বটুক যা দেখেছে বলেছে, তা-ই বিশ্বাস করার দরুন একবার বেরিয়ে খোঁজ করবার লোভ সুরঞ্জন সামলাতে পারেনি।
কাজটা ওদের খুবই অন্যায় হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু আমি এখন কী করব?
আরেকটা স্পেস স্যুট পরে তাদের পেছনে বেরিয়ে পড়ব?
কিন্তু তখন তাহলে শূন্যযানটায় একা লুটভিককে রেখে তো চলে যেতে হয়।
লুটভিক অবশ্য বাঁধা আছে। কিন্তু তাকে বিশ্বাস কিছু তো নেই। চোখে চোখে না রাখলে কী যে সে করবে কে বলতে পারে। একবার কোনও উপায়ে বাঁধনগুলো খুলতে পারলে তো আমাদের সর্বনাশ। পৃথিবীতে ফেরার আশা তাহলে তো নেইই, এখানে, এই মঙ্গলগ্রহেই কী পৈশাচিক প্রতিশোধ সে নেবার চেষ্টা করবে কে জানে।
তাকে একলা ছেড়ে যেতে তাই রীতিমত দ্বিধা হয়।
সে দ্বিধাও অবশ্য শেষ পর্যন্ত আটকে রাখতে পারলে না।
জানলা দিয়ে সারাক্ষণই বাইরে নজর রেখেছিলাম। সুরঞ্জন ও বটুকের মূর্তি দুটো ক্রমশ ছোট ও অস্পষ্ট হয়ে এলেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত দেখতে পেয়েছি। কিন্তু তারপর একটা জাঁতা-পাথরের আড়ালে তারা অদৃশ্য হয়ে যাবার পর অস্থির।
জাঁতা-পাথরের আড়ালে মূর্তি দুটো একেবারে মিলিয়ে গেল নাকি?
তা না গেলে, যত ছোটই হোক, মূর্তিগুলোকে জাঁতা-পাথরের পেছন থেকে বার হবার পর দেখতে পাওয়ার কথা।
ওরা দুজনে ওখানেই থেমে গেছে তাহলে। থেমে যাওয়ার কারণটা কী?
জালা গোছের চেহারা তো বটুকের কথা মতো ওই রকম একটা জাঁতা-পাথরের ধার থেকেই বেরিয়ে আবার লুকিয়ে পড়েছিল।
এখন ওখানে গিয়ে সে জালা-জন্তুর নতুন কোনও চিহ্ন ওরা কি তাহলে পেয়েছে?
ধৈর্য ধরে আর থাকা গেল না। কন্ট্রোল রুমে গিয়ে লুটভিককে আর একবার দেখে এসেই স্পেস স্যুট পরে শূন্যযানের বাইরে বেরিয়ে এলাম।
শূন্যযানের এয়ার-লকটা বন্ধ করে বাইরে লালচে বালির ওপরে এসে দাঁড়াবার পর বুকটা একবার যে ছাঁৎ করে উঠল সে কথা অস্বীকার করতে পারব না। মনে হল শূন্যযান ছেড়ে এসে নিজেদের নিয়তি কি নিজেরাই শিলমোহর করে এলাম।
ও শূন্যযানে পৃথিবীতে ফিরে যাওয়ার ভাগ্য কি আর হবে?
সে বিষয়ে আশঙ্কা উদ্বেগ যতই থাক, সুরঞ্জন আর বটুকের খোঁজ আগে না করলে নয়।
যে জাঁতা-পাথরের কাছে তাদের শেষ দেখেছিলাম দেরি না করে সেদিকেই পা বাড়ালাম তাই।
মঙ্গলগ্রহ পৃথিবীর তুলনায় ছোট। চাঁদের মতো অত অল্প না হলেও তার মাধ্যাকর্ষণ পৃথিবীর চেয়ে অনেক কম। অত ভারী স্পেস-স্যুট পরেও হাত-পা চালাতে তাই কোনও কষ্টই হল না। পৃথিবীতে যা কমপক্ষে পনেরো মিনিটের পথ, মিনিট দশেকের আগেই সেখানে পৌঁছে গেলাম।
শূন্যযান থেকে যা মনে হয়েছিল, কাছে যাবার পর দেখা গেল জাঁতা-পাথরের টিবিটা তার চেয়ে অনেক বড়।
পাথরের চাংড়ার আড়ালে সুরঞ্জনকেও দেখতে পেলাম। ঠিক দেখতে পেলাম বলা অবশ্য ভুল। লম্বা-চওড়া আকারটা দেখে বুঝলাম স্পেস স্যুটটার ভেতর বটুক নয়, সুরঞ্জনই আছে।
কিন্তু সে একা কেন? বটুক কোথায় গেল?
স্পেস স্যুটের স্পিকিং টিউব দিয়ে সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম সুরঞ্জনকে।
তুমি এখানে বসে বসে করছ কী? বটুক তো তোমার সঙ্গেই এসেছিল। সে গেল কোথায়?
উত্তরে কোনও কথা না বলে সুরঞ্জন শুধু সামনের জাঁতার মতো পাথুরে ঢিবিটা হাত বাড়িয়ে দেখালে।
পাথুরে ঢিবিটা কী দেখাচ্ছে সুরঞ্জন? স্পেস-স্যুটের মুখোশে ঢাকা না থাকলে তার মুখটা দেখবার চেষ্টা করতাম।
অবাক হয়ে ঢিবিটা একবার দেখে আবার সুরঞ্জনের দিকে ফিরলাম—কী হল কী তোমার? ও ঢিবি কী দেখাচ্ছ? বটুক কোথায় গেল তাই তো জিজ্ঞাসা করছি।
এবার সুরঞ্জনের গলাই শোনা গেল, বটুক ওখানেই গেছে।
ওখানেই গেছে মানে কী? বটুক ওই পাথুরে ঢিবির মধ্যে গেছে? এ কি ভোজবাজি নাকি! না, মঙ্গলগ্রহের মাটিতে মাথা খারাপ করবার কোনও কিছু আছে?
সুরঞ্জনকে রহস্যটা একটু বুঝিয়ে দেবার কথা বলতে যাচ্ছি, এমন সময় চোখটা দূরে একটা জায়গায় আটকে গেল।
যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানকার মতোই আরেকটা চ্যাপ্টা গোল ধরনের পাথুরে ঢিবির কাছে কী ওগুলো?
বটুক যা বলেছিল হুবহু তো তাই।
গোল গোল পর পর সাজানো ক-টা যেন কলসি আর জালা।
সেগুলো তো ওই ঢিবির ভেতর থেকেই বেরিয়ে এসেছে ও আসছে।
প্রথমে দুটো, তারপর একটা একটা করে আরও তিনটে।
এ কী ধরনের জানোয়ার?
সত্যিই জানোয়ার, না ভৌতিক কিছু?
ভৌতিক না হলে ওই পাথরের ঢিবির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কী করে?
শুধু যে বেরিয়ে আসে তা নয়, সুরঞ্জনের কথা বিশ্বাস করতে হলে তো জলজ্যান্ত অন্য কাউকে ওই পাথরের মধ্যে মিশিয়ে দিতেও পারে বলে মানতে হয়!
সুরঞ্জনও তখন জালা-মূর্তিগুলোর দিকে চেয়ে আছে।
স্পেস-স্যুটের ভেতর দিয়েই চাপা উত্তেজিত গলায় বললে, দেখতে পেয়েছেন? বিশ্বাস হয়েছে এবার বটুকের কথা?
বিশ্বাস তো হয়েছে, কিন্তু এখন কী করা উচিত তাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই অদ্ভুত মূর্তিগুলোর ভাল করে একটু পরিচয় নেবার চেষ্টা করব? বটুক কি সেই রকম কিছু করতে গিয়েই পাথরের ঢিবির মধ্যে মিশিয়ে গেছে?
মুর্তিগুলো কী ধরনের জীব তাও তো জানা নেই! নিরীহ, নির্দোষ, না হিংস্র নিষ্ঠুর?
মঙ্গলগ্রহে এরকম কোনও জীবের অস্তিত্বও তো কেউ কখনও কল্পনা করেনি।
কোনও আজগুবি বৈজ্ঞানিক গল্পেও এরকম প্রাণীর কল্পনা আছে বলে আমার অন্তত জানা নেই।
এদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টাই বা কীভাবে করা যায়?
