ঘনাদার বেয়াড়াপনা এবার ছিল একটু নতুন ধরনের। না অসহযোগ-টোগ নয়, তার বদলে যেন একেবারে ন্যাকা সেজে যাওয়া। আমাদের কথায় কান দেন না এমন নয়, কিন্তু ফল তার হয় বিপরীত। ধান শুনতে কান তো শোনেন বটেই, সে কানও আবার শব্দ শোনবার সহায়, না জল থেকে নিশ্বাসের হাওয়া সংগ্রহের জন্য মাছেদের কানকোর অক্ষর-সংক্ষেপে কিনা, তাই যেন ঠিক করতে পারেন না।
বেয়াড়াপনাটা আরম্ভ করেছিলেন অবশ্য শিবুরই দোষে। কথায় কথায় কেমন করে দক্ষিণ আমেরিকায় যার জন্ম, পৃথিবীর সেই সবচেয়ে হালকা বালসা কাঠের ভেলায় যাঁরা পেরু থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পার হয়ে পলিনেশিয়ার এক নগণ্য দ্বীপে এসেছিলেন, তাঁদের কথা হচ্ছিল। শিবু তার মধ্য দিয়ে নিজের বিদ্যে জাহির করবার জন্য একটু ফোড়ন কেটে বলে ফেলেছিল, নামগুলো একটু সাবধানে উচ্চারণ করতে হয় কিন্তু, ঘনাদা। এক-আধটা তো নয়, অমন পাঁচ-সাতটা ভাষার খিচুড়ি। বানান ঠিক রাখাই প্রায় অসম্ভব।
ও, তাই বুঝি? ঘনাদা যেভাবে হঠাৎ যেন অপ্রস্তুত হবার ভঙ্গিতে শিবুর দিকে ফিরে তাকিয়েছিলেন, শিবুর তাতেই হুঁশ হওয়া উচিত ছিল।
তার বদলে আহাম্মকটা আরও মাতব্বরির চালে বলেছিল, হ্যাঁ, এই দেখুন না, ওই বালসা কাঠের পালতোলা একটা ভেলা, কোনওরকম লোহা পেতল কি তামার পেরেক ইস্ক্রপ ছাড়া শুধু বুনো লতার দড়িতে বেঁধে যিনি পেরু থেকে প্রায় গোটা প্রশান্ত মহাসাগরটাই পার হবার আজগুবি কল্পনায় ক-জন নিজেরই মতো আধপাগলা বন্ধু জোগাড় করে সমুদ্রে ভেসেছিলেন—
নিজের উৎসাহে নাগাড়ে বকে যেতে যেতে হঠাৎ ঘনাদার দিকে চোখ পড়ায় শিবু একটু থেমেছিল।
ঘনাদা তখন তার দিকে আদার ব্যাপারির কাছে যেন সওদাগরি জাহাজের খবর বলা হচ্ছে, কিংবা বলা যায় প্রথমভাগের পড়ুয়ার কাছে যেন মুগ্ধবোধের শ্লোক পড়া হচ্ছে, এমনভাবে বোকা সেজে চেয়ে আছেন।
এ চেহারা দেখেও হুশ কি হয়েছে শিবুর? মোটেই নয়। নিজের বাহাদুরিতে সে যেন আরও উৎসাহিত হয়ে ঘনাদাকে জ্ঞান দিয়ে বলেছে, হ্যাঁ, ওই থর হেয়ারডালের কথাই বলছি। উচ্চারণটা হেয়ারডাল কি না তারই বা ঠিক কী?
হ্যাঁ, শিবুর কথার মধ্যেই ঘনাদা হঠাৎ তাঁর আরামকেদারায় সোজা হয়ে বসে তাঁর বিদ্যাসাগরি চটিতে পা গলাতে গলাতে বলেছেন, ও সব ঝামেলায় না যাওয়াই ভাল।
তারপর আমরা কেউ কিছু বলবার করবার আগেই ঘনাদাকে বারান্দার দরজা দিয়ে সোজা ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে দেখা গেছে।
কিন্তু আমাদের মতোই হতভম্ব শিবুর মুখ দিয়ে শুধু ওই শব্দটি যখন বেরিয়েছে, ঘনাদার বিদ্যাসাগরি চটি তখন ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ির প্রথম ধাপ ছাড়িয়ে গেছে। বিদ্যাসাগরি চটির তাল দেওয়া চটপটির সঙ্গে ঘনাদার শেষ যা কথা শোনা গেছে, তা হল, ঠিক! ঠিকই বলেছ। হাতেখড়ি না হতেই চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নিরেট আহাম্মকেরাই করতে যায়।
০২. কী হয়েছে তারপর থেকে
কী হয়েছে তারপর থেকে?
তাঁর টঙের ঘর থেকে ঘনাদা আর নামাই দিয়েছেন বন্ধ করে। এর আগে যেমন বহুবার হয়েছে, তেমনই বোয়ারি আর রামভুজের বকলমেই আমাদের সামান্য যা-কিছু বিনিময় চলছে।
প্রতিদিন সকালের খবরের কাগজগুলো আগে থাকতে নিজের ঘরে আনিয়ে ঘনাদা তার বাড়িভাড়ার পাতাগুলোতে বেছে বেছে তাঁর মনের মতো ভাড়াবাড়ির বিজ্ঞাপনে লাল কালিতে দাগ মেরেছেন কোথায় কোথায় তিনি উঠে যেতে পারেন তা আমাদের জানাবার জন্য?
না, না। ও সব কিছু নয়। ওরকম কোনও বদমেজাজ কি বেয়াড়াপনার কোনও লক্ষণই তাঁর মধ্যে এবার নেই। বরং বলা যায়, তিনি যেন আরও মোলায়েম, আরও আরও মাটির মানুষ হয়ে উঠেছেন এই কিছুদিন থেকে।
আড্ডাঘরে এসে জমায়েত হয়ে ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িতে তাঁর বিদ্যাসাগরি চটির চটপটানির জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে আর অপেক্ষা করতে হয় না কোনওদিন। আমাদের কেউ সে ঘরে গিয়ে ঢোকবার আগেই দেখা যায় তিনি সেখানে প্রসন্ন মুখে তাঁর মৌরসি কেদারা দখল করে হাজির।
হ্যাঁ, শুধু হাজির নন, একেবারে রীতিমতো হাসিমুখেই তিনি সেখানে উপস্থিত। আমাদের মধ্যে প্রথম যে গিয়ে উপস্থিত হয়, কুশল প্রশ্নটুকু তাকে করতে তিনি ভোলেন না। যেমন, আজ একটু দেরি হল যে? শরীর ভাল তো?
বাহাত্তর নম্বরের ইতিহাসে যা কখনও শোনা যায়নি, আচমকা একেবারে অপ্রত্যাশিত তেমন প্রশ্ন প্রথম শুনে বেশ একটু ভড়কে গিয়ে আমাদের মুখ দিয়ে কিছু অস্পষ্ট অ্যা—মানে হ্যাঁ গোছের অব্যয়ধ্বনি যদি বেরিয়ে যায়, তাতেও কিছু আসে যায় না। কারণ, ঘনাদা তাঁর আগের প্রশ্নের উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করে বিষয়ান্তরে চলে যান। সেই দ্বিতীয় উক্তিটি শুনতে খারাপ না লাগবার হলেও বেশ চমকপ্রদ।
বায়না দিয়ে এলাম, ঘনাদা হয়তো বেশ একটু চমকে দিয়ে বলেন, ওই এক চেঙাড়ি মানে দশ গণ্ডারই বায়না দিয়ে এলাম, বুঝেছ?
বুঝতে আমাদের একটু দেরি হলে তিনি আরও বিশদ হয়ে বলেন, হিঙের কচুরির বায়না হে! ওই শিবু হালুইকরের হিঙের কচুরির। সবে দেখলাম কড়া চাপিয়ে লেচি বেলে ভাজা শুরু করেছে। তাই দিয়ে এলাম এক চেঙাড়ি মানে দশ গণ্ডারই বায়না। কী বলল, ঠিক করিনি?
ঠিক না তা কি বেঠিক কিছু করেছেন? করলেও সে কথা কে বলবে? তাই সানন্দেই তাঁর কথায় সায় দিই।
কিন্তু তারপর?
সেই তারপর নিয়েই হয়েছে যত গোল।
ঘনাদা রাগ করেন না, মেজাজ দেখান না। আমাদের বর্জন করবার কোনও লক্ষণও তাঁর কোনও কিছুতেই নেই। শুধু তিনি যেন—তিনি যেন—না, সোজাসুজি বলেই ফেলি কথাটা, তিনি যেন সাধ করে আর-এক মানুষ সেজে আমাদের নাক কানগুলো মলে দিচ্ছেন।
