যাঁকড়া বার করে আমাদের একেবারে মাথায় চক্কর লাগানো উপাখ্যান বুনে ফেলতেন!
আর কিছু না হোক, কুমেরুর ক-মাইল পুরু জমা বরফের নীচে থেকে ডাইনোসরদের হার-মানানো এক বিদঘুটে আজগুবি জানোয়ারের ফসিল কি আর আচমকা ঠেলে বার করতেন না দারুণ এক ভূমিকম্পে?
কিন্তু সে সব কেরামতি দূরে থাক, ঘনাদার কাছ থেকে একটু নড়েচড়ে ওঠার লক্ষণও দেখতে পাওয়া যায় না।
তার জন্য একটু খোঁচাতেও আমরা বাকি রাখি না।
জবর খবরটবর সব বাজে কথা, কী বলেন, ঘনাদা? শিশির ব্যাপারটাকে তাচ্ছিল্য করে ঘনাদাকে প্রতিবাদে উসকে দিতে চায়।
কিন্তু লাভ কিছু হয় কি? একেবারেই না।
এ যে ঠাণ্ডা কড়াইয়ে জলের ছিটে দেওয়া। ছ্যাঁক করে একটা শব্দও শোনা যায় না।
একটা বিকেলের জরুরি খবর কিনতে পাঠাব নাকি, ঘনাদা? আমি হাওয়াটা গরম রাখবার চেষ্টায় জিজ্ঞেস করলাম।
কিন্তু কাকে কী জিজ্ঞেস করছি? আমরা যাঁকে জাগাতে চাইছি, তিনি এখন কোমাতেই আচ্ছন্ন বললে অবস্থাটা কিছুটা বোঝানো যায়।
নেহাত জবাব না দিলে ছাড় নেই বুঝে যেন ক্লান্ত, নির্বিকারভাবে বললেন, তা আনাও! তবে—
সত্যিই আনাতে হলে যে বিপদ হত, ওই তবে টুকুর জোরে সেটা এড়িয়ে, তাড়াতাড়ি বলতে হল এবার, হ্যাঁ, আনতে পাঠানোতে লাভ নেই। কী না কী বিশেষ খবর, এতক্ষণ কি আর তা বিক্রি হয়ে যেতে কিছু বাকি আছে? তবে খবরটা ওই দক্ষিণ গঙ্গোত্রীরই নিশ্চয়, কী বলেন আপনি?
গঙ্গোত্রী শব্দটাই যেন প্রথম শুনলেন, এমনভাবে নির্বোধের মতো আমাদের দিকে চেয়ে ঘনাদা শুধু শব্দটা আর একবার উচ্চারণ করে বললেন, গঙ্গোত্রী বলছ? তা সে গঙ্গোত্রী–
সলতে একটু ধরেছে আশা করে উৎসাহভরে বললাম, হ্যাঁ, কুমেরুর যে জায়গাটায় আমাদের অভিযাত্রীরা ছ-মাস দিনের পর ছ-মাস রাতও কাটাবে বলে পাকা আস্তানা তৈরি করেছে, সেটারই ওরা গঙ্গোত্রী মানে দক্ষিণ গঙ্গোত্রী নাম দিয়েছে না!
কী বললেন এবার ঘনাদা। নিভু নিভু সলতেটা একটুও এবার ধরল কি?
না, আমাদের সব চকমকি ঠোকা বৃথা। ঘনাদা যা বললেন, তাতে ভিজে সলতে একটু শুকোবার লক্ষণও নেই।
