সেই উলটো বজ্রপাতের ধাক্কাতেই বালির ওপর তখন মুখ থুবড়ে পড়েছি। কিছুক্ষণ বাদে উঠে বসে মুখ ঘুরিয়ে শূন্যযানটাকে আর দেখতে পাইনি। লুটভিক তার সঙ্গেই নিজেকে শেষ করেছে, না অন্য কোনও দিকে আগেই পালিয়েছে, তা জানি না এখনও।
আচ্ছা! ঘনাদা থামতে কার্ডিওগ্রাম সান্যাল শেষ সংশয়টা আর প্রকাশ না করে পারলেন না, মাঙ্গলিকদের অমন মানুষের চেহারা হল কী করে? তারা তো মানুষ নয়!
না, তারা মানুষ নয়, কিন্তু আমরাই তো আসলে মাঙ্গলিক হতে পারি! ঘনাদা শেষ ধাঁধাটি ছাড়লেন, লক্ষ লক্ষ বছর আগে মাঙ্গলিকরাই এসে পৃথিবীতে মানুষ জাতের গোড়াপত্তন যে করেনি তা কে বলতে পারে! মিসিং লিংক এখনও তো ঠিক পাওয়া যায়নি।
এর পর আমাদের চোখগুলো যদি চড়কগাছ হয় তাহলে সে কি চোখের দোষ?
মান্ধাতার টোপ ও ঘনাদা (উপন্যাস)
০১. প্রথম মহাপ্রলয়ের বন্যা
প্রলয়পয়োধিজলে ধৃতবানসিবেদং
বিহিতবহিত্ৰচরিত্রমখেদ…
প্রথম মহাপ্রলয়ের বন্যায় সমস্ত সৃষ্টিকে যিনি চরম বিলুপ্তি থেকে রক্ষা করেছিলেন, সেই মৎস্যাবতারের যথার্থ পরিচয় বিজ্ঞান কি আজও জানে?
সেই মৎস্যাবতার স্বয়ং যদি আদি মনুর রক্ষক হন, তা হলে একমাত্র মান্ধাতার টোপই তাঁকে ধরবার যন্ত্র নয় কি?
কে সেই আদি মংসাবতার? মান্ধাতার টোপের রহস্যই বা কী? এ সব অতল রহস্যের মীমাংসা যথাস্থানে ও যথাসময়ে হবে আশা করে, আর কেউ নয়, স্বয়ং ঘনাদার বিরামহীন আলাপন এবার শোনা যেতে পারে বোধহয়।
হ্যাঁ, আমাদের সকলকে বিস্মিত বিহ্বল করে তিনি সম্প্রতি দাঁড়ি কমা-ছেদহীন যে ভাষণ দিয়ে চলেছেন, কোনও দিক দিয়ে তার কোনও কূলকিনারা না পেয়ে আমরা সত্যিই দিশেহারা।
বোঝসোঝার চেষ্টা না করে সেই কলস্বর-প্রবাহে ভেসেই না হয় যাওয়া যাক। ঘনাদা বলে যাচ্ছেন:
তা আমার কাছে কেন? শার্লক হোমস না হয় নেই, কিন্তু অ্যারকিউল পোয়ারোর কাছে গেলেই তো পারতেন? আর তা-ও না পেরে উঠলে পেরি ম্যাসনকে ভুলে গেলেন কেন?
বলতে গেলে সারা দুনিয়া তন্নতন্ন করে খুঁজে ভূমধ্যসাগরের এই নিতান্ত খুদে আর তখনকার প্রায় অজানা নির্জন দ্বীপে ভাড়া করা জেলে-নৌকোয় কোনওক্রমে যাঁরা আমার সন্ধান করে এসে নেমেছেন, তাঁদের মুখে প্রথমে কোনও কথাই নেই।
আমার গলার স্পষ্ট বিরক্তিতে বেশ একটু বেসামাল হয়ে দুই নতুন আগন্তুকের মধ্যে বয়স যাঁর একটু বেশি, সেই রোগাটে চিমসে চেহারার টাকমাথা মানুষটি আমতা-আমতা করে বললেন, আজ্ঞে, দেখুন—মানে—
আজ্ঞে দেখুন—অর্থাৎ কিনা—মানে-ও সব বুকনি ছেড়ে একটু ঝেড়ে কাশুন দেখি। একটু ধমকে দিয়েই এবার বললাম, ব্যাপার যা বুঝছি, তাতে মনে হচ্ছে হঠাৎ গা-ঢাকা-দেওয়া দুনিয়ার এক সেরা ধাপ্পাবাজকে হন্যে হয়ে আপনারা খুঁজছেন। কিন্তু তাকে খুঁজতে দুনিয়ার সব বাঘা বাঘা ফাটকা বাজার ছেড়ে আমার কাছে কেন?
তোর কাছে কেন? শোন তবে উচ্চিংড়ে! দুই আগন্তুকের মধ্যে বয়সে যে ছোট, কিংকং-এর ছোট ভাইয়ের মতো চেহারা, সেই দৈত্যটি আমার একটা হাত মুচড়ে ধরে এবার বললে, শোন তবে তেলাপোকাটা, দুনিয়ার টিকটিকি-মহলে মস্ত এক ঝানু ঘুঘু বলে তোর নাকি দারুণ সুনাম! তাই তোকে আমাদের মক্কেলকে এক মাসের মধ্যে খুঁজে বার করবার হুকুম দিতে এসেছি। পারিস যদি তা হলে একটা মেডেলই হয়তো পেয়ে যাবি, আর না পারলে গর্দানটাই দেব মটকে। বুঝলি?
বাঃ, বাঃ। মনে-মনে তখন আমি যে দারুণ খুশি হয়েছি, তা বোধহয় আর বুঝিয়ে বলতে হবে না। মৎস্যাবতারের আশায় কবছরের আজব এক তল্লাশির টহলদারিতে কখনও জেলেদের, কখনও সাধারণ ব্যবসায়ীদের ডিঙিতে আর সুলুপে ঘুরতে-ঘুরতে নেহাত নরম নরম মানুষজনের সঙ্গে দিন কাটিয়ে হাত-পাগুলোয় যখন বাত ধরে গেছে, তখন একটু হাত-পা নাড়াচাড়া করতে পারলে যেন বাঁচি।
কিংকং-এর ছোট ভাই তখন দাঁতে-দাঁত-চাপা গলায় বলে যাচ্ছেন, তা আমাদের কথায় একটু কান দেবেন, না একটার বদলে দুটো কানই মেরামতের জন্য আমরা ছিঁড়ে নিয়ে যাব?
ওপরে যে বাক্যালাপের বিবরণটুকু এ-পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে, তা যে আমাদের এই কলকাতা নগরীর বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের ঠিকানায় একটি নাতিজীর্ণ নাতিনবীন আড়াইতলা বাড়ির একটি বিশেষ আড্ডাঘরে ছাড়া আর কোথাও হতে পারে না, এবং সে-বিবরণদাতা যে স্বয়ং তেতলার টঙের ঘরের তিনি, মানে একমেবাদ্বিতীয় ঘনাদা ছাড়া আর কারও হওয়া সম্ভব নয়, সে কথা বিশদ বুঝিয়ে বলবার প্রয়োজন নিশ্চয় নেই।
হ্যাঁ, বিবরণ যা শুনছি তা স্বয়ং ঘনাদাই দিচ্ছেন। শুধু তাই নয়, দিচ্ছেন প্রায় ঊর্ধ্বশ্বাসে বলা যেতে পারে। দিনের পর দিন সাধনা করে বড় রাস্তার মোড়ের হালুইকরের ক্ষীরের পান্তুয়া লেডিকেনি থেকে শুরু করে চৌরঙ্গিপাড়ার সেরা মোগলাই পরোটা আর মুরগমসল্লমের ঘুষ দিয়ে যাঁকে দিয়ে এক-এক সময় একটা অব্যয় শব্দও বলানো যায় না, সেই ঘনাদার এ কী অবিশ্বাস্য রূপান্তর। আজকের বিকেলের আড্ডাঘরে আর কেউ আসবার আগেই ন্যাড়া ছাদের সিঁড়ি দিয়ে রেডিয়োর সিগন্যাল টিউনের মতো তাঁর বিদ্যাসাগরি চটির স্বাক্ষর চটপটি ধ্বনি তুলে নিজের মৌরসি কেদারাটি দখল করে সবাই এসে হাজির হবার আগেই একনাগাড়ে সেই যে বলে চলেছেন তার আর বিরাম নেই। বলা মানে একেবারে লাগাতার, যেন এক নিশ্বাসে বলা। আর সে-বলায় থামলে যেন কেউ তাঁকে কোতল করবে, এমনই তাঁর অস্থিরতা।
