ধুলোর ঝড় তখন থিতিয়ে এসেছে! তবু চারিদিকে বেশ কিছুটা ঝাপসা।
শূন্যযান থেকে বার হতে তখনও সাহস করিনি। বাইরে আমাদের নিশ্বাস নেবার জন্য হাওয়া তো থাকবারই কথা। যদি বা থাকে তা পৃথিবীর প্রাণীর পক্ষে বিষও তো হতে পারে।
মঙ্গলগ্রহে এসে পৌঁছেছি তাই যথেষ্ট। সেখানে নেমে কোনও লাভ হবে কিনা তাই তখন ভাবছি।
জানলা দিয়ে গ্রহের যা চেহারা চোখে পড়ছে তা নামবার উৎসাহ বাড়াবার মতো নয়। বিচক্ষণ বৈজ্ঞানিকেরা যা অনুমান করেছেন—সেই ধু ধু মরু।
যন্ত্রঘরে টাঙানো মানচিত্র দেখে বুঝলাম, মঙ্গলগ্রহের ইলেকট্রিস যার নাম দেওয়া হয়েছে সেই জায়গাটাতেই নেমেছি।
হাওয়ার অস্তিত্ব মাপার যন্ত্রটা বিকল, কিন্তু জলীয় বাষ্প মাপবার যন্ত্রটায় দেখলাম পৃথিবীর থেকে যা ধারণা হয় মঙ্গলগ্রহ তার চেয়েও অসম্ভব রকম শুকনো। পৃথিবীর মরুপ্রদেশের হাওয়াতে যা জলীয় বাষ্প আছে, মঙ্গলগ্রহের আবহাওয়ায় বাষ্পের পরিমাণ তার প্রায় দু-হাজার ভাগের মতো।
হাওয়ার ব্যাপারটা না-ই জানা যাক, এত শুকনো আবহাওয়ায় কোনও প্রাণের অস্তিত্ব অসম্ভবই ধরে নিতে হয়।
মিছিমিছি এ শ্মশান প্রান্তরে নেমে তাহলে লাভ কী। মঙ্গলগ্রহে নামতে পেরেছি। সেই গর্বটুকু নিয়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করাই তো ভাল।
অক্সিজেন মুখোশ নিয়ে কিছুক্ষণের জন্য নেমে একটু ঘুরে আসা অবশ্য যায়। কিন্তু তাতেও অজানা ভয়ংকর কোনও বিপদ যে নেই তা-ই বা কে বলতে পারে!
অন্য কিছু না হোক, এখানকার নামমাত্র হাওয়ার ছাঁকনিতে অবারিত আলট্রাভায়োলেট আর কসমিক রে অর্থাৎ মহাজাগতিক রশ্মির বৃষ্টিই মানুষের পক্ষে মারাত্মক হওয়া মোটেই অসম্ভব নয়।
জানলায় দাঁড়িয়ে এইসব কথা ভাবতে ভাবতেই একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম হঠাৎ বটুকের কথায় চমকে গেলাম।
বটুক অবশ্য উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে কিছু বলেনি। তার সেই নিজস্ব মার্কামারা মুখস্থ-পড়া-বলার ধরনের কথা।
কিন্তু কথা যা বলেছে তা সত্যিই চঞ্চল করে তোলবার মতো। আর কেউ হলে যে কথাটা বলতে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে একাকার করত বটুকেশ্বর তা-ই বলেছে নেহাত যেন কলকাতার বাড়িতে বসে বাজারে যাচ্ছি বলার মতো। কথাটা কিন্তু হল—বেরিয়েই লুকোল।
বেরিয়েই লুকোল! সে কী! কী লুকোল? কোথা থেকে বেরিয়ে? কোথায় লুকোল?
আমি আর সুরঞ্জন দুজনেই তার দিকে ফিরে ব্যাকুল উত্তেজিত অস্থির হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি।
ওই একটা জাঁতার কাছে। বটুকেশ্বরের ভাবান্তর নেই।
জাঁতার কাছে! জাঁতা! আমরা আরও হতভম্ব।
তার পরই অবশ্য খেয়াল হয়েছে যে বটুকেশ্বর তার নিজের বুদ্ধিতে একরকম বুঝিয়ে যা বলতে চেয়েছে তা খুব ভুল নয়। এই মরুভূমির ভেতর বেশ দূরে দু-তিনটে যে পাথরের চাঁই দেখা যাচ্ছে সেগুলোকে দেখতে খানিকটা যেন দৈত্যদানোর বিরাট জাঁতার মতো চ্যাপ্টা গোল গোছের।
কিন্তু সেই জাঁতার কাছে বেরিয়েই লুকোলটা কী?
এ প্রশ্নের উত্তরে বটুক সামান্য একটু যেন অবাক হয়েছে আমাদের দৃষ্টিশক্তির অভাবে।
আপনারা দেখতে পাননি? ওই যে ছোটবড় মাথায় মাথায় বসানো কটা জালা!
ক-টা জালা—তাও আবার বেরিয়েই লুকিয়ে গেল! বলছে কী বটুকেশ্বর!
জাঁতার উপমাটা ঠিকই একরকম দিয়েছিল, কিন্তু এই জালার ওপর জালা দেখা তো নির্ঘাত মাথা খারাপের লক্ষণ।
শেষে বটুকেশ্বরেরও মাথা খারাপ হল দেখে তখন সত্যি দুঃখ হচ্ছে। যে-কোনও অবস্থায় একেবারে বরফের মতো ঠাণ্ডা বটুকেরই যখন মাথা খারাপ হল তখন আমাদের আর হতে কতক্ষণ বাকি!
মাথা খারাপ হওয়ার অবশ্য অপরাধ বা কী? থর-এর মরুর ঝড়ে প্লেন থেকে নামার পর থেকে যা আমাদের ওপর দিয়ে যাচ্ছে তাতে মাথা যে এতক্ষণ ঠিক ছিল সেইটেই ভাগ্য।
কারওর মাথায় গোলমাল শুরু হলে তখন তাকে ঘাঁটিয়ে অসুখ বাড়াবার সুযোগ দিতে নেই।
বটুকের কথাটাই তাই যেন মেনে নিয়ে তাকে একটু খুশি করবার জন্য বললাম, জালাগুলো কারও মাথায় ছিল বুঝি?
না, বটুক মাথা নেড়ে জানাল, পর পর ক-টা যেন জালা, ওপরেরটা ছোট, মাঝেরটা বড়, আর তার নীচের দুটো কলসি। সেগুলো নিজে থেকেই বেরিয়ে আবার জাঁতার আড়ালে চলে গেল।
তা যদি গিয়ে থাকে তাহলে আবার দেখা যাবে নিশ্চয়।বটুককে উৎসাহ দিলাম, চোখের দোষ তোমার নেই যে বলব ভুল দেখছ।
বটুক জবাব দিলে না। কিন্তু মনে মনে আমি তখন ওই সম্ভাবনাটাই সঠিক বলে। ধরে নিয়েছি। বটুকের চোখের দৃষ্টি খুব প্রখর, কিন্তু মাথা খারাপ যদি না-ও হয়ে থাকে, দেখতে এবার তার ভুল যে হয়েছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
সুরঞ্জনও ব্যাপারটা বুঝেছে নিশ্চয়। তবু চোখের ইশারায় তাকে বটুককে একটু সামলে রাখতে বলার জন্য তার দিকে চাইতে গিয়ে একটু অবাক হলাম।
সুরঞ্জন যেভাবে চোখ দুটো জানলায় প্রায় সেঁটে ধরে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে তাতে বটুকের কথায় তার খুব অবিশ্বাসের লক্ষণ তো নেই।
তার সম্বন্ধে একটু ভাবিত হয়ে আধা-ঠাট্টার সুরে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমিও জালা-টালা দেখতে পাচ্ছ নাকি?
এখনও পাইনি। আমার দিকে মুখ ফিরিয়েই সুরঞ্জন উত্তর দিলে, কিন্তু বটুক যখন দেখেছে তখন তা একেবারে ভুল হতে পারে না।
এবারে হেসে ফেলে বললাম, বটুকের দেখা ঠিক হলে তো পৃথিবীর বৈজ্ঞানিকেরা সব বিস্ময়ে বোবা হয়ে যাবেন। হাওয়া নেই, জল নেই এমন যমের অরুচি মরুভূমির দেশ, অতি বড় আশাবাদী বৈজ্ঞানিকও যেখানে ভাইরাস কি লিচেন-এর চেয়ে উঁচু ধাপের প্রাণের অস্তিত্ব থাকতে পারে বলে মনে করেন না, সেখানে একেবারে জালা-প্রমাণ জানোয়ার! তা-ও আবার পর পর সাজানো জালা।
