ইতিহাসের খাতিরে? এবার আমাদের বিস্ময়টা একেবারে নির্ভেজাল। হ্যাঁ, গ্রহটার ভাবী ইতিহাসের একটা দাবি তো আছে। ঘনাদা বিশ্বভ্রাতার করুণাঘন হাসি হাসলেন, সে দাবি অগ্রাহ্য করতে পারলাম না।
মঙ্গলের ভাবী ইতিহাসের দাবি শুনে চোখে তখন অন্ধকার দেখছি। তবু কথাটা চালু রাখবার জন্য বিজ্ঞতার নামে বুদ্ধ সেজে বলতে হল, ঠিক, ঠিক! ইতিহাসের দাবি না মানলে চলে? নইলে সেখানেই হয়তো নিশান নিয়ে আমাদের দাবি-মানতে হবে বলে ঘেরাও করত ইতিহাসের দল।
না, এ সেরকম দাবি নয়। ঘনাদা অনুকম্পাভরে সংশোধন করতে পেরে খুশি হয়ে বললেন, দাবি হচ্ছে মঙ্গলগ্রহের ইতিহাসের ধারার। সে ধারা তো শুকিয়ে গিয়ে তখন শেষ হতেই বসেছে, মঙ্গলগ্রহের ওপরটা অনেকদিন আগে থেকেই, আমাদের বিজ্ঞান যা জেনেছে, সেই শ্মশান। সেখানে প্রাণের চিহ্ন না পাবারই কথা, কিন্তু তা না পেয়ে, ও গ্রহে প্রাণই নেই ভাবা একেবারে ভুল শুধু নয়, বৈজ্ঞানিকদের কল্পনারও অভাব তাতে প্রমাণ হয়। গ্রহের ওপরে প্রাণ না থাকলেও কি তলাতে থাকতে পারে না? মঙ্গলগ্রহে ঘটেছিল ঠিক তাই। সেখানে প্রাণের বিকাশ আর বিবর্তন আমাদের পৃথিবীর অনেক আগেই হয়, তারপর আমাদেরই মতো পারমাণবিক যুগে পৌঁছে নিজেদের হিংসা-প্রতিহিংসার যুদ্ধে আর স্বাভাবিক কারণে গ্রহের ওপরটা প্রাণীদের বাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। মঙ্গলের যারা সেরা প্রাণী সেই মাঙ্গলিকেরা এ-সম্ভাবনার কথা ভেবে অনেক আগে থেকেই মাটির ওপরের স্তরের তলায় সুড়ঙ্গ কেটে সব পাতাল শহর বসাবার কাজ শুরু করে রেখেছিল। হাওয়া ফুরিয়ে জল উবে গিয়ে সূর্যের মারাত্মক আলট্রাভায়োলেট আর মহাকাশের কসমিক রশ্মির বর্ষণে ওপরে টিকে থাকা যখন সম্পূর্ণ অসম্ভব হয়ে ওঠে, তখন মাঙ্গলিকদের যারা তখনও বেঁচে ছিল সবাই ওই পাতাল রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নেয়, কিন্তু সেখানেও নিয়তির নিষ্ঠুরতা থেকে রেহাই পায় না। ওপর ছেড়ে পাতালে নামবার সময় যে মাঙ্গলিকেরা কমতে কমতেও সংখ্যায় অন্তত লাখ দুয়েক ছিল, আমাদের ও গ্রহে নামবার সময় তারা শেষ পর্যন্ত মাত্র গুটি দশেকে এসে পৌঁছেছে। শুধু তাই নয়, তাদের আবার
ওই জালা-মূর্তির মতো চেহারা? প্রেশার সোম নিজেকে সামলাতে পারেন না। প্রমাদ গুনতে শুরু করে আমরা তখন ঘনাদার মুখের দিকে চেয়ে আছি।
এমন করে বেমক্কা কথার সুতো ভেঁড়ার জন্য আসরই বুঝি যায় ভেস্তে।
কিন্তু ভাগ্য ভাল। মাংসের শিঙাড়া তোতাপুলির সঙ্গে শিশিরের সিগারেটগুলোই ধাক্কা সামলালে। ঘনাদার মুখে-চোখে একটু ঘনঘটা হওয়ার সূত্রপাত হয়েই কেটে গেল।
মাঙ্গলিকদের জালা-মূর্তির মতো চেহারা? ঘনাদা প্রেশার সোমকে যেন বহুকষ্টে নিরীক্ষণ করতে পেরে বললেন, না।
গলাটা রীতিমত গম্ভীর।
তা হোক, কারেন্ট এখনও আছে। আমরা ডবল ফিউজ তার লাগালাম।
সেই বাংলা শোনার পর একেবারে হকচকিয়ে গেছলেন, না ঘনাদা?
মঙ্গলগ্রহে বাংলা! তাও আবার মেয়ের গলায়!
আজগুবি ব্যাপার!
যত আজগুবিই হোক, মানেটা কি আর ঘনাদা পাননি?
হ্যাঁ, পেলাম, ঘনাদা প্রসন্ন হয়ে জানালেন, পেলাম নাটকের ভেতর দিয়ে বলা যায়। বাংলায় ওই নেপথ্যবাণীর পরই সে নাটক যেন আপনা থেকে শুরু হল।
যেখানে তখন পৌঁছেছি, আগেই বলেছি যে সে জায়গাটা সার্কাসের অ্যারিনার মতো গোল। একদিকে একটা গড়ানে সুড়ঙ্গ ঢাল, আর একদিকে ঘোরানো সিঁড়ি বাদে চারিধারে, ওপরের নিরেট ছাদ পর্যন্ত, শুধু খাড়া দেওয়াল।
সে খাড়া দেওয়ালগুলো হঠাৎ চতুর্দিকেই ফাঁক হয়ে গিয়ে সেখান থেকে এক এক করে গুটি দশেক জালামূর্তিই বেরিয়ে এল।
সে জালা-মূর্তিগুলোর পেছনে আর কেউ নয়, স্পেস স্যুট ছেড়ে তার ঘরোয়া পোশাকে আমাদের বটুকেশ্বর।
একী কাণ্ড, বটুক! আমার আগে সুরঞ্জনই চেঁচিয়ে উঠল, তুমি এদের সঙ্গে করছ।
কী! এরা কারা?
এরা বাংলা জানল কী করে? তুমি শিখিয়েছ?
এতগুলো প্রশ্নের বাণেও অবিচলিত বটুক তার সেই মুখস্থ-পড়ার শুধু শেষ জিজ্ঞাসাটারই জবাব দিলে, শেখাতে এদের হয় না।
পর মুহূর্তেই ধ্বনি-প্রতিধ্বনিতে সে বিরাট পাতাল-মঞ্চ ঝন ঝন করে উঠল। দশ-দশটা মেয়ের গলায় একসঙ্গে শোনা গেল—শেখাতে এদের হয় না।
বুঝলেন এবার? বটুক তার সেই এক পর্দার গলায় জানালে, এরা সব হরবোলা। যা শুনবে তাই নকল করতে পারে।
আবার সেই জালা-মূর্তির ভেতর থেকে দশ-দশটা মিহি হলায় শুনলাম— বুঝলেন এবার! এরা সব হরবোলা। যা শুনবে তাই নকল করতে পারে।
হ্যাঁ, হরবোলা যে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
কথাগুলো বটুক যা বলেছে তাই, কিন্তু পর্দাগুলো এক নয়। ওই একই কথা মিহিগলায় নানা পর্দায় যেন জলতরঙ্গ বাজিয়ে দিলে।
কিন্তু ওই জালা বসানো চেহারার ভেতর থেকে এমন মেয়ের গলা বার হয় কী করে?
সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম বটুককে।
একরকম ভেংচানো ধ্বনি-প্রতিধ্বনিও অবশ্য চলল সঙ্গে সঙ্গে। বটুক যা জবাব দিলে তারাও তাই।
দেখবেন তাহলে? বলে বটুক অমন সৃষ্টিছাড়া কাণ্ড করে বসবে তখন কি জানি? মাপ করবেন তাহলে একটু—বলে বটুক আচমকা তার গায়ের জামাটাই ফেললে খুলে।
আর সঙ্গে সঙ্গে দশ মুখে তার প্রতিধ্বনির সঙ্গে যা হল তা আমাদের স্বপ্নেরও অতীত।
দশ দিকে দশটা জালা-মূর্তি ঝপ ঝপ করে তাদের মাথার আর গায়ের জালা-পোশাকগুলো নামিয়ে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। আমাদের স্পেস-স্যুটের মতো জালা-পোশাকগুলো তাদের মঙ্গলের ওপরে যাবার বেশ।
