বিচুটির জ্বালাতেই যেন চিড়বিড়িয়ে উঠলাম তাই। সরেস মাথাওয়ালাদের ব্যাখ্যাটা তা হলে একটু শুনি না। কোথায় আমি হড়কেছি একটু দেখি।
তা দেখতে গেলে একটু ধারাপাত জানা যে দরকার।—শিবুর এখনও সেই খোঁচানো গলা—পৃথিবীর ব্যাস যা বললাম তাতে তার বিষুবরেখার বেড় হয় কত? তিনগুণ করলে দাঁড়ায় আটত্রিশ হাজার চুয়াল্লিশ দশমিক আট কিলোমিটার। যে-কোনও বৃত্তের বেড় তার ব্যাসের মোটামুটি তিন গুণ তা আশা করি জানিস?
হ্যাঁ, মোটামুটি তিন।
অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম মন্তব্যটা স্বয়ং ঘনাদার।
লজ্জায় যখন সত্যিই অধোবদন হবার অবস্থা তখন বিপদ-তারণ শ্রীমধুসূদনের মতোই তাঁর এক-একটি টিপ্পনিতে তখনকার মতো হাওয়াটা অন্তত ঘুরল।
কিন্তু শিবু কি সহজে ছাড়ে? এমন একটা বারট্রাই-এর মৌ-কা তো রোজ আসে না। ঘনাদার সঙ্গেই তাল দিয়ে ভারিক্কি চালে বললে, হ্যাঁ, মোটামুটি তিন মানে, তিনের পর এক, চার, এক নিয়ে কটা দশমিক আছে?
ক-টা নয়, অগুনতি!
জয় দর্পহারী মধুসূদন! ঘনাদার গলা দিয়েই তিনি ফোড়নটি কেটেছেন।
শিবু কি একটু ভড়কাল? বাইরে অন্তত নয়। ঘনাদাকেই যেন শিখিয়ে দেবার জন্য বললে, হ্যাঁ, দশমিক এক, চার, এক-এর পর পাঁচ, আট, দুই নিয়ে আরও অনেক সব সংখ্যা আছে।
দশমিক এক, চার, এক-এর পর পাঁচ, আট, দুই, নয়, ঘনাদা শুধু শিবুকেই যেন লক্ষ্য করে গড় গড় করে বলে গেলেন, পাঁচ, নয়, দুই নিয়ে অঙ্কের মিছিল আছে। বলা যায়। পাঁচ, নয়, দুই-এর পর ছয়, পাঁচ, তিন—
ঘনাদা একটু থেমে আমাদের মুখগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে বললেন, আরও শুনবে? ছয়, পাঁচ, তিন-এর পর পাঁচ, আট, নয়—তারপর সাত, নয়, তিন, তারপর দুই, তিন, আট, চার, ছয়—
আমাদের সকলের চোখই ছানাবড়া।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বুঝেছি, শিবুই তার মধ্যে প্রথম অস্থির হয়ে উঠে ঘনাদাকে থামালে, কিন্তু দশমিকের লেজুড় যত লম্বাই হোক, তা দিয়ে পৃথিবীর ব্যাসকে গুণ করলে বড়জোর আটত্রিশ হাজার কিলোমিটারের কিছু বেশি হলেও চল্লিশ হাজারে তো পৌঁছয় না। চল্লিশ হাজার কিলোমিটার শুনে তাই হাসছিলাম! সোজা অতদূর যেতে হলে তো এ পৃথিবীতে কুলাবে না।
তা কুলাবে না বটে! ঘনাদা এবার শিবুর কথায় যেন বাধ্য হয়ে সায় দিয়ে বললেন, আরও বেশি দূর হলে তো নয়ই। আমার সে ধাঁধিকা আবার কমপক্ষে আট কোটি কিলোমিটার।
কত? ভুল শুনেছি কি না জানবার জন্যই বিস্ফারিত চোখে জিজ্ঞাসা করতে হল। আমাদের গলাগুলো সব তখন প্রায় ধরে এসেছে।
না, ভুল শুনিনি।
ঘনাদা স্পষ্ট স্বরেই সংখ্যাটা আবার জানালেন, আট কোটি কিলোমিটার।
০৩. আট কোটি কিলোমিটার
দুবার ঘনাদার মুখে আট কোটি কিলোমিটার শোনবার পর আর কিছু বলতে হয়। তক্তপোশের এধার-ওধারে যে যেখানে পারি তখন চেপে বসে গেছি! ব্লাডপ্রেশার সোম, কার্ডিয়োগ্রাম সান্যাল আর ব্লাভটেস্ট গুপ্তও বাদ যায়নি।
আমাদের সকলেরই একরকম জায়গা হয়েছে, কিন্তু ঘনাদা? ঘনাদা বসবেন কোথায়? তাঁর কথা কি কেউ ভাবেনি?
যে ভাবার সে ঠিকই ভেবেছে। আট কোটি কিলোমিটার শোনবার পরই গৌরকে আর যে দেখতে পাওয়া যায়নি সে খেয়াল আমাদের বিশেষ ছিল না।
এইবার সগর্বে তাকে সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে দেখা গেছে। সঙ্গে তার বনোয়ারি, আর দুজনের সযত্নে ধরে বয়ে আনা দোতলার আড্ডাঘরের সেই মাকামারা আরামকেদারা, ঘনাদার যা মৌরসি।
এটা আবার বয়ে আনতে গেলে কেন? কেদারাটা গৌর বেশ জুত করে পাতবার সময় ঘনাদা মদু একটু আপত্তি জানিয়েছেন, কিন্তু বসতে ত্রুটি করেননি।
শিশির অবশ্য তার আগে থাকতেই এক পায়ে খাড়া। ঘনাদা আরামকেদারায় কাত হতে না-হতে হাতের টিনটা বাড়িয়ে দিয়েছে তাঁর দিকে আর সিগারেটটা তিনি মুখে তোলার আগেই লাইটার জ্বেলে ধরতে এক সেকেন্ড দেরি করেনি।
পুজোর ব্যবস্থাটা যোড়শোপচারেই তৈরি। দোতলা থেকে শুধু আরামকেদারাই আসেনি, নীচে রামভুজের কাছে হুকুম চলে গেছে। বনোয়ারি ওপর থেকে চেয়ার রেখে নামবা মাত্রই যেন ফুটন্ত কড়ায় মাংসের শিঙাড়া ছাড়তে শুরু করে। ভাজা শিঙাড়ায় যতক্ষণ প্লেট বোঝাই হবে ততক্ষণে বনোয়ারি দুপুর থেকে এনে রাখা তোতাপুলিগুলো ছোট ডিশে সাজিয়ে ফেলবে।
ওসব নৈবিদ্যি বাদে ধুপধুনো হিসেবে শিশিরের সিগারেট জ্বালানো তো আগে থেকেই শুরু হয়েছে।
এখন দেবতা শুধু প্রসন্ন হলেই হয়।
লক্ষণগুলো এখন শুভই মনে হচ্ছে।
ঘনাদা সিগারেটে খুদে খুদে টান থেকে একেবারে রামটানে পৌঁছে প্রায় মানোয়ারি জাহাজের মতো ধোঁয়া ছাড়লেন।
আমরা কিন্তু তখন নিশ্বাসটা ছাড়তেও একটু দ্বিধা করছি, ঘনাদার আট কোটি কিলোমিটারের পাড়িটা পাছে ভেস্তে না যায়।
আট কোটি কিলোমিটারের আশা দিয়ে ঘনাদা আজকের সন্ধ্যাটাও কি আমাদের পার করে দেবেন না?
এখন দরকার শুধু একটু লাগসই উসকানির।
কেমন করে সেটা দেওয়া যাবে?
আমরা যখন ভেবে সারা তখন ঘনাদাই তার মৌ-কা করে দেন।
প্রেশার কার্ডিয়োগ্রাম আর ব্লাডটেস্টের সম্বন্ধে হঠাৎ যেন ভাবিত হয়ে উঠে বলেন, এঁদের সব ডেকে এনে মিছিমিছি কষ্ট দিলে। ডাকবার আগে একবার যদি আমায় জানাতে।
এমনই একটা সুযোগর জন্যই ওত পেতে ছিলাম। পাওয়া মাত্র একেবারে ঝাঁপিয়ে পড়ে ধরে বলি, আজ্ঞে আপনাকে জানাব কী! আমাদের কি তখন মাথার ঠিক আছে! এক হপ্তা আপনি দোতলায় নামেননি?
তারপর রামভুজের মুখে শুনলাম, বুকের কী হয়েছে বলে এক বেলা মুরগির আর একবেলা নালির সুরুয়া খাচ্ছেন আর সব কিছুর সঙ্গে।
