চোখে যেন দুর্যোগের লক্ষণ।
মাত্রা কি ছাড়িয়েই গেল নাকি?
তা যাক না। আমাদের মতো কৌঁসুলি তা হলে আছে কী করতে! ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে, আবার টেনে তুলে, আবার ছাড়িয়ে আনাই তো আমাদের বাহাদুরি।
সেই বাহাদুরিই দেখাল শিবু।
হাত গুটিয়ে আছেন কেন, ঘনাদা? খান আপনি। শিবুর উদার উসকানি।
ঘনাদাকে আর দুবার বলতে হয়। প্লেট থেকে একটা গোটা শিঙাড়া এর মধ্যেই তিনি যথাস্থানে প্রেরণ করেছেন। সত্যি বলতে গেলে স্টপওয়াচ না থাকলে শিবুর মুখ থেকে প্ররোচনা খসা আর তাঁর নিজের মুখে শিঙাড়া প্রেরণ—কোনটা আগে তা নির্ণয় করা সম্ভব নয়। আমাদের স্কুল চাক্ষুষ বিচারে প্ররোচনাটা প্রেরণের কাছে এক চুলের জন্য মার খেয়েছে বলেই যেন লাগল।
ওদিকে সাজা-ডাক্তাররা তখন একেবারে খাপ্পা।
আপনারা জেনে শুনে মানুষকে খুন করছেন!
আপনাদের ক্রিমিন্যালি প্রসিকিউট করা উচিত।
ওঁকে ওই শিঙাড়া খাওয়ানোর মানে কী তা জানেন?
জানি। গুরুগম্ভীর জবাবটা এবার শিবুর। জানেন!
ব্লাডটেস্ট গুপ্তর তিক্ত বিদ্রুপ, কী জানেন?
জানি যে খাওয়া মানে হজম! শিবু যেন গুরুমশাই।
হজম তো পেটে! কার্ডিয়োগ্রাম সান্যাল যুক্তির সাঁড়াশি চালালেন, কিন্তু বুকে, মানে ওঁর হার্টে কী হতে পারে তা ভেবেছেন?
ভেবেছি। শিবুর মুরুব্বি চালে মোক্ষম জবাব—হার্টের কিচ্ছু হবে না। ওই কাঠপোড়া ছাই আছে কী করতে! ইচ্ছে করলে উনি একটা কেন, পাঁচটা প্লেট সাবাড় করতে পারেন।
ঘনাদা শিবুর পরামর্শ আর কী করে ঠেলেন?
যথার্থই গুণে গুণে পাঁচটি প্লেট সাবাড় করবার পর যেন কর্তব্যবোধে তোতাপুলির দিকে হাত বাড়ালেন।
তাঁর চোখে তখন যে ভাব দেখলাম তা কৃতজ্ঞতা যদি না হয় তা হলে তারই মাসতুতো-পিসতুতো কিছু। আমাদের আসর যে এর পর মালাই কুলপির মতো জমবে এ বিষয়ে অন্তত আর কোনও সন্দেহ রইল না।
০৪. অনুমান ভুল হয়নি
আমাদের অনুমান ভুল হয়নি। মাংসের শিঙাড়া-তোতাপুলিতে টঙের ঘরের আবহাওয়াই বদলে দিয়ে গেল।
কাঠপোড়া ছাইয়ের ভরসাতেই নিশ্চয়, অকুতোভয়ে কণ্ঠা পর্যন্ত বোঝাই করে ঘনাদা নীচে থেকে বয়ে আনা আরামকেদারায় গা এলিয়ে দিলেন বটে, কিন্তু তা শুধু দুমিনিটের জন্য শিশিরের ধরিয়ে দেওয়া সিগারেটে কটি সুখটান দিয়ে যেন ভেতরের স্টিম তোলবার জন্য।
সুখটান শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে বসে ধোঁয়ার কুণ্ডলিতেই যেন পাকিয়ে ঘনাদা, আট কোটি কিলোমিটার থেকে উপাখ্যানের রকেট একেবারে উপক্রমণিকায় টেনে এনে যেখানে নামালেন সেটা রাজস্থানের মরু বলেই মনে হল।
হ্যাঁ, ঘনাদা স্মরণশক্তিটা যেন ঠিক মতো ফোকাস করে বললেন, দিল্লি থেকে আমেদাবাদ যাচ্ছিলাম। আচমকা ওই অমন একটা বেয়াড়া জায়গায় বাধ্য হয়ে প্লেনটা নামাতে না হলে সুরঞ্জন আর বটুককে তাদের দলের কাছে ভালয় ভালয় আমেদাবাদে পৌঁছে দিয়ে আমি একটা বাংলার নাটুকে দলের মান বাঁচাই। আমার জানা টহলদার এক নাটুকেদল দিল্লি-আগ্রা হয়ে আমেদাবাদে গিয়েছিল নাটক দেখাবার বায়না নিয়ে। নাটক আবার কবিগুরুর রক্তকরবী আর চিরকুমার সভা। রক্তকরবীর রঞ্জন যে করবে সে নাকি পা ভেঙে হাসপাতালে। আর অক্ষয়ের পার্ট যার করবার কথা সে রিহার্সেলেই বেসুরো গেয়ে নিজে থেকেই হাওয়া। দিল্লিতে আমার কাছে তাই টেলিগ্রাম—যেমন করে হোক রঞ্জন আর অক্ষয়ের পার্ট নেবার মতো হিরো পাঠান। নইলে বাংলার মান যায়।
বিপদ বুঝলাম। কিন্তু কাকে পাঠাব? দেবব্রত, দ্বিজেন মুখুজ্যে, না সবিতাব্রত? উত্তমকুমার, না সৌমিত্র? বড় গাইয়ে বা হিরো কি মুড়ি-মুড়কির মতো সস্তা! বড় তো দূরের কথা, ছোটখাটোদেরও এখন পায়া কি কম ভারী! দেশ ছেড়ে আমেদাবাদে কারও প্রক্সি দিতে যেতে তারা রাজি হবে কেন?
এমন সময় সুরঞ্জনের কথা মনে পড়ল। হ্যাঁ, সুরঞ্জন রাজি হলে একাধারে সব সমস্যা মিটে যায়। পেশাদার নয়, শৌখিন। সে একাই রক্তকরবীর রঞ্জন আর চিরকুমারসভার অক্ষয় দুই-ই অনায়াসে চুটিয়ে চালিয়ে দিতে পারবে। যেমন চেহারা, তেমনই অভিনয়, তেমনই গানের গলা।
সুরঞ্জন—সুরঞ্জন সরকারের নাম কেউ নিশ্চয় এ কালে শোনেনি। শুনবে কোথা থেকে? এ দেশ তার প্রতিভার পরিচয় পাবার সুযোগই পেল কতটুকু? সে এ দেশে থাকলে এত দিনে নাটক সিনেমা সাহিত্য সব কিছুর সাপ্তাহিক-মাসিক বার্ষিকগুলোর মলাট তারই একরকম একচেটে হয়ে থাকত।
সুরঞ্জনের কথা মনে হতেই তার হোটেলে ফোন করলাম। সুরঞ্জন ভাগ্যক্রমে তখন দিল্লিতে একটা ছোটখাটো জলসায় গাইতে এসেছে। আমার প্রস্তাব শুনে একটু দোনামোনা করে শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেল। তাকে অবশ্য অনেক করে বোঝাতে হয়েছিল। তাতেও কিছু হয়তো হত না। পয়সাওয়ালা বড় ঘরের ছেলে। গান বাজনা অভিনয় তার শখ। তাই বলে কোনও টহলদার নাটুকে দলের হয়ে গাইতে বা অভিনেতার প্রক্সি দেবার তার কী দায় পড়েছে।
শেষ পর্যন্ত এক যুক্তিতেই তাকে কাবু করতে পারলাম। বাংলা দেশ নয়, আলাদা প্রদেশ গুজরাট। সেখানে রবীন্দ্রনাথের নাটক গুবলেট হয়ে তাঁর নামের অমর্যাদা হওয়াটা কি ভাল হবে? তাঁর আর বঙ্গভূমির খাতিরেই যেমন করে হোক আমাদের এ দায় উদ্ধার করে দেবার চেষ্টা করতেই হবে। শুধু তাকেই তা নয়, আমাকেও কী বলে এককথায় দিল্লি ছেড়ে যেতে হচ্ছে তো!
আপনি তখন বুঝি দিল্লিতে থাকতেন? শিবু প্রশ্নটুকু বুঝি আর না করে পারলে না।
