ঘনাদার কথা আরম্ভ হবার সঙ্গে সঙ্গেই আমি বাজারের হিসেবের খাতার একটা সাদা পাতায় অক্ষর ক-টা লিখে নিয়েছি।
এরপর ঘনাদাও যেমন বলে যান, আমিও এক নাগাড়ে সব লিখে নিই আমার খাতায়। ঘনাদা কত বড় স্মৃতিধর বাহাদুর, তার প্রমাণ এই খাতাই এরপর দেবে। গৌর আছে আমার পাশেই বসে। ঘনাদার উচ্চারণগুলো এক এক করে খাতায় লেখার সময় তা সাক্ষী হিসেবে তাকে দেখিয়ে তো রাখছি আমি।
প্রথম পাঁচটা অক্ষরের পর ঘনাদা তখন বলছেন, এ, আই, আর, পি, ডব্লু, এল, এল, জি, ডব্লু, ওয়াই, এন, জি, ওয়াই, এল, এল, জি, ও, জি , ই , আর, ওয়াই, সি, এইচ, ডব্লু, ওয়াই, আর, এন, ডি, আর, ও, বি, ডব্লু, এল, এল, এল, এল, আই, এ, এন, টি, ওয়াই, এস, আই, এল, আই, ও, জি, ও, জি, ও, জি, ও, সি, এইচ।
ঘনাদার বলা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে আমার লেখাও শেষ করে সামনের টেবিলের ড্রয়ারে খাতাটা রেখে দিয়ে একটু বোকা সেজেই বললাম, এতগুলো অক্ষর তো আউড়ে গেলেন, কিন্তু সেগুলো ঠিক না ভুল তার প্রমাণ তো আর আমাদের হাতে নেই। আবোলতাবোল বলে গেলেই বা ধরব কী করে?
ধরতে পারা যাবে না বলেই ঘনাদার মুখে একটু বাঁকা হাসি। আপনি কী বলেন, নরোত্তমবাব? ঘনাদা আবার সেই শিবর আনা অতিথির দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলেন, কী বলেন নরসিংহবাবু, হরফগুলো ঠিক না বেঠিক, তা ধরবার কোনও উপায় নেই?
শিবুর নিয়ে আসা নতুন অতিথির এবার প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখ। প্রায় মিনতির সুরে তিনি বলবার চেষ্টা করলেন, দেখুন, আমি মানে, আপনাকে মিনতি করে বলছি—
না, না, মিনতি করবেন কেন? ঘনাদা ভদ্রলোকের মুখের চেহারা আর গলার করুণ সুরে এতক্ষণে বুঝি নিজের ধারণা আর ব্যবহার সম্বন্ধে একটু সন্দিগ্ধ হয়ে সুর একটু পালটে তাঁকে যেন সাহস দিয়ে বললেন, যা বলবেন তা একেবারে তাল ঠুকেই বলবেন। বলার মুরোদ যার আছে, যা বলবার, সে তো তা সাহস করে বলবে। বলুন না আপনি, আটান্নটা হরফ, যা শোনালাম, তা প্রলাপ না সাচ্চা বানান, তার হদিস কোথাও মেলা কি সম্ভব?
নরেশ্বর বা নরোত্তম, নামটা যাই হোক, শিবুর নিয়ে আসা ভদ্রলোক এবারে মরিয়া হয়েই বুঝি একটু সাহস সংগ্রহ করে বললেন, আজ্ঞে হ্যাঁ, সম্ভব।
সম্ভব?
আমরা সবাই তো বটেই, স্বয়ং ঘনাদাও এবার বুঝি কেমন একটু চমকিত।
সম্ভব বলছেন তো আপনি? জোর দিয়ে বলার চেষ্টা সত্ত্বেও ঘনাদার কেমন একটু দ্বিধান্বিত জিজ্ঞাসা, ঠিকঠাক, না আবোলতাবোল বানান বলেছি, তা ধরে ফেলার উপায় তা হলে আছে বলছেন আপনি?
হাঁ, বলেছি। শিবুর নিয়ে আসা অতিথি নরহরি বা নরেশ্বরবাবু আরও যেন বেপরোয়া হয়ে বললেন, আর কোথাও না হোক, আপনাদের এখানে শুধু তা কেন, সাপের পাঁচ পা-ও হওয়া সম্ভব।
সাপের পাঁচ পা? আমাদের আর বিস্ময়ের ভান করতে হল না এবার।
আমাদের সকলের বক্তব্যই ঘনাদার মুখ দিয়েই বার হল, সাপের পাঁচ পা? সাপের পাঁচ পা আবার কোথা থেকে এল?।
কোথা থেকে এল? নরেশ্বর না নরহরি নামের ভদ্রলোক অনেক সয়ে এবার যেন পুরোপুরি খাপচুরিয়াস—এল আপনাদের এই গারদ মানে পাগলাগারদের গুণে। সাপের পাঁচ পা কেন, আপনাদের এই বদ্ধ পাগলের গারখানায় সবকিছু হওয়া সম্ভব। এখানে যাহা বাহান্ন, তাকে আপনারে তেষট্টি মাত্র নয়, পোস্তার আলুপট্টি করে দিতে পারেন। তিন-তিরিক্ষে নয়-ও আপনাদের এই মাথার ঘিলু-গলানো আসরে তিরুপল্লির তিন্তিড়ি হয়ে যেতে পারে—
শাবাশ, শাবাশ। শিবুর নিয়ে আসা নরহরি না নরেশ্বরবাবুর তাল-মেলানো গজরানির মাঝে ঘনাদার অমন তারিফ শুনে আমরা অবাক। শাবাশ বলে তারিফ জানিয়েই ঘনাদা থামলেন না, সোৎসাহে শিবুর আনা অতিথি নরহরি না নরেশ্বরবাবুকে নিজের সমর্থন জানিয়ে ঘনাদা বলে চলেছেন, চালিয়ে যান, চালিয়ে যান।
কিন্তু নরহরি বা নরেশ্বরবাবুর মেজাজটা তখন ওই দুটো শাবাশ ছিটিয়ে শান্ত করবার নয়। তপ্ত তেলের কড়ায় জল পড়ায় তিনি যেন আরও চিড়বিড়িয়ে উঠে বললেন, চালিয়ে যেতে বলছেন আমাকে? বলতে লজ্জা করছে না? সাতে নেই, পাঁচে নেই, আমি মশাই নেহাত সাদাসিধে কলের জলের কনট্রাকটর। করপোরেশনের কলের জলের পাইপ লাগানো আর মেরামতের মিস্ত্রিও বলতে পারেন। সেই আমাকে আপনাদের কোথায় কলের জলের নতুন পাইপ লাগাতে হবে বলে ডাকিয়ে এ কী জুলুম আর শাস্তি!
একটু থেমে থেকে শিবুর দিকে আঙুল তুলে করপোরেশনের জলের কলের কনট্রাকটর আবার বলতে শুরু করলেন, উনি, ওই উনিই তো আমায় ডাকিয়ে এনেছেন। এখানে আসবার আগে অবশ্য আগে থাকতে একটু সাবধান করে বলে দিয়েছিলেন, আমি যেন নিজে থেকে কথা বলে নিজের পরিচয়-টরিচয় না দিই। ওই ওঁর ইশারা না পাওয়া পর্যন্ত চুপ করে সব শুনেই যাই। কিন্তু সেই শুনে যাওয়া মানে কি এই যন্ত্রণা? আমার নামটা নিয়ে পর্যন্ত কী হেলাফেলা! পেঁচিয়ে দুমড়ে থেঁতলে নরহরি না নরেশ্বর বানানো! শুনুন, আমার নাম নরহরি বা নরেশ্বর-টর নয়। সরল সোজা তিন অক্ষরের নবীন। বুঝেছেন?
নবীনবাবু তাঁর গায়ের জ্বালায় অনেক কথা যখন বলে যাচ্ছেন, ঘনাদার এই ক-দিনের লাগাতার ভাষণের ঝোঁকের রহস্যটা তখন ধরে ফেলেছি। কেরামতিটা অবশ্য শিবুর।
মাঝে-মাঝে যেমন হয়, বাহাত্তর নম্বরে তেমনই কিছুদিন আগে থেকে একটা গুমোটের পালা চলছিল। খুচখাচ তোয়াজ-তারিফ যা কিছু সম্ভব, যোলো আনার জায়গায় আঠারো আনা করেও ঘনাদাকে একটু হাঁ করাতেও যেন পারছিলাম না।
