শিবুর ওপর ঘনাদা আজ একটু খুশি, নইলে বেফাঁস বাগড়া দেবার বেয়াদবির ফল কী হত কে জানে!
ঘনাদা এককথায় মুখে হয়তো কুলুপই এঁটে দিতেন।
আজ কিন্তু তিনি ঈষৎ একটু হেসে শুধু বললেন, হ্যাঁ, তখন মাঝে মাঝে গিয়ে থাকতে হত।
ঘনাদার মুখের দিকে চেয়ে তটস্থ হয়ে ছিলাম এতক্ষণ! তাঁর এ কথায় হাঁফ ছেড়ে শিবুকে ধমক দেওয়ার ছলে তাঁকে আমড়াগাছির আর কি কিছু বাকি রাখি!
গৌর শিবুকেই যেন একহাত নিলে, ঘনাদা দিল্লিতে থাকবেন তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!
ক্যাবিনেট ক্রাইসিস-এর জন্যই থাকতে হত নিশ্চয়।
আমি আর শিশির যেন নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে নিলাম।
শুধু ক্যাবিনেট ক্রাইসিস কেন? গৌর আমাদের সংশোধন করলে, ডিফেন্সের কোনও প্রবলেম হলে—ওঁকে ছাড়া ডাকবে কাকে?
ওসব কথা থাক না—ঘনাদার যেন নিজের গৌরবের কথা বিনয়ে বাধল। তাই। চাপা দিয়ে বললেন, সুরঞ্জন ওই যুক্তিতেই কাত হয়ে শেষ পর্যন্ত রাজি হল যেতে। কিন্তু একটি শর্ত। বটুক মানে বটুকেশ্বরকে সঙ্গে নিতে হবে। বটুকেশ্বর হল সুরঞ্জনের খাস বাটলার বলতে যা বোঝায় তাই। সুরঞ্জনের খাওয়াদাওয়া পোশাকআশাক থেকে সবকিছু দেখাশোনার ভার বটুকের ওপর। শুধু তাই নয়, বটুক সুরঞ্জনের গানের তবলচি, অভিনয়ের মেকআপম্যান। বটুক বাদে সুরঞ্জনের সবকিছু অচল।
এ হেন বটুককে সঙ্গে নেব সে আর বেশি কথা কী! তখন যা গরজ, সুরঞ্জন আবদার ধরলে অমন দশটা বটুককে নিতেও আপত্তি করতাম না।
দিল্লি থেকে আমেদাবাদে যাবার তখনও রেগুলার প্লেন-সার্ভিস হয়নি।
ভাড়াই করলাম তাই একটা ছোট প্লেন দিল্লি ফ্লাইং ক্লাব থেকে।
দেরি করবার সময় নেই। পাইলটের খুতখুঁতনি সত্ত্বেও সাত-তাড়াতাড়ি সেইদিন দুপুরেই রওনা হলাম। কতক্ষণের বা মামলা। সোজা গেলে বড়জোর শ-বারো কিলোমিটার। খুব বেশি লাগে তো ঘণ্টা পাঁচেকের মধ্যেই পৌঁছে যাব।
পাইলট খুঁতখুঁত করেছিল ঝড়ের ভয়ে। বছরের ওই সময়টায় বিকেলের দিকে প্রায়ই নাকি ও অঞ্চলে বেশ দুরন্ত ঝড় ওঠে। আবহাওয়া অফিস থেকে সেদিন নাকি ওই রকম ঝড়ের পূর্বাভাসও দেওয়া হয়েছে।
ওই পূর্বাভাস শুনেই যেটুকু দ্বিধা ছিল সব কেটে গেল।
হাওয়া অফিস বলেছে ঝড় হতে পারে! পাইলটকে হেসে বললাম, তা হলে তো আর ভাবনাই নেই! বেপরোয়া হয়ে প্লেন ছাড়তে পারো ঝড় সম্বন্ধে আজকের দিন অন্তত নিশ্চিন্ত।
হাওয়া অফিসের কথা সেইদিনই বেদবাক্য হয়ে উঠবে তা কি ভাবতে পেরেছি।
জয়পুর ছাড়াবার পরই সত্যি সত্যিই চোখে অন্ধকার দেখলাম। মরুভূমির ঝড়! আকাশ বাতাস মাটি সব একাকার করে শুধু বালির ঝাপটা।
সে তো আর যন্ত্রে চালাবার অটোমেটিক কন্ট্রোলের হাল-আমলের প্লেন নয়। সেকালের পাখা ঘোরানো হালকা প্লেন। চোখে দেখে চালাতে হয়।
প্রচণ্ড বালির ঝড়ে কানা করে কোথায় যে আমাদের নিয়ে চলল তা বোঝাই গেল না।
ইষ্টদেবতার নাম জপ করতে করতে পাইলটের শুধু তখন চেষ্টা প্লেনটা নীচে আছড়ে না পড়ে।
সে চেষ্টা সফল হল। কিন্তু কোথায় যে প্লেনটা নামল তার হদিসই পাওয়া গেল। ভারতবর্ষের মধ্যেই আছি, না ঝড়ের দাপটে পশ্চিম পাকিস্তানেই গিয়ে পড়েছি, তা-ও জানবার উপায় নেই।
এমন কিছু দূর নয়। একটু দিক ভুল হয়ে থাকলে সে মুলুকে গিয়ে পড়ার খুবই সম্ভাবনা।
প্লেন কোনওরকমে নামাতে পারলেও ঝড়ের হাত থেকে তখনও রেহাই নেই। প্লেনসুদ্ধ আমাদের হাওয়ার বেগেই বুঝি উড়িয়ে নিয়ে যাবে।
০৫. প্রচণ্ড একটা ঝাপটা
আমরা তিনজন কোনওরকমে নামবার পর প্লেনটার সেই অবস্থাই হল। ঝড় তো দারুণ বেগে বইছে-ই, তার মধ্যে প্রচণ্ড একটা ঝাপটা এসে পাইলট সমেত প্লেনটাকে যেন কাগজকুচির মতো ঝেটিয়ে চোখের আড়াল করে দিলে।
নিজেরা তখন চোখমুখ চাদরে বেশ করে বেঁধে বালির ওপরই শুয়ে পড়েছি। ঝড়ে যাতে উড়িয়ে নিয়ে না যায় তাই পরস্পরের হাত ধরে আছি প্রাণপণে।
আশা এমনিতেই কিছু নেই। তবু তিনজনে একসঙ্গে থাকলে একটু যুঝতে অন্তত পারব। ভরসাও কিছু পাব পরস্পরের কাছে থাকার দরুন।
কিন্তু সে ভরসা পেয়ে শেষ পর্যন্ত কিছু লাভ হবে কি?
পাকিস্তানের মধ্যে পড়ে থাকি বা না থাকি, থর মরুভূমির মধ্যে যে আমাদের প্লেন নেমেছে সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ তখন নেই। আয়তনে না হোক ভীষণতায় এ মরুভূমিটি সাহারার চেয়ে কম যান না। তিনটে অসহায় নিঃসম্বল আর এ জগতের পক্ষে একান্ত আনাড়ি মানুষ শুধু হাত ধরাধরি করেই এ মরুভূমি থেকে কি উদ্ধার পেতে পারে? আমাদের প্লেনটার তো কোনও পাত্তা নেই। চেষ্টা করলেও আমাদের মতো তিনটে প্রাণীকে এই ধু ধু শূন্যতায় খুঁজে বার করা পাইলটের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং যা কিছু নিজেদের চেষ্টাতেই করতে হবে। কিন্তু, উদ্ধার পেতে কোথায় কোন দিক যাব!
ঝড়ের দাপট ক্রমশ কমে এল। তখন বেশ রাত হয়ে গেছে। মরুভূমির শান্ত পরিষ্কার আবহাওয়ার রাত নয় যে, আর কিছু না হোক, আকাশের ঝকঝকে তারা দেখেই কিছুটা দিক-নির্ণয় করা যাবে।
চারিদিকে মরুঝড়ের রেশ রেখে যাওয়া ঘোলাটে একটা বিশ্রী অন্ধকার। বালির ওপর থেকে উঠে বসে নিজেদেরই ভাল করে তখন দেখতে পাচ্ছি না।
তিনজনের মনেই তখন এক প্রশ্ন।
কিন্তু মুখ ফুটে কেউ আর কিছু বলছে না। বলে লাভও কিছু নেই। মনে মনে সবাই তখন জানি যে নেহাত অঘটন কিছু না ঘটলে আমাদের উদ্ধার পাবার কোনও আশাই নেই। প্লেন থেকে কোনওরকমে নামবার সময় নিজেদের জামা কাপড়-জুতো আর বালির ঝাপটা সামলাবার জন্য দুটো চাদর ছাড়া আর কিছু নিয়ে নামিনি। অন্য কিছু দূরে থাক, সকাল পর্যন্ত তেষ্টা মেটাব এমন একটা ফোঁটা জলও নেই।
