ও চাঁদ দুটো তো মঙ্গলগ্রহের! আমি জোরের সঙ্গেই জানালাম।
তার মানে আপনারা তখন মঙ্গলগ্রহের কাছে পৌঁছে গেছেন? শিশির সবিস্ময়ে জানতে চাইলে।
হ্যাঁ, ঘনাদা শিশিরের টিন থেকে নতুন সিগারেট নিয়ে ধরিয়ে তিনটে সুখটান না শেষ করা পর্যন্ত আমাদের মহাশূন্যেই একরকম ঝুলিয়ে রেখে দিলেন।
কিন্তু শেষ টানের পর একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে নিজেই যেন তার মধ্যে হারিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, কী যেন বলছিলাম?।
কী বলছিলেন ধরিয়ে দেবার জন্য সব কটা গলা মুখর হয়ে উঠল।
বলছিলেন ফোবস আর ডিমস-এর কথা।
লুটভিক বলে সেই পাজি পাগলটাকে তখন বেঁধে ফেলেছেন।
নিজেরা চাঙ্গা হয়েছেন কাঠের ছাই খেয়ে।
যন্তর-টন্তর আনাড়ি হাতে নাড়তে গিয়ে প্রায় আছড়ে ভেঙে ফেলেছেন। উড়োজাহাজটা।
উড়োজাহাজ নয়, আহাম্মক কোথাকার! মহাশূন্যে কি হাওয়া আছে যে উড়োজাহাজ চলবে। জেট প্লেনও সেখানে পাত্তা পায় না।
শুনলি না ঘনাদার সে এক আজব পুষ্পক রথ! পৃথিবী থেকে যেতে-আসতে হাওয়ার ঘর্ষণে পোড়ে না, আর আমাদের ঘরবাড়ির মতোই তার আসবাবপত্র।
আরে, উনি কি সত্যিই যন্তর-টন্তরে আনাড়ি হাত লাগাচ্ছিলেন নাকি। ওই ভান করে ওই পাগলা বদমাশটার পেটের কথা সব বার করে নিলেন, বুঝলে না?
আমাদের তিন ভাড়াটে সহায় এমন জ্বালা হয়ে উঠবে আগে কি জানতাম! কোনওরকমে তাদের কোরাস গলার ফাঁকে নিজেদের কথাটা গলিয়ে দিয়ে বললাম, লুটভিক-এর কথায় কোথায় পৌঁছেছেন তার যেন একটু আভাস পেয়েছেন।
ঠিক! ঘনাদা যেন লাইন ধরতে পেরে খুশি হলেন, ফোবস ডিমস-এর নাম শুনেই বুঝলাম নির্ঘাত মঙ্গলগ্রহের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। আনাড়ি আহাম্মক সেজে প্যাঁচ করে লুটভিক-এর কাছে যন্ত্র চালাবার মোটামুটি কায়দাও তখন জানা হয়ে গেছে।
এবার জরুরি একটা পরামর্শের বৈঠক বসাতেই হয়।
লুটভিককে বাঁধা অবস্থায় তার চেয়ারেই বসিয়ে রেখে নিজেদের কামরায় ফিরে এলাম।
সুরঞ্জন দারুণ উত্তেজিত—ছোকরা শুধু গানই গায় না, জ্যোতির্বিজ্ঞান সম্বন্ধে পড়াশোনাও যে আছে তা প্রথম কথাতেই টের পেলাম। প্রশ্ন যা করলে তা কিন্তু একটু ভড়কে দেবার মতো!
জিজ্ঞাসা করলে, আপনি লুটভিক-এর কথা বিশ্বাস করেন?
তার মানে? বিশ্বাস না করবার কী আছে? অবাক হয়ে বললাম, ও মিথ্যে বলবে কেন? বিশেষ ওই রকম আঁতকে-ওঠা অবস্থায়?
ওর মতো শয়তান সব পারে! সুরঞ্জন গম্ভীরভাবে জানালে, আমাদের গুলিয়ে দেবার জন্যই যে ডিমস ফোবস-এর নাম করেনি তার ঠিক কী?
বেশ একটু ভাবনায় পড়েই বললাম, কিন্তু একটা চাঁদ আমরা তো চোখেই দেখতে পাচ্ছি। মাপে-টাপে ফোবস-এর সঙ্গেই মিলছে!
ঠিক মিলছে কী? সুরঞ্জন সন্দেহ প্রকাশ করলে, চাঁদ বলতে যত ছোটই হোক বলের মতো গোল একটা কিছু তো হবে। যা দেখছি তা তো একটা পাহাড়ের ভাঙা টুকরো বলা যায়। তা ছাড়া আমার তো মনে হয় মঙ্গলগ্রহের সত্যিকারের চাঁদ বলে কিছু নেই। যা আছে তা কৃত্রিম উপগ্রহ। মঙ্গলগ্রহের কাছাকাছি পৌঁছলে আমরা সেই
স্যাটেলাইট দুটোই দেখতে পেতাম।
এবার একটু হাসলাম। বললাম, বুঝেছি, কোথা থেকে তোমার এ ধারণা হয়েছে। তুমি সক্লোভস্কি পড়েছ?
হ্যাঁ, পড়েছিই তো! সুরঞ্জন উৎসাহিত হয়ে উঠল, তিনি স্পষ্ট হিসেব করে দেখিয়ে গেছেন যে, ষোলো আর নয় কিলোমিটার ব্যাসের ওই উপগ্রহ দুটো স্বাভাবিক চাঁদ হতে পারে না। আমাদের চেয়ে কোনও সভ্য বৈজ্ঞানিক জাত কোনও কালে ওই দুটো স্যাটেলাইট তৈরি করে আকাশে ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল। সে জাত এখন না থাকতে পারে, কিন্তু তাদের উপগ্রহ এখনও চাঁদের মতো মঙ্গলগ্রহকে প্রদক্ষিণ করে ঘুরছে।
তুমি ঠিকই বলেছ। হেসে বললাম, বিখ্যাত রুশ বৈজ্ঞানিক সক্লোভস্কি ওই রকমই লিখে গিয়েছিলেন বটে। তাঁর কথায় তখনকার বৈজ্ঞানিক মহলে সাড়া পড়ে গিয়েছিল, যেমন পড়েছিল ১৮৭৭-এ, গত শতাব্দীতে, ইটালির জ্যোতির্বিদ জোভানি স্কিয়াপারেললি-র মঙ্গলগ্রহের বুকে কাটা খালের রেখা আবিষ্কারের ঘোষণার পর।
স্কিয়াপারেললি-র কাটা খালের রেখা দেখা, আর সূক্লোভস্কির কথার তফাত আছে। কাটা খালের রেখা তো পরে ভাল উন্নত দূরবিনের দেখায় ভুল বলে জানা গেছে, সুরঞ্জন আমার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতটার প্রতিবাদ জানালে, কিন্তু মঙ্গলগ্রহের চাঁদ যে কৃত্রিম তার অন্য প্রমাণও আছে। প্রথম হল ফোবস যার নাম সে চাঁদের গতি। সে উপগ্রহটা মঙ্গলের দিনরাত্রির অর্ধেক সময়ের মধ্যে মঙ্গলকে এক চক্কর দিয়ে আসে। মঙ্গলের দিন আমাদের পৃথিবীর দিন-রাত্তিরের চব্বিশ ঘণ্টার সামান্য কয়েক মিনিট বেশি। ফোবস-এর মঙ্গল ঘুরে আসতে লাগে মাত্র এগারো ঘণ্টা। ডিমস-এর ব্যাপার আবার একেবারে উলটো। সমস্ত সৌরমণ্ডলে সব গ্রহের মোট বত্রিশটি চাঁদ আছে। ফোবস-এর মতো এত বেগে কোনও চাঁদ ঘোরে না। ডিমস আবার একেবারে সৃষ্টিছাড়া। তার গতি, আর সব চাঁদ যে দিকে ঘোরে, তার উলটো মুখে।
না, এবার সুরঞ্জনকে থামাতে হল। তুমি এত কিছু জেনেও একেবারে হালের খবর জানো না। ফোর্বস যে মঙ্গলগ্রহকে এত তাড়াতাড়ি কেন চক্কর দেয় তার হদিস না পেলেও জ্যোতির্বিদরা এখন জানেন যে ফোবস-এর আকার এমন গোল নয় যে তার ব্যাস সঠিক হিসেব করা যায়। সূক্ষ্ম আধুনিক পর্যবেক্ষণ জানা গেছে যে ফোবস লম্বায় ২৪.৮ কিলোমিটার আর চওড়ায় ২০.৮ একটা পাথরের চাংড়া। সুতরাং আমরা যা দেখেছি সেটা ফোবস বলেই মনে হয়। ডিমস যে উলটোদিকে ঘোরে এ ধারণাও ভুল। ফোবস যেমন অত্যন্ত চটপটে, ডিমস তেমনই একেবারে গদাইলস্করি চালে মঙ্গলকে প্রদক্ষিণ করে। এ প্রদক্ষিণে তার চব্বিশের চেয়ে আরও ঘণ্টা তিনেক বেশি লাগে বলে মনে হয় সে যেন উলটোদিকে যাচ্ছে। মঙ্গলগ্রহের ওপর থেকে দেখলে তো তাকে শামুকের গতিতে আড়াই দিনে উলটো দিকে অস্ত যেতে দেখা যাবে। ডিমস সম্বন্ধে ভুল ধারণাটা এই থেকেই গড়ে উঠেছে।
