একটু থেমে আবার বলেছি, দেখো, জালা-জন্তুর অস্তিত্ব যদি প্রমাণ করতে পারো তো পৃথিবীতে ফিরে বিজ্ঞান-জগতে একটা হুলুস্থুল বাধিয়ে তুলতে পারবে। তা পৃথিবীতে ফেরার ব্যবস্থা করার জন্যই লুটভিক-এর একবার খবর নিয়ে আসা দরকার।
তখনই যদি লুটভিক-এর খোঁজে যাবার জন্য অত ব্যস্ত না হই তাহলে জর্জ বিশ্বাস আর পঙ্কজ মল্লিক, মান্না দে আর তালাত মামুদের সঙ্গে আরেকটা ভারত-জোড়া নাম আজ গানের জগতের গর্ব হয়ে থাকে। সুরঞ্জন সরকার নামটা আজ মানুষের মুখে মুখে ফেরে। কিন্তু তা হবার নয়। ও নামটা পৃথিবীর গানের জগতে আর লেখাই হল না।
ঘনাদা একটু ছোট দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে থামলেন।
তার মানে হল কী সুরঞ্জন সরকারের? উতলা হয়ে উঠলেন কার্ডিওগ্রাম সান্যাল।
মারা গেলেন নাকি? ব্লাডপ্রেশার সোম দারুণ উদ্বিগ্ন।
ওই কাঠপোড়া ছাইতেও কাজ হল না? ব্লাডটেস্ট গুপ্তের বেয়াদবি আশঙ্কা।
কাঠপোড়া ছাইয়ে কাজ হবে না কেন? তারই জোরে সব তো তখন চাঙ্গা। আহম্মকদের বেওকুফি বেচাল বাধ্য হয়ে তাড়াতাড়ি শুধরে দিতে হল আমাদের সুরঞ্জন সরকার বোধ হয় হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল, না ঘনাদা?
কাঠপোড়া ছাইয়ের অপমানে বিপজ্জনক ভাবে কোঁচকানো ভুরুটা কিছুটা সরল হতে দেখে সাহস করে আবার একটু ন্যাকা সাজলাম—মঙ্গলগ্রহের ওই ইলেকট্রিসিটিতে শেষ পর্যন্ত নামতে হল বুঝি?
ইলেকট্রিসিটি নয়, ইলেকট্রিস, ঘনাদা সানন্দে সংশোধন করে আবার শুরু করলেন, ইলেকট্রিস হল মঙ্গলের দক্ষিণ গোলার্ধের একটা জায়গা। সেখানে নামবার সত্যিই বিন্দুমাত্র বাসনা ছিল না। নামতে যদি হয় মঙ্গলের উত্তর মেরুর কাছাকাছি নামলেই লাভ কিছু হতে পারে। সেখানকার মেরুর আইসক্যাপ অর্থাৎ হিমমুকুট জল নয়, জমানো কার্বন ডায়ক্সাইড দিয়ে তৈরি বলে অনেক জ্যোতিষী বৈজ্ঞানিকের ধারণা, কিন্তু সে ধারণা বাতিল করবার মতো প্রমাণও আছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। পৃথিবীর মেরু প্রদেশের মতো মঙ্গলেরও গ্লেসিয়ার অর্থাৎ হিমবাহ আছে বলে জানা গেছে। কার্বন ডায়ক্সাইডের শুকনো তুষার থেকে কিন্তু হিমবাহ সৃষ্টি হয় না। হিমবাহের অস্তিত্ব থেকেই সেখানে জল আছে বলে সুতরাং ধরে নেওয়া যায়। আর জল থাকলে সেখানেই অন্তত প্রাণের চিহ্ন পাবার আশা কিছুটা করা যেতে পারে।
ইলেকট্রিস থেকে শূন্যযান উড়িয়ে আবার উত্তর মেরু অঞ্চলে নামতে হলে অবশ্য আরও অনেক হাঙ্গামা করতে হত। সে হাঙ্গামা পোহাবার উৎসাহ শেষ পর্যন্ত হত কিনা জানি না—কিন্তু তার অবসরই আর হল না।
কন্ট্রোল রুমে লুটভিককে দেখে আসতে গিয়ে তার একটা গালাগাল শুনে এসে আমাদের কামরায় ঢুকে একটু অবাক হলাম।
সুরঞ্জন আর বটুক গেল কোথায়?
এতদিন বাদে নিজেদের বানানো কয়েদ-ঘর খুলে বার হবার সুবিধে পেয়ে শূন্যযানটা ভাল করে ঘুরে দেখতে গেছে নাকি! তাই যাওয়াই সম্ভব।
বটুক যে জালা-জন্তুর আভাস দেখেছিল, তা আর দেখতে পায়নি নিশ্চয়। তা পেলে এ জানলা থেকে সুরঞ্জনকে কি নড়ানো যেত?
বটুকের চোখের জোর সত্যিই যে অসাধারণ তার প্রমাণ আগেও পেয়েছি, কিন্তু এবারে তার অমন দৃষ্টিবিভ্রম কী থেকে হল তা জানলায় একবার দেখতে গিয়ে একেবারে থ হয়ে গেলাম।
এ আমি কী দেখছি!
শেষকালে আমারও চোখে ধাঁধা লাগল নাকি!
সত্যিই বড় বড় পাথর ছড়ানো রাঙা বালির প্রান্তর দিয়ে ও কী রকম দুটো কিম্ভুতকিমাকার মূর্তি চলে যাচ্ছে।
কিন্তু বটুক যা বলেছিল সে রকম কিছু তো এ মূর্তিগুলো নয়। বটুক জালার ওপর জালা বসানো এক রকম অদ্ভুত চেহারা চকিতে দেখবার কথা বলেছিল।
আমি যা দেখছি তার সঙ্গে জালা কি কলসির কোনও মিল কিন্তু নেই।
এগুলো যেন–
ওই পর্যন্ত ভাবতে গিয়ে যেন বিদ্যুতের শক খেয়ে চমকে আমাদের কামরার বাইরের একটা ছোট কুঠুরিতে ছুটে গেলাম।
দরজা খুলে সেখানে গিয়ে দাঁড়াবার পরই চক্ষুস্থির। ঠিক যা ভয় পেয়েছিলাম তা-ই।
এ কুঠুরিটা শূন্যযানের কিছু খুঁটিনাটি দরকারি জিনিসের সঙ্গে অক্সিজেন মুখোশ, স্পেস স্যুট ইত্যাদি রাখবার জায়গা।
লুটভিক সেই প্রথম দিন এ কুঠুরি আর তার সাজ-সরঞ্জাম আমাদের দেখিয়ে আনতে ভোলেনি।
অন্য জিনিসপত্রের মধ্যে সেদিন এক সারিতে দাঁড় করানো গোটা পাঁচেক একটু অদ্ভুত ধরনের স্পেস-স্যুট দেখার কথা স্পষ্টই মনে আছে।
সেই স্পেস-স্যুটের সারির দিকে চেয়ে বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
দুটো পোশাক সেখানে নেই। কেন যে নেই তা আর বুঝতে দেরি হল না।
ছুটে গিয়ে আবার জানলার কাছে দাঁড়ালাম।
স্পেস স্যুট পরা চেহারা দুটো তখন অনেক দূরে চলে গেলেও একেবারে অদৃশ্য হয়নি। বটুক যেগুলোকে জাঁতা বলে বোঝাতে চেয়েছিল দূরের সেই রকম একটা চ্যাপটা পাথরের চাঁইয়ের দিকেই সে দুটো যাচ্ছে।
মূর্তি দুটো যে স্পেস স্যুট পরা সুরঞ্জন আর বটুকেশ্বরের সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ তখন অবশ্য মনে নেই।
কিন্তু ওদের দুজনের হঠাৎ এ সর্বনাশা খেয়াল হল কেন? বটুক যা বলেছিল তারপর সুরঞ্জন জানলা থেকে সে রকম কোনও জালা-মুর্তি কি দেখতে পেয়েছে? তা পেয়ে থাকলে আমাকে তা জানাবার ফুরসুতটুকুও তাদের হয় না কেন? আমি তাদের এ সংকল্পে বাধা দেব এই ভয়ে? কিন্তু বটুক যা দেখেছে সুরঞ্জনও সে রকম কিছু দেখে থাকলে আমি বাধা দিতে যাব কেন? ভেবে দেখতে গেলে মনে হয়, তাদের এমনভাবে বেরিয়ে পড়াটা কি খেয়াল বলেই আমায় কিছু জানাতে তারা চায়নি।
