তাই ভয়ে দিশেহারা হয়ে যেখানে যাকে পেয়েছি সবরকম পরীক্ষার জন্য ডাকিয়ে এনেছি। তখন কি জানি যে আপনার নিজের কাছেই কাঠপোড়া ছাইয়ের ধন্বন্তরী আছে অমন!
আচ্ছা, ওই কাঠপোড়া ছাই, রিলে রেসের মতো আমি, শিবু ও শিশির পর পর কথার খেই টেনে নিয়ে যাবার পর গৌর শেষ চালটা দেয়, ওটা আপনার সেই আট কোটি কিলোমিটারেই কাজে লেগেছিল বুঝি?
তাইতেই বাজিমাত। আর ঠেলাঠেলির দরকার হয় না। চাকা আপনা থেকেই গড়িয়ে চলে।
না। ঘনাদাকে যেন একটু ভেবে নিয়ে বলতে হয়, তখনও পুরো আট কোটি হয়নি। হঠাৎ পাথর। পাথর! একটা পাহাড়ের চাঁই। বলে চিৎকার শুনে চমকে উঠলাম! সেই সঙ্গে টের পেলাম বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধড়ফড় করছে।
উত্তেজনা হওয়া তো আশ্চর্য কিছু নয়।
আটলান্টিকের মাত্র ছ-হাজার কিলোমিটারের অজানায় পাড়ি দেবার পর সান সালভাডোর-এর প্রথম ডাঙা দেখে কলম্বাস আর তাঁর নাবিকেরা যদি ধেই ধেই নৃত্য করে থাকেন, তা হলে আট কোটি কিলোমিটার মহাশূন্যে ছুটে এসে প্রথম ধরা-ছোঁয়ার মতো কঠিন কিছু একটার খবর শুনে উত্তেজনা কি তার চেয়ে কম হবে?
কিন্তু বুকের কষ্টটা যে শুধু উত্তেজনায় নয় তা বুঝতে দেরি হল না।
কোনও রকমে টলতে টলতে জানলাটায় গিয়ে তখন দাঁড়িয়েছি।
সুরঞ্জন তখনও পাগলের মতো হাত নেড়ে চিৎকার করছে, দেখেছেন? ওই দেখুন কী প্রকাণ্ড একটা পাথরের চাংড়া! পেয়েছেন দেখতে?
দেখতে খুবই পেয়েছি।
হ্যাঁ, পাথরের চাংড়া হিসেবে প্রকাণ্ড বটে, কিন্তু তা ছাড়া আর কিছু তো নয়। মাপ যা মনে হল তাতে লম্বায় চওড়ায় বড় জোর পঁচিশ আর কুড়ি কিলোমিটার।
আমাদের যা বিপদ আর সমস্যা তা তো ওতে মিটবে না।
এইটুকুমাত্র আশা করা যায় যে অকূল সমুদ্রের জলে ফল-ভরা একটা গাছের ডাল ভাসতে দেখে কলম্বাস যেমন কাছাকাছি ডাঙার আশ্বাস পেয়েছিলেন, এই পাথরের চাংড়ায় তেমনই শূন্যমার্গের কোনও আশ্রয়ের ইঙ্গিত থাকতে পারে।
কিন্তু কোথায় সে আশ্রয়?
মহাশূন্যে প্রায় আট কোটি কিলোমিটার পার হয়ে কোথায় যে এসেছি কিছুই জানি না।
যার জানবার কথা সেই উন্মাদ লুটভিক এর হাত থেকে বাঁচবার জন্যই তো তাকে বাইরে রেখে এ কামরার দরজা এঁটে নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দি হতে হয়েছে। সঙ্গীর মধ্যে আছে ওই সুরঞ্জন আর নেহাত গোবেচারি বটুকেশ্বর।
মহাশূন্যের এই অজানা বিস্তারে আশ্রয় নেবার মতো জায়গা কি সত্যিই মেলা সম্ভব? আর মিললেও তাতে যে নামতে পারব, তার আশা কোথায়?
মোটা সাতপুরু কাঁচের জানলা দিয়ে পাথরের চাংড়াটা দেখতে দেখতে এসব ভাবনা ছাপিয়ে বুকের কষ্টটা ক্রমশ তখনও বাড়ছে।
একটু জল আনবার জন্য সুরঞ্জনকে বলতে গিয়ে দেখি বুকের ওপর হাত চেপে সে মেঝের ওপর বসে পড়েছে। কী হল কী? বলে কোনওরকমে হাঁক দিলাম, বটুক! বটুক!
কিন্তু সাড়া পেলাম না কারও।
নিজেরই তখন মেঝেতে একটু নেমে বসলে আরাম হবে মনে হচ্ছে।
কিন্তু তার আগেই জ্ঞানটা লোপ পাবে নাকি! সেইরকম যেন লক্ষণ।
চমৎকার একটা সমাপ্তি! বসতে গিয়ে তখন ভাবছি, মহাশূন্যে পৃথিবী থেকে আট কোটি মাইল দূরে চারটি মানুষ। এমন করে বেঘোরে নিয়তি যাদের হিসেব চুকিয়ে দিতে যাচ্ছে, একজন তার মধ্যে লুটভিক-এর মতো উন্মাদ বৈজ্ঞানিক, একজন সুরঞ্জনের মতো গানের জগতের ভাবী দিকপাল, বটুকেশ্বরের মতো একজন মুখসুখ গোবেচারা অনুচর, আর আমার মতো একজন অকর্মণ্য অপদার্থ সর্বঘটের কাঁটালিকলা।
ঘনাদার মুখে এমন আত্মনিন্দা!
সকলে মিলে সরবে প্রতিবাদ করতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তার তখন সময় নেই।
প্রতিবাদ তাঁর কানেও যেত কি না সন্দেহ।
তিনি তখন চোখ-কান সব সামনের ছাদের সিঁড়ির দিকে খাড়া করে বসে আছেন।
সেখানে হাতে প্রকাণ্ড ট্রে সমেত বনোয়ারিকে দেখা গেছে। তার পেছনে আর-একটা ছোট ট্রে নিয়ে রামভুজ।
ঘরে এসে নামাবার পর জোড়া ট্রের রহস্য বোঝা গেল। একটিতে মাংসের শিঙাড়া, অন্যটিতে তোতাপুলি।
এসব আবার কেন হে? ঘনাদা একটু যেন বৈরাগ্যের ভাব দেখালেন।
এমন একটা সুযোগ দিলে আর ছাড়া যায়।
আমি তাই বারণ করেছিলাম ওদের! শিশির যেন আমাদের সকলের ওপর খাপ্পা হয়ে শোনাল, বলেছিলাম ঘনাদার হার্টের অসুখ। ওপর থেকে নীচে নামেন না, দুবেলা তাঁকে চাঙ্গা হতে সুরুয়া খেতে হচ্ছে, আর তাঁর জন্য এইসব বিষের ব্যবস্থা করছিস! তাঁকে কি ওই মাংসের শিঙাড়া আর তোতাপুলি দিয়ে লোভ দেখাতে চাস? তিনি কি টলবার মানুষ?
যা, নিয়ে যা সব ছাই পাঁশ! শেষ হুকুমটা বনোয়ারিকে, আমাদের গুলো রেখে ওঁর জন্য শুধু দুটো চিড়ে ভিজিয়ে নিয়ে আয়, আর তার যদি জোগাড় না থাকে তো দুটি থিন অ্যারারুট বিস্কুট।
ঘনাদার মুখের দিকে চাইতেও তখন আর ভরসা হচ্ছে না।
তাঁর নিজের ফাঁদেই তাঁকে ফেলা হয়েছে, শুধু খেয়াল রাখতে হবে মাত্রাটা যেন না ছাড়ায়।
তাই ছাড়াবার উপক্রমই হল আমাদের ভাড়াটে সাজা-ডাক্তারদের আহম্মুকিতে।
কার্ডিয়োগ্ৰাম সান্যাল দুচোখ একেবারে কপালে তুললেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদ দেখিয়ে।
বলিহারি আপনাদের আক্কেল! হার্টের রুগি, আর তার সামনে ওই বিষগুলি শিঙাড়ার নাম করে ধরে দিয়েছেন?
সরিয়ে নিয়ে যান ওসব ওঁর সামনে থেকে! ওই অন্যায় লোভ আর দেখাবেন না ওঁকে। প্রেশার সোম হুকুম করলেন সরোষে।
ঘনাদার হাতটা তখন প্লেটের কাছে নামতে গিয়ে থমকে আছে।
