ওখানে তো ঝড় হচ্ছে!
চমকে উঠলাম। যার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম নিজেদের তর্কে মশগুল হয়ে সেই বটুকেশ্বরের গলা। কিন্তু সে বলছে কী?
ঝড়! ঝড় আবার কোথায়?
ওই তো ওখানে!
বটুককে আর আঙুল দেখাতে হল না। তার ঘাড় ঘোরানো দেখেই জানলার দিকে আমরা দুজনেই তখন ছুটে গেছি। নিজেদের অত্যন্ত আহাম্মক ছাড়া আর কিছু ভাবতে পারছি না! হাতে পাঁজি থাকতে মঙ্গলবার নিয়ে তর্ক নইলে করে!
ওই তো সামনে মঙ্গলগ্রহ! অন্তত তাই বলেই আমার ধারণা। কিন্তু বটুক যা বলেছে তাও তো মিথ্যে নয়! সত্যিই ওখানে ঝড় উঠেছে। এমন প্রচণ্ড ঝড় যে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রচণ্ড সাইক্লোনও যার কাছে ছেলেখেলা।
ভাল করে কিছু দেখবারই তো উপায় নেই। ধুলোয় সমস্ত গ্রহ আচ্ছন্ন।
এত ঝড় যেখানে ওঠে সেখানে হওয়া আছে নিশ্চয়! সুরঞ্জন নিজেকেই বোঝাবার জন্য যেন বলেছে, আর হাওয়া মানে কী?
হাওয়া মানেই প্রাণ নাও হতে পারে! সত্যের খাতিরে সুরঞ্জনকে বলতে বাধ্য হয়েছি, মঙ্গলগ্রহের হাওয়া যা আছে তা অত্যন্ত পাতলা। তাতে প্রাণধারণের উপযুক্ত অক্সিজেন আছে কিনা সে বিষয়েও সন্দেহ আছে। একমাত্র যা বৈজ্ঞানিকদের উৎসাহ বাড়িয়েছে তা হল মঙ্গলগ্রহের দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে বেশ যথেষ্ট জলীয় বাষ্পের অস্তিত্ব। জল থাকার লক্ষণ মঙ্গলগ্রহের অন্য জায়গাতেও নাকি পাওয়া গেছে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিকরা ওই গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব সম্বন্ধে তেমন আশান্বিত নন। ওই একান্ত প্রতিকূল আবহাওয়ায় প্রাণ যদি বা থাকে, তা ভাইরাস কি লিচেন-এর চেয়ে উঁচু পর্যায়ের হতে পারে না বলে তাঁদের ধারণা। কেউ কেউ তো সে সম্ভাবনাও স্বীকার করেন না। সৌরমণ্ডলে তো নয়ই, সমস্ত নীহারিকামণ্ডলীতেও কোথাও পৃথিবীর মতো প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তন হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন না।
আপনার বিশ্বাসও যেন তা-ই মনে হচ্ছে। কিন্তু সুরঞ্জন বেশ ক্ষুণ্ণ স্বরেই আরও কিছু বুঝি বলতে যাচ্ছিল।
হ্যাঁ, তাকে বাধা দিয়ে বললাম, একটা কিন্তুর ওপরই আমারও ভরসা।
কিন্তু-র ওপর ভরসা!
সুরঞ্জনের নয়, আমাদেরই বিমূঢ় জিজ্ঞাসা।
কিন্তু হল একটা উল্কা। মর্চিসন মিটিওরাইট নামে যা বিখ্যাত হয়ে আছে। অস্ট্রেলিয়ার এক চাষির খামারে সেটা পড়েছিল। ঘনাদার কাছে এ-ই হয়তো প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা। কিন্তু আমরা যে তিমিরে সেই তিমিরে।
উল্কা পড়েছিল তাতে হয়েছে কী? জিজ্ঞাসা করতে হল—কত উল্কাই তো পৃথিবীতে পড়ছে। আমাদের কলকাতার মিউজিয়মে গেলেই অমন কত উল্কা দেখা যাবে।
এ উল্কা সে সব থেকে আলাদা! ঘনাদা বিশদ হলেন, এ উল্কার ভেতর এমন জিনিস পাওয়া গেছে যার দ্বারা প্রাণের অস্তিত্বের অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়। জিনিসটা হল প্রাণের প্রধান উপাদান অ্যামিনো অ্যাসিড। উল্কা আসে পৃথিবীর বাইরের কোনও মহাশূন্য থেকে। কোনও উল্কায় অ্যামিনো অ্যাসিডের চিহ্ন পেলে পৃথিবীর বাইরেও কোথাও প্রাণের অস্তিত্ব আছে বলেই তাই মনে হয়। বৈজ্ঞানিকেরা অবশ্য যেমন খুঁতখুঁতে, তেমনই সন্দিগ্ধ। অ্যামিনো অ্যাসিডের চিহ্ন পেয়েও তাঁরা সন্তুষ্ট নন। তাঁরা খটকা লাগাতে চেয়েছেন এই বলে যে অ্যামিনো অ্যাসিডের চিহ্ন মানেই অপার্থিব অন্য কোনও গ্রহের প্রাণের প্রমাণ মনে করব কেন? উল্কা পৃথিবীতে এসে পড়বার পর তাতে এখানকার প্রাণেরই কেমন করে একটু ছোঁয়া যে লাগেনি তার ঠিক কী? এ সন্দেহের জবাব একমাত্র ওই মর্চিসন মিটিওরাইট-এই আছে।
উল্কার মধ্যে সে আবার কী জবাব?
জবাব এই যে ওই উল্কাপিণ্ডের মধ্যে যে অ্যামিনো অ্যাসিড পাওয়া গেছে তা ডান-হাতি।
ডান হাতি!
ঘনাদা কি আমাদের আবোল-তাবোল পড়াচ্ছেন?
না, আবোল-তাবোল নয়। ঘনাদা করুণা করে আমাদের তারপর বুঝিয়ে দিলেন, পৃথিবীর প্রাণবস্তুর যে অ্যামিনো অ্যাসিড, তার অণুর গঠন বাঁ-হাতি, অর্থাৎ অণুগুলো বাঁ দিক দিয়ে ঘুরিয়ে সাজানো। আর মর্চিসন উল্কায় তা ডান-হাতি। এইখানেই আমার কিন্তু আর এই কিন্তুর ওপরই ভরসা। এ প্রমাণও সন্দেহে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা যে হয়নি তা নয়। কেউ কেউ বলছেন, ও ডান-হাতি অণু দিয়েও কিছু প্রমাণ হয় না। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকবার পর প্রচণ্ড উত্তাপে বাঁ-হাতি গড়ন ডান-হাতি হয়ে গেছে। অবিশ্বাসীরা যে যাই বলুক, এই মর্চিসন মিটিওরাইট-এর কিন্তুর ভরসা আমি ছাড়িনি।
১০. মঙ্গলগ্রহে গিয়ে নামবার পর
মঙ্গলগ্রহে গিয়ে নামবার পর সে কিন্তুর ওপর ভরসা কিন্তু আর রাখা গেল না।
হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত অনেক প্যাঁচ কযে মঙ্গলগ্রহে গিয়েই নামলাম। প্যাঁচের মধ্যে আসল হল লুটভিককেই কখনও রাগিয়ে কখনও ভয় দেখিয়ে শূন্যযানের কলা-কৌশল একটু বুঝে নেওয়া।
ভাগ্যি ভাল যে তখনও শূন্যযানের আসল রহস্য কিছু জানতে পারিনি। শুধু চালাবার কৌশলটাই শিখে নিয়েছি। চালাবার কায়দা কানুন তার অতি সোজা। বোতাম টেপো, হাতল টানো, চাকতি ঘোরাও ডাইনে বাঁয়ে, আর নজর রাখো ক-টা আলোর ওপর। আমাদের ট্রাফিক সিগন্যালের উলটো নিশান সেখানে। যতক্ষণ লাল ততক্ষণ কামাল। হলদে কি নীল হলেই হুঁশিয়ার হয়ে এদিকে বোতাম টেপো কি ওদিকের হাতল টানো।
সৃষ্টিছাড়া কী সর্বনাশা জিনিস নিয়ে যে কারবার করছি তা ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি বলে অকুতোভয়ে কলকবজা নেড়ে-চেড়ে শূন্যযান মঙ্গলের পিঠে গিয়ে নামিয়েছি।
