মূর্তিগুলো দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের যে লক্ষ করছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু দাঁড়ানোটা তাদের ধীর স্থির নয়, পাঁচটা মূর্তি অনবরতই নড়ছে চড়ছে।
ওটা কি উত্তেজনার লক্ষণ?
উত্তেজিত হওয়া আশ্চর্য তো কিছু নয়। আমরা তাদের দেখে যদি তাজ্জব হয়ে থাকি তো তাদেরও তো আমাদের দেখে তাই হওয়ার কথা।
প্রথমত, তাদের এই মঙ্গলগ্রহে এ রকম অচেনা অদ্ভুত এক রকম প্রাণীর আবির্ভাবই তাদের কাছে অবিশ্বাস্য ব্যাপার। দ্বিতীয়ত, স্পেস-স্যুটে আমাদের যা চেহারা হয়েছে কিছু না জেনে তা প্রথম দেখলে পৃথিবীর কোনও সরল পাহাড়-জঙ্গলের মানুষও ভয়েই ভিরমি যেত নাকি?
আমরা যেমন তাদের সম্বন্ধে কী করা উচিত ঠিক করতে পারছি না, তাদেরও অবস্থা নিশ্চয় তথৈবচ।
অবশ্য যাদের দেখছি, তারা মানুষের মতো বুদ্ধিমান মঙ্গলগ্রহের কোনও জীব যদি হয় তাহলে এসব কথাই ওঠে না।
বুদ্ধিশুদ্ধি আছে বলে ধরে নিয়ে প্রথমে কীভাবে তাদের বোঝানো যায় যে আমরা শুধু তাদের সঙ্গে ভাব করতেই চাই?
গলার স্বর তো এখানে কোনও কাজে লাগবে না। বেটপ স্পেস স্যুটের ভেতর থেকে কোনও ইঙ্গিত করাও শক্ত। হাত-পাগুলো একটু নেড়েচেড়ে ভাব করবার কোনও ভঙ্গি দেখানো যায় কিনা তাই ভাবতে হয়।
ভাববার কিন্তু আর দরকার হল না।
জালা-মূর্তিগুলো হঠাৎ দেখলাম সেই পাথরের ঢিবির দিকেই নড়তে শুরু
করেছে।
শিগগির আসুন, বলে সেই মুহূর্তেই সুরঞ্জন তার বেঢপ স্পেস স্যুট নিয়েই মূর্তিগুলোর দিকে ছুট লাগাল।
ও কী করছ কী? বলেও তাকে তখন অনুসরণ না করে পারলাম না।
জালা-মূর্তিগুলো আমাদের ছুটতে দেখে চঞ্চল যে হয়ে উঠেছে তা চোখেই দেখতে পাচ্ছিলাম।
ওই বিদঘুটে ঢাউস শরীর নিয়েই তারা যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি চ্যাপটা ঢিবিটার আড়ালে চলে যাচ্ছে।
কিন্তু সেখানে যাচ্ছে কোথায়?
আর সুরঞ্জনই বা সেদিকে অমন পাগলের মতো ছুটে যাচ্ছে কেন?
মূর্তিগুলো এখন যেন পালাতেই ব্যস্ত মনে হলেও বেকায়দায় পড়ে ফিরে দাঁড়াতেও তো পারে!
তারা তখন কীরকম শত্রু হয়ে দাঁড়াবে তার ঠিক কী? তাদের অস্ত্র শস্ত্র ক্ষমতার কথা কিছুই না জেনে এমন বেপরোয়া হয়ে তাদের ওপর চড়াও হওয়া কি উচিত?
কিন্তু সে কথা কাকে বলব!
স্পেস-স্যুটের স্পিকিং টিউবে বৃথাই দুবার সুরঞ্জনকে সাবধান করবার চেষ্টা করলাম। সে তখন যেন বাহ্যজ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে।
পাঁচটা জালা-মূর্তির চারটেই ইতিমধ্যে জাঁতা-পাথরের আড়ালে অদৃশ্য।
শেষেরটাও সেখানে গা-ঢাকা দেবার আগেই সুরঞ্জন সেখানে গিয়ে পৌঁছল!
কিন্তু পৌছেও লাভ কিছু হল না। ওই ঢাউস জালা-মূর্তির একটাকে খালি হাতে ধরতে গেলেও হাতের বেড় কুলোত না। স্পেস স্যুটের গাবদা ফোলা হাতে তাও অসম্ভব।
সুরঞ্জনকে অবশ্য সে চেষ্টা করতেও দেখলাম না! শেষ জালা-মূর্তিকে ধরবার চেষ্টা করে তার পেছন নেওয়া জন্যই সে যেন ব্যস্ত।
উদ্দেশ্য তার সফলই হল। জালা-মূর্তিটার পিছু পিছু তাকেও চ্যাপ্টা পাথুরে জাঁতা-ঢিবিটার পেছনে অদৃশ্য হতে দেখলাম।
কিন্তু সে গেল কোথায়?
কয়েক সেকেন্ড বাদেই সে জায়গায় পৌঁছে একেবারে দিশাহারা হয়ে গেলাম।
এমন দারুণ একটা ভৌতিক ব্যাপার আমার চোখের ওপরই সত্যি ঘটে গেল নাকি!
জালা-মূর্তিগুলোর সঙ্গে সুরঞ্জনও তার স্পেস-সুট নিয়ে মিলিয়ে গেল ওই জাঁতা-ঢিবির গায়ে?
শিগগির! শিগগির নেমে আসুন!
সুরঞ্জনের গলা শুনে চমকে না উঠলে ওইখানেই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতাম কে জানে!
তারপর হতাশ হয়ে শূন্যযানেই ফিরতে হত।
কিন্তু স্পিকিং টিউবে সুরঞ্জনের গলা শোনার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিটা আপনা থেকেই পাথুরে ঢিবিটায় গিয়ে পড়ল। জালা-মূর্তি আর সুরঞ্জনের অন্তর্ধানের রহস্য সেইখানেই উদঘাটিত।
একমুহূর্ত দেরি করবার কিন্তু তখন আর সময় নেই।
সুরঞ্জনের গলাটা যেন কোন ভাঙা লাউড স্পিকারের ভেতর দিয়ে বিশ্রী বিকৃত গোঙানো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
দেরি করবেন না! দেরি—
বাকিটা আর শোনা গেল না। শোনার অপেক্ষা আমি অবশ্য করিনি।
তার আগেই ওই স্পেস-স্যুট নিয়েই প্রায় লাফ দিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছি জাঁতা-ঢিবিটার ধারে।
১১. বিরাট একটা ফোকর
হ্যাঁ, জাঁতা-ঢিবিটার ওপর নয়, গায়েই বিরাট একটা ফোকর। আর সেই ফোকরের নীচে বিরাট ইঁদারার মতো এক গভীর গর্ত। ফোকরের ধার দিয়ে একটা গড়ানে ঢালও বাচ্চাদের স্লিপ খাবার কাঠামের মতো নীচে নেমে গেছে।
ফোকর দিয়ে সেই ঢালটার ওপর দিয়েই আগের সবাই গড়িয়ে গেছে।
আমার পক্ষে সেটা কিন্তু সহজ হল না।
ফোকরটা তখনই ধীরে ধীরে বুজে আসতে শুরু করেছে। যতটুকু বুজে এসেছে, ওপর থেকে দেখলে পাথুরে-ঢিবিটা থেকে তা আলাদা করে চেনা অসম্ভব। বাকিটুকু বন্ধ হয়ে গেলে আগের দেখা জাঁতা-ঢিবির মতো ওপর থেকে কিছু ধরাই যেত না।
আধখানা বুজে আসা ফোকরের ভেতর দিয়ে কোনওরকমে গলে গেলাম বটে কিন্তু স্পেস-স্যুটের একটা হাতা শেষ পর্যন্ত বুজে যাওয়া ফোকরের ফাঁকে এমন
আটকে গেল যে টেনে সেটা ছাড়াতে গিয়ে একটু ছিঁড়েই গেল।
গড়ানে ঢাল দিয়ে নীচে নেমে যেতে যেতে বুকটা তখন আতঙ্কে একেবারে হিম।
স্পেস-স্যুট ছিঁড়ে যাওয়া মানে তো সর্বনাশ। পৃথিবীতে যে হাওয়ার চাপে আমরা অভ্যস্ত, শুধু তাই কমে গিয়ে শরীরের রক্ত চলাচল থেকে সব কিছু বেসামাল শুধু হবে না, নিশ্বাসের হাওয়াই তো আর পাব না!
