কিন্তু বলছেন তিনি কী? আর কী নিয়ে?
শ্যামবাজারে গল্প শুরু করে হঠাৎ টালা হয়ে একেবারে নিউ আলিপুর গেলেও তবু তার মধ্যে কিছু মানে থাকতে পারে, কিন্তু এ যে জামতাড়া দিয়ে শুরু করে পাজামার কথায় জড়িয়ে পড়ে জামরুল কিনতে ছোটা!
কত কী-ই না তিনি আমাদের এর মধ্যেই শুনিয়েছেন। এক কথায়, কোথায় না নিয়ে গিয়েছেন!
আরম্ভই করেছিলেন, নরেশ্বর নামটা শুনে একেবারে নরওয়ের উত্তরে পোলার বিয়ার মানে সাদা ভাল্লুকের জন্য চোখের জল ফেলে।
থাকবে না, থাকবে না! প্রায় চাপা কান্নার সুরে বলেছিলেন, নরওয়ের ওই কড়া আইন সত্ত্বেও সাদা ভাল্লুক সেখানে কেন, দুনিয়াতেই আর থাকবে না। এখন অবশ্য সারা বছরে গোনাগুনতি কটি মাত্র মারবার অনুমতি দেওয়া হয় শিকারিদের। কিন্তু চোরাশিকারিরা লুকিয়ে লুকিয়ে ছাল পাচারের লোভে আরও কত অমন মেরে শৌখিন মেরু-টহলদারদের খুদে প্লেনে সরিয়ে ফেলছে, কে তার হিসেব রাখে! তাই বলছি, নরওয়ের কথা আমায়, ভাই, বোলো না। বড় আফশোস হয়।
না, না। নরওয়ের কথা বলিনি আপনাকে, শিশির সংশোধনের চেষ্টা করে বলেছিল, বলছিলাম ওঁর নাম হল নরেশ্বর। উনি
আর বেশি কিছু বলবার ফুরসত পায়নি শিশির। ঘনাদা তখন নরওয়ের সাদা ভাল্লুক ছেড়ে একেবারে নামাবলির রহস্য নিয়ে মেতে উঠেছেন।
নাম? নামের মজার কথা যদি বলতে হয়, ঘনাদা নামকীর্তনের মত গদগদ হয়ে বলতে শুরু করেছেন, তা হলে দুনিয়ার সেই সবচেয়ে সৃষ্টিছাড়া আজগুবি নামটার কথাই বলতে হয় নিশ্চয়। সেই আজগুবি, কিন্তু মিথ্যে ধাপ্পা-টাপ্পা কিছু নয়, সত্যিকার একটা ছাপার অক্ষরে ছাপা সাইনবোর্ডে জ্বলজ্বলে করে লেখা নাম। খুব বেশি নয়, মোট আটান্নটি অক্ষর সে নামের। নামটা আর কিছুর নয়, একটা রেল স্টেশনের। জংশন-টংশন গোছের বড় স্টেশন নয়, নেহাত খুদে একটা সামান্য স্টেশন। ইউরোপ, আমেরিকা, চীন কি রাশিয়ার বিরাট কোনও রেললাইনেরও নয়, জায়গাটা বিলেত হলেও তার মফসসলের মফসসল ওয়েলসের একটা লেভেল ক্রসিং-এর চেয়ে মান্যে বড় কিছু নয়। কিন্তু সেই বিলেতি ধ্যাড়ধাড়া গোবিন্দপুরের নাম কী একখানা! কী, মনে পড়ছে নিশ্চয়ই নরহরিবাবুর?
ঘনাদার দৃষ্টিটা এবার সোজাসুজি নরেশ্বর বলে শিবু যাকে পরিচিত করতে চেয়েছিল, সেই বেশ একটু যেন ঘামতে-শুরু করা, মোটাসোটা নিরীহ চেহারা ভদ্রলোকের দিকে।
ঘনাদার আজকের এতক্ষণের বন্ধুাছাড়া বাক-বিস্তারের রহস্যের খেই কি এখানে আছে মনে হয়?
তা নিয়ে ভাববার ফুরসত তখন আর মেলেনি। ঘনাদা তাঁর দৃষ্টি আবার আমাদের সকলের উপর বুলিয়ে নিতে নিতে যেন একটু লজ্জিতভাবে বলেছেন, আমারই কি আর সব ঠিক মনে পড়বে? এক-আধটা তো নয়, পুরো আটান্ন হরফের নাম। আর সে এমন ভাষায়, যাতে বেশিদিন কথা বললে মাথায়-জিভে জট পাকিয়ে ঘিলুতেই গোলমাল হয়ে যায় মনে হয়। তবু-
মানে? আবার আমাদের সবিস্ময় জিজ্ঞাসা, সেই আটান্ন হরফের স্টেশনের নামটা আপনার মনে আছে নাকি?
থাকা কি আর সম্ভব? ঘনাদা কেমন একটু তাল ঠোকার ভঙ্গিতে শিবুর আনা অতিথি নরেশ্বরবাবুর দিকে চেয়ে তারপর যেন গলায় কিছুটা বিনয়ের সুর আনবার চেষ্টা করে বললেন, তবু দেখি একবার চেষ্টা করে। এই যেমন—
ঘনাদা একটু থামলেন। আমরা সবাই উদগ্রীব হয়ে তাঁর মুখের দিকে তখন তাকিয়ে।
কী করবেন এবার ঘনাদা?
সত্যি সত্যি রামধাপ্পা দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে মগডাল থেকে মুখ থুবড়ে পড়বেন নাকি মাটিতে?
ধাপ্পায় উনি ধুরন্ধর, একথা মেনে নিয়েও বলি, সব গুলবাজিরই যে একটা সীমা আছে, তাও তো ওঁর জানা উচিত!
বিলেতের ওয়েলস অঞ্চলের একটা খুদে রেলস্টেশনের যে শুধু দাঁতভাঙা নয়, পুরোটা বলতে দম ফুরিয়ে যাবার মতো একটা নাম আছে, সেই খবরটা কেউ কি আর আমরা শুনিনি? দু-চারটে নয়, পুরো বানান করে বলতে গেলে তাতে সাতান্ন না আটান্নটা অক্ষর লাগে, তাও আমাদের অজানা নয়, কিন্তু তাই বলে সেই আটান্ন অক্ষরের নামটা হরফ ধরে ধরে পুরোটা বলে যাওয়ার স্পর্ধা?
কী ভেবেছেন ঘনাদা? ক-এ আকার কা, আর খ-এ আকার খা যাদের কাছে এক, তেমন গোমুখদের যা শুনিয়ে দেবেন, তাই তারা না মেনে নিয়ে করবে কী?
কেন, আমাদেরও করবার কিছু নেই নাকি? আর কিছু না জানি, গিনেসের বুক অব রেকর্ডস-এর নামটা তো অজানা নয়। দেখি না একবার এবার ঘনাদার দৌড়টা। টেবিলের উপর বাজারের হিসেবের খাতাটা পড়ে রয়েছে। সেটাই টেনে নিয়ে ঘনাদাকে একটু উসকানি দিয়ে বললাম, তা আপনি পারেন নাকি সত্যি ওই আটান্নটা হরফের নামটার কিছুটা অন্তত বলতে? সব না পারেন, আটান্নর মধ্যে তিন-আটে চব্বিশটা পারলেই বাজিমাত।
না, না, চব্বিশটা কেন? বলতে গেলে পুরো আটান্নটাই না বললে তো বাহাদুরি না করতে যাওয়াই ভাল। ঘনাদা আমাদের বেশ একটু অপ্রস্তুত করে এই মজলিশে শিবুর আনা আজকের অতিথির দিকে ফিরে বললেন, কী বলেন, নরেশ্বরবাবু?
আজ্ঞে, আমি, মানে— শিবুর আনা আজকের অতিথি চারবার ঢোক গিলে কেমন যেন একটু তোতলা হয়ে যা বলবার চেষ্টা করলেন, তা ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারার আগেই ঘনাদা তাঁকে যেন ভুলে গিয়ে নিজের আগের কথাতেই ফিরে গেলেন। বললেন, হ্যাঁ, পারি না-পারি চেষ্টা তো করে দেখতে দোষ নেই। এই যেমন নামটার প্রথম পাঁচটা অক্ষর হল—এল, এল, এ, এন, এফ।
