এটা কি সংক্রামক কোনও রোগ? তা তো মনে হয় না।
তাহলে যা খেয়েছি সেই খাবারের ভেতরকার বিষ-টিষ কিছু?
কিন্তু বিষ যদি হয় তাহলে সাতদিন কোনও কিছু হয়নি কেন? আর লুটভিক অন্য যা-ই করুক, তার পরীক্ষার জন্যে পুষে রাখা গিনিপিগদের বিষ দিয়ে মারবার চেষ্টা করবে না।
কিন্তু বুকের যে কষ্টটা হচ্ছে তার সঙ্গে আমাদের খাদ্যের কিছু একটু সম্পর্ক কি নেই? তা না হলে একসঙ্গে আমাদের সকলেরই এক অবস্থা হবার আর কোনও কারণ তো ভেবে পাচ্ছি না।
ওই পর্যন্ত ভাবতেই কারণটা হঠাৎ মাথার মধ্যে বিদ্যুচ্চমকে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কারণটা, ওই আমাদের খাবারের মধ্যেই তো রয়েছে, তবে বিষের মতো কোনও মেশানো জিনিসে নয়, শরীরে বিশেষ করে আমাদের হার্ট-এর অত্যন্ত দরকারি উপাদানের ঘাটতিতে।
কোথায় পাই সে উপাদান।
ওই কষ্টের ভেতরই জোর করে উঠে দাঁড়ালাম।
সুরঞ্জনও একটা ধাক্কা সামলে তখন কাত হয়ে উঠে বসেছে। হঠাৎ ওই অবস্থাতেই সে হাঁ হাঁ করে উঠল।
ওকী! করছেন কী আপনি? অগ্নিকাণ্ড করবেন নাকি একটা!
আমি তখন সত্যিই একটা টেবিলের পায়া দাড়ি কামাবার ব্লেড দিয়ে চেঁছে সেই ছাঁটগুলোয় দেশলাই দিয়ে আগুন ধরাচ্ছি।
কী ভাগ্যি শূন্যযানের কামরার আসবাবপত্রগুলো মামুলি ও সাধারণ।
টেবিলটা কাঠের না হয়ে প্লাস্টিক কি স্টিলের হলে এ কাহিনী আর তোমাদের শোনার ভাগ্য হত না!
ঘনাদা থামলেন।
আমাদের চারজনের কাউকে আর কিছু বলতে হল না। আমাদের ভাড়াটে ডাক্তারদের তখন ঘোর লেগে গেছে।
তাহলে, অমনই করে কাঠের ছাই জোগাড় করলেন? মুগ্ধ বিস্ময় ফুটে উঠল কার্ডিওগ্রাম সান্যালের মুখে।
আর ওই কাঠের ছাইয়ের জোরেই সবাই সেরে উঠলেন? প্রেশার সোম ভক্তিতে গদগদ।
শুধু সেরেই উঠলাম না, ঘনাদা ঈষৎ হেসে বললেন, আমাদের যা সবচেয়ে বড় সমস্যা তা-ও মিটিয়ে ফেললাম।
» ০৯. কাঠের ছাই একটু করে
কাঠের ছাই একটু করে মুখে নিয়ে নিজেরা চাঙ্গা হবার পর ব্যস্ত হয়ে উঠলাম লুটভিক-এর জন্য।
ওই তো হাডিউসার চেহারা। এতক্ষণে কেঁসে গেছে কি না কে জানে।
মাসখানেক যে দরজা বন্ধ ছিল, চেয়ার-টেবিল ঠেকে সরিয়ে তা খুলে ছুটলাম কন্ট্রোল মের দিকে।
ভয় ছিল, ভেতর থেকে দরজা না বন্ধ করে দিয়ে থাকে। তাহলে ভেঙে খোলা ছাড়া উপায় নেই। অত সবুর কি তখন সইবে?
না, বন্ধ নয়, দরজা খোলাই। আর লুটভিক ওই রোগা হাড়েই তখনও টিকে আছে।
তবে অবস্থা কাহিল। কী সব অদ্ভুত ঘড়ি-টড়ি আর নানা রঙয়ের বোতাম বসানো কন্ট্রোল বোর্ডের টেবিলটা ধরে কোনওমতে নিজেকে সামলাতে চেষ্টা করছে।
আমরা ঘরে ঢোকার পর চমকে মুখ তুলেও ঘাড়টা সোজা রাখতে পারল না। কিন্তু মাথাটা আবার বুকের ওপর ঝুলে পড়ার আগে চোখে যে দৃষ্টিটা হানল তাতে যেন সাতটা কেউটের বিষের জ্বালা।
আমাদের যত বড় দুশমনই হোক, তাকে এমন করে মরতে দিতে তো পারি না। তাই তাড়াতাড়ি কাঠের ছাইটা তার মুখে দিতে গিয়েও কিন্তু থমকে দাঁড়ালাম।
ঠিক তো! আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যার সমাধান তো এখন আমারই হাতের মুঠোয়। কাঠ-পোড়া ছাই যার দাওয়াই সেই অসুখই তো আমাদের শাপে বর হয়ে গেছে।
শিগগির একটা দড়ি আনো তাড়া দিলাম বটুককে। অন্য কেউ হলে কী দড়ি, কেন দড়ি জানতে চেয়ে কিছুটা সময় নষ্ট করত। বটুকেশ্বরের ওসব দোষ নেই। হুকুম শোনা মানে সাধ্য থাকলে তামিল করা।
চোখের নিমেষে দড়ি হাতে নিয়ে সে হাজির। এবার সুরঞ্জনকেই বললাম, বাঁধে ওকে।
বাঁধব?
সুরঞ্জন দড়ি হাতে নিয়ে হতভম্ব।
হ্যাঁ, বাঁধবে।
ধমকে বোঝালাম এবার, এমন সুযোগ আর পাওয়া যাবে না। এই কাবু অবস্থায় একে বাঁধতে পারলে শেষ পর্যন্ত আমাদের রক্ষা পাওয়ার কিছু আশা থাকবে।
এর পর আর দুবার বলতে হল না।
সুরঞ্জন যখন উৎসাহভরে হাতে পায়ে দড়ির বাঁধন দিচ্ছে, লুটভিক-এর মুখে তখন একটু ছাই ভরে দিলাম।
চাঙ্গা হয়ে উঠতে তার দেরি হল না। কী তখন তার মুখের হোড়! ফরাসি জার্মান ইংরেজি রুশ এমন কী এদেশে থাকার দরুন দেহাতি রাজস্থানি ভাষাতেও কোন গালাগাল দিতে সে বাকি রাখলে না।
বটুকেশ্বর নির্বিকার–
সুরঞ্জন রেগে তখন ফুলতে শুরু করেছে। বললে, দেব মুখটায় একটা কিছু খুঁজে?
কন্ট্রোল বোর্ডটা তখন ভাল করে লক্ষ করছি! এটা দেখতে দেখতেই বললাম, না, ওকে কথা বলাবার দরকার হবে। মুখ বন্ধ করলে তাই চলবে না।
গালাগাল ছেড়ে কথা কি সহজে বলে! ভালভাবে অনেক চেষ্টা করেও বিফল হয়ে শেষে চালাকি করে বলাতে হল।
যন্ত্রপাতিগুলো দেখতে দেখতে হঠাৎ একটা চাবি ঘুরিয়ে দিতে গেলাম।
নেকড়ের দৃষ্টি নিয়ে লুটভিক আমায় লক্ষ করছে তা জানি! আমার কাণ্ড দেখে একেবারে রেগে আগুন হয়ে চিৎকার করে উঠল, সর্বনাশ! ওটা ছুঁসনি আহাম্মক জানোয়ার কোথাকার! এখুনি উলটো বেগের যন্ত্র চালু হয়ে যাবে।
তাহলে এই বোতামটা টিপে দেখি, বলে আরেকটা খুদে বালবের মতো উজ্জ্বল বোতাম টিপতে গেলাম।
না, না, না!—এবার লুটভিকের প্রায় আর্তনাদ—ও বোতাম টিপলে আর রক্ষা নেই। দশগুণ বেগ বেড়ে শূন্যযান ওই ফোবস কি ডিমস-এর ওপরেই আছড়ে পড়বে।
ফোবস? ডিমস?
বিস্মিত প্রশ্নটা লুটভিক-এর কাছে ঘনাদার নয়, ঘনাদারই কাছে আমাদের। এতক্ষণ বাদে ধরা-ছোঁয়ার মতো দুটো নাম শুনে আর চুপ করে থাকতে পারা যায়!
ফোবস ডিমস মানে তো সেই দুটো চাঁদ? শিবু ঘনাদার সমর্থন চাইলে।
