সেই পোশাক খোলার পর তাদের আসল চেহারা দেখলাম। সেই সঙ্গে খিল খিল করে হাসিটা ফাউ।
কিন্তু এ কী দেখছি।
দশ-দশটা মেয়ের কাকে ছেড়ে কাকে দেখব! সব যেন তিলোত্তমার ছাঁচে নিখুঁত করে ঢালা।
কিন্তু দশটাই মেয়ে? প্রশ্নটা কার্ডিওগ্রাম সান্যালের, ছেলে নেই?
না, ঘনাদা একটু যেন দুঃখের হাসি হাসলেন, সেই কথাই তখন বলতে যাচ্ছিলাম। মাঙ্গলিকরা কমতে কমতে শুধু মাত্র দশটাতেই পৌঁছয়নি, তাদের সবাই আবার মেয়ে। তারা একবার ছেলে হাতে পেলে কি ছাড়ে! বটুককে আগেই ধরেছিল, সুরঞ্জনকেও ছাড়ল না। মঙ্গলগ্রহের ইতিহাসটা যাতে অচল না হয়ে যায় তাই জোর করে ফিরিয়ে আনতেও মন উঠল না।
আর আপনি? হাসিটাকে ঠোঁট টিপে চেপে জিজ্ঞাসা করলে শিবু, আপনাকে যে ছেড়ে দিলে?
আমাকে! ঘনাদা যেন ক্ষণিকের জন্য উদাস হয়ে গেলেন—আমাকে কি আর ছাড়তে চায়! পৃথিবী থেকে আরও ছেলে আনবার ভরসা দিয়ে অনেক কষ্টে ছাড়া পেয়ে এসেছি।
সে কথা আর রাখতে পারেননি তো? গৌরের গভীর আফশোস।
কী করে আর রাখব? ঘনাদার হতাশ স্বীকৃতি—প্রথমত পাতালপুরীর যে নামটা দিয়েছিলাম সেই ধাঁধিকা থেকে সুরঞ্জনেরই স্পেস স্যুট পরে বেরিয়ে আসবার মুখেই আবার সেই বুকের কষ্ট। কী ভাগ্যি, কাঠ-পোড়া ছাই একটু সঙ্গে রেখেছিলাম। তাই মুখে দিয়ে তখনকার মতো ধাক্কাটা সামলালাম।
ঘনাদা থামলেন। তারপর আমাদের মুখগুলোর দিকে চেয়ে একটু বুঝি করুণা হওয়াতেই সদয় হয়ে ব্যাখ্যাটা আর চেপে রাখলেন না।
ভাবছ, ছাই দিয়ে হার্টের অসুখ সারে কী করে? সব হার্টের অসুখ তো নয়, মহাশূন্যে পাড়ি দেওয়ার ফল হিসেবে অ্যাস্ট্রোনট বা মহাকাশযাত্রীদের যে হার্টের গোল দেখা যায়, সেই অসুখ শুধু ওই ছাইয়ে সারে। আকাশপথে অনেককাল ভারশূন্য থাকবার ফলে সকলেরই শরীর থেকে পটাসিয়াম স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি বেরিয়ে যায়। কারও আরও বেশি। পটাসিয়াম কম থাকলে হার্টের বৈদ্যুতিক প্রবাহ ক্ষুণ্ণ হয়ে হৃদযন্ত্রের ছন্দ কেটে যায়। মহাকাশযাত্রীদের খাবারে তাই একটু বেশি পটাসিয়াম থাকা দরকার। পটাসিয়াম বড় মজার এলিমেন্ট। দুনিয়ায় তিনি একা থাকেন না। সায়ানাইডের সঙ্গে মিশে যা বিষ সেই পটাসিয়াম আবার অন্য সংসর্গে অমৃতের শামিল। লুটভিক-এর শূন্যযানে হার্টের গোল যখন প্রথম শুরু হল তখন পটাসিয়াম আর কোথায় পাব। টেবিলের কাঠের পায়া পুড়িয়ে তাই তা জোগাড় করতে হল। এককালে কাঠের ছাই থেকেই পটাসিয়াম কার্বনেট সংগ্রহ করা হত।
কাঠের ছাই খেয়ে সুস্থ হয়ে শূন্যযানে যখন ফিরে এলাম তখন সত্যিই মনে মনে আবার মঙ্গলে একদল আইবুড়ো নিয়ে যাবার কল্পনা ছিল। কিন্তু তা আর হল না। আমার জন্য অপেক্ষা করে করে এতদিনে সেখানে আমাদের কুলীন বামুন কি আমেরিকার মর্মনদের মতো বহুবিবাহ যদি ওরা চালু করে দিয়ে থাকে তাহলে দোষ দেবার কিছু নেই।
কিন্তু সত্যিই আর সেখানে ফিরলেন না কেন? প্রেশার সোমের আকুল জিজ্ঞাসা, শূন্যযানটা নিয়ে পৃথিবীতে যে ফিরেছিলেন তাতে তো আর সন্দেহ নেই।
না, তোমাদের সামনে সশরীরে যখন উপস্থিত, ঘনাদার মুখে বিষণ্ণ একটু হাসি, তখন ফেরার কথা অস্বীকার করি কী করে! কিন্তু ফেরার পর ওই উন্মাদ বৈজ্ঞানিক লুটভিক-ই যে শয়তানি করল! আমার ওপর তার দারুণ আক্রোশ। তবু ফিরে আসবার সময় তার আশ্চর্য যন্ত্রের সৃষ্টিছাড়া রহস্য সে আমাকে যেন ঘৃণাভরেই বুঝিয়েছে। রকেট-টকেট নয়, এ আশ্চর্য শূন্যযান চলে অ্যান্টি-ম্যাটারের জোরে। অ্যান্টি-ম্যাটার মানে হল আমাদের দুনিয়ার মূল উপাদানের যেন আয়নায় দেখা উলটো নকল। সে অ্যান্টি-ম্যাটারের হাইড্রোজেন অ্যাটমে একটা প্রোটনের চারিধারে একটা ইলেকট্রন ঘোরে না। নেগেটিভ অ্যান্টিপ্রোটনের চারিধারেই ঘোরে পজিটিভ পজিট্রন। অন্য সব উপাদানও তাই। এই অ্যান্টি-ম্যাটারের আঁচ পেলেও কেউ তা এখনও সৃষ্টি করতে পারেনি। করেছে শুধু এই উন্মাদ বৈজ্ঞানিক লুটভিক। অ্যান্টি-ম্যাটারের সঙ্গে ম্যাটারের সম্পর্ক অহিনকুলের শত্রুতার চেয়েও বেশি, অ্যান্টি-ম্যাটারে ম্যাটারে দেখা হলে দুজনেই একেবারে বিদ্যুদ্বেগে যায় দুজনের কাছ থেকে ছিটকে। সে দুই বস্তুর ওই ধর্ম কাজে লাগিয়ে লুটভিক থরের মরুভূমির মাঝে তার আশ্চর্য যন্ত্রযান বানিয়েছিল। পৃথিবী ছাড়িয়ে যেতে সে শূন্যযানের রকেটের মতো অসম্ভব বেগ লাগে না। যেমন খুশি বেগে বেলুনের মতো ভাসতে ভাসতেও তারা পৃথিবী ছাড়িয়ে যেতে পারে। হাওয়ার ঘর্ষণে পুড়ে যাবার ভয় তাই আমাদের শূন্যযানের ছিল না। সাধারণ আসবাবপত্রও সেখানে বাতিল করতে হয়নি। একেবারে শামুকের গতি থেকে অ্যান্টি-ম্যাটারে ধীরে ধীরে প্রায় আলোর গতিতে তোলা যায় বলে মহাশূন্যে বেগ বাড়াবার সময় ভারশূন্যতা ছাড়া অন্য কোনও অসুবিধা আমাদের ভোগ করতে হয়নি। মঙ্গলগ্রহে নামতেও পেরেছি নিরাপদে।
তেমনই নিরাপদেই আবার থরের সেই মরুপ্রান্তরেই এসে নেমেছিলাম। নামার পর লুটভিককে আর বেঁধে রাখতে নিজের বিবেকেই বেধেছে। তাকে অনেক বুঝিয়ে তাই বাঁধন খুলে দিয়ে লোকালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বাইরে বেরিয়ে এসেছি।
বেশি দূর তারপর যেতে হয়নি। কিছুদূর যেতে না যেতেই একটা যেন উলটো বজ্রপাত হয়েছে। মরুর বালি থেকেই একটা বিদ্যুৎশিখা যেন নিমেষে আকাশে উঠে বিরাট একটা আগুনের হলকা হয়ে মিলিয়ে গেছে।
