অত তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়া সত্ত্বেও কোনও লাভ কিন্তু হয় না।
তাদের বেরুতে দেখেই মূর্তিগুলো ওই সব জাঁতা-ঢিবির আড়ালে যায় অদৃশ্য হয়ে।
হতাশ হয়ে একটা ওই রকম ঢিবি যখন তারা পরীক্ষা করে দেখছে তখনই আশ্চর্য অভাবিত একটা ব্যাপার ঘটে।
দানবদের জাঁতার মতো সেই বিরাট পাথুরে ঢিবির গা-টা যেন কোন মন্ত্রে ফাঁক হচ্ছে মনে হয়। সেখান থেকে গুটি তিনেক জালা-মূর্তিকে বেরিয়ে আসতে দেখে তারা একেবারে মড়ার মতো নিশ্চল হয়েই ছিল, কিন্তু কেমন করে যেন টের পেয়ে মূর্তিগুলো নিমেষের মধ্যে আবার ঢিবির ফাঁক-হওয়া-গহ্বরের মধ্যে ঢুকে পড়ে। তাদের ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে পাথুরে ফোকরটাও তখন আবার বুজে আসতে শুরু করেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সে ফাঁক বুজে গিয়ে ঢিবির গায়ে তার আর চিহ্নই থাকে না।
বটুকের পক্ষে সেই কয়েক সেকেন্ডই কিন্তু যথেষ্ট।
এমনিতে একটু যেন জড়ভরত। কিন্তু আসল দরকারের সময় ও একেবারে চিতাবাঘের চেয়েও চটপুটে আর বেপরোয়া।
ওই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে, পাথুরে চিচিংফাঁক বন্ধ হবার আগেই, এক লাফে সে জালা-মূর্তিদের পেছনে ওই ফোকরে ঢুকে পড়ে।
সুরঞ্জন তার পরেই যখন ঢুকতে যায় তখন পাথুরে ঢিবি আবার মন্ত্রবলে যেন স্বাভাবিক হয়ে গেছে।
কী করবে বুঝতে না পেরে ঢিবির ফোকর আবার খোলবার আশায় সে ওখানে বসে ছিল।
অন্য একটা ঢিবি থেকে আর-একদল জালা-মূর্তি বার হবার পর তাদের ফিরে যাওয়ার লক্ষণ দেখে আমাকে সুদ্ধ সঙ্গে নিয়ে অমন তাড়া করে ছুটে গিয়েছিল ওই ফাঁকটা খোলা থাকতে থাকতে ভেতরে ঢুকতে পাবার আশায়।
সে আশা সফল হয়েছে, কিন্তু আসল উদ্দেশ্যের দিক দিয়ে লাভ কিছু হয়নি। বটুকেশ্বরের কোনও পাত্তাই নেই, আর জালা-মূর্তিদের রহস্য যেমন ছিল তেমনই অভেদ্যই হয়ে আছে।
এখন তাহলে আমাদের কী করা উচিত? সুরঞ্জনকেই জিজ্ঞাসা করেছি, এখানে দশ বছর বসে থাকলেও আমাদের সমস্যার কিনারা হবে বলে মনে হচ্ছে না। অথচ ভেঁড়া স্পেস-স্যুট নিয়ে আমার শূন্যযানে ফেরারও উপায় নেই। তার চেয়ে তুমিই ফিরে যাও, সুরঞ্জন, বটুকেশ্বরের জন্য আমিই এখানে অপেক্ষা করি যতদিন পারি।
না। জোর দিয়ে বলেছে সুরঞ্জন।
মাথায় মুখোশ দেওয়া শিরস্ত্রাণটা সে আগেই খুলে ফেলেছিল।
এবার স্পেস স্যুটটাও গা থেকে খুলে ফেলতে ফেলতে বলেছে, দুজনের যখন যাবার উপায় নেই, এখানে তখন আমিই থাকব। আপনি আমার স্পেস-সুটটাই পরে শূন্যযানে ফিরে যান। আপনার জায়গায় আমি গেলে কোনও লাভ হবে না। আপনি তবু লুটভিক-এর কাছে কায়দা করে শূন্যযান চালাবার কলাকৌশলগুলো শিখে নিয়েছেন। দরকার হলে তার কাছ থেকে আরও কিছু জেনে নিয়ে পৃথিবীতে ফিরে যেতে পারবেন। আমি গেলে সেরকম ফিরে যাবার কোনও আশাই নেই। সুতরাং পোশাকটা পরে নিয়ে আপনি ওদিকের সিঁড়ি দিয়ে উঠে চলে যান। সিঁড়িটা ওই জন্যই আছে বলে মনে হয়—
ধৈর্য ধরে সুরঞ্জনের সব কথা শোনবার পর একটু হেসে বললাম, হৃদয়টা তোমার সত্যিই বড়, সুরঞ্জন। তোমার নিঃস্বার্থতার প্রশংসা করি। কিন্তু বটুকেশ্বরের খোঁজ না পেয়ে এখান থেকে আমিও যেতে পারব না। তাতে যদি সারাজীবন এখানেই কাটাতে হয় সেও ভাল। হ্যাঁ, সত্যিই তাই ভাল।
হ্যাঁ, সত্যিই তাই ভাল।
যেন ভূত দেখার মতো চমকে উঠলাম দুজনে।
এ কী শুনছি?
পরিষ্কার বাংলা কথা! তাও বটুকের গলায় হলেও বুঝতাম।
তার গলা তো নয়ই, কোনও পুরুষের গলাই নয়।
১২. ঘনাদা থেমে নতুন সিগারেট ধরালেন
ঘনাদা থেমে নতুন সিগারেট ধরালেন।
ব্লাডটেস্ট গুপ্ত, প্রেশার সোম আর কার্ডিওগ্রাম সান্যালের তখন আর ধৈর্য ধরবার ক্ষমতা নেই।
পুরুষ না হলে তো মেয়ের গলা! ব্লাডটেস্ট গুপ্তের দুচোখ কপালে।
তার ওপর বাংলা! প্রেশার সোমের হাঁ-মুখ আর বোজে না!
মঙ্গলগ্রহে বাঙালি মেয়ে? কার্ডিওগ্রাম সান্যালের গলাই যেন শুকনো!
না, মঙ্গলগ্রহে বাঙালি মেয়ে কেউ ছিল না, ঘনাদা সিগারেটে দুটি রামটান মেরে বনোয়ারির নিয়ে আসা দ্বিতীয় দফার চায়ের ট্রে থেকে একটি কাপ তুলে নিয়ে সশব্দে চুমুক দিয়ে বললেন, তবে বাঙালি ছেলেকে সেখানেই রেখে আসতে হল।
কাকে রেখে আসতে হল? এবার আমাদের জিজ্ঞাসার পালা—ওই সুরঞ্জনকে?
হ্যাঁ, সুরঞ্জনকে আর নিয়ে আসা গেল না। ঘনাদা ছোট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন—আর সুরঞ্জনকে রেখে এলে তার ছায়া বটুকেশ্বরকে কি আর আনা সম্ভব? তাই ভাবি, বটুকের অমন চিলের চোখ যদি না হত।
ঘনাদার আবার দীর্ঘশ্বাস।
দু-দুবার দীর্ঘশ্বাস আমাদের খুব ভাল ঠেকল না। ঘনাদার এটা ঝিমিয়ে পড়ার লক্ষণ। তাড়াতাড়ি তাই একটু তাতাবার আঁচ দিতে হল সবাই মিলে।
ও জালা-জন্তুগুলোই সব গণ্ডগোলের মূল, না ঘনাদা?
বটুকের অমন চোখের জোর না হলে ওগুলো কি আর দেখা যেত? আর দেখ গেলে সুরঞ্জনেরও নেমে দেখবার অমন ঝোঁক হয় না, তাকে অমন রেখেও আসতে হয় না, সেই আট কোটি কিলোমিটার দূরের নির্বাসনে।
রঞ্জন সেই জালা-জন্তু ধরবার লোভেই নেমেছিল নিশ্চয়! ইস, একটা যদি ধরে আনতে পারত! আপনিও পারলেন না একটা আনতে?
অনুযোগ মেশানো শেষ জিজ্ঞাসাটা ঘনাদার মুখের দিকে বড় আশায় ছাই-পড়া-চেহারা নিয়ে চেয়ে।
প্রক্রিয়াটা বিফল হল না!
একটা ধরে আনবার কথা বলছ? ঘনাদা যথোচিত সাড়া-ই দিলেন, তা আর পারলাম কই? তার বদলে তারাই যখন সুরঞ্জনকে ধরে রাখলে তখন ছাড়িয়ে আনতে পারলাম না। ইতিহাসের খাতিরে ছেড়ে আসতে হল।
