আপনিই কার্ডিয়োগ্রামটা আগে করে ফেলুন ড. সান্যাল। সমস্বরে অনুরোধ জানিয়েছেন সোম আর গুপ্ত।
বেশ তাই। এ সম্মানে যেন বেশ বিব্রত হয়ে ড. সান্যাল তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের সঙ্গে তাঁর যন্ত্রপাতি খাটাবার তোড়জোড় শুরু করেছেন।
এ নাটক যখন চলছে তখন আমরা তো ােেম মেরে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু যার জন্য এত আয়োজন সেই ঘনাদা করছেন কী এতক্ষণ ধরে!
ওষুধের কাজও এতক্ষণে শুরু হয়ে যাওয়া উচিত। তার লক্ষণ কিছু দেখা যাচ্ছে? ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। ঘনাদা তখনও শেলফটার এ-তাক ও-তাক ঘাঁটাঘাঁটিতেই যেন তন্ময়। তাঁর ঘরে এত বড় একটা উপদ্রব যে চলেছে সে বিষয়ে যেন হুঁশই নেই।
আচ্ছা, হুশ হয় কি না দেখা যাক।
এখনও পর্যন্ত বড়ে-ঘোড়া-গজের চালই চলেছে। নৌকো, আর তারপর দাবার চালটা এবার পড়ুক।
নৌকার চালটা কার্ডিয়োগ্রামের সান্যালই দিলেন। মধুর কণ্ঠে জানালেন, আপনাকে এবার একটু শুয়ে পড়তে হবে, মি. দাস!
আমরা একদৃষ্টিতে তখন ঘনাদার দিকে তাকিয়ে। বুকের ধুকধুকুনিটা বেড়ে গেছে। কী করবেন এবার ঘনাদা? এইবার কি ফাটবেন?
না, সলতে ঠিক যেন ধরল না। চালটা বুঝি ভেস্তেই গেল। বিস্ফোরণের বদলে ঘনাদা এতক্ষণে ঘাড় ফিরিয়ে প্রথম যেন তাঁর ঘরের অনধিকার প্রবেশের ভিড়টা লক্ষ করলেন। তারপর অতি সরল ভাবেই জিজ্ঞাসা করলেন, শুয়ে পড়তে হবে?
এ সরল জিজ্ঞাসার মানে, নৌকোর চালটা ফসকেছে। তা ফসকাক, এরপর মোক্ষম দাবার চাল যা আছে, ববি ফিসার হয়েও তা সামলাতে পারবেন না।
সেই দাবার চালই এবার পড়ল। একেবারে যেন সেকেন্ডের কাঁটা মিলিয়ে শিবুর চেয়েও অস্থিরভাবে হাঁফাতে হাঁফাতে শিশিরের রঙ্গমঞ্চে প্রবেশ।
কার্ডিয়োগ্রামের সান্যাল ঘনাদার সরল জিজ্ঞাসার জবাবে যা বলতে যাচ্ছিলেন তা আর বলা হল না।
সে কী! আপনারা করছেন কী? শিশির এসেই একেবারে সকলের ওপর খাপ্পা। এখনও শুধু গজল্লা করছেন?
আর তোমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে করছ কী? শিশির আমাদেরও রেহাই দিলে না, হাঁ করে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছ?
আমরা, মানে আমরা যেন লজ্জিত হয়ে নিজেদের অসহায় অবস্থাটা বোঝাবার চেষ্টা করলাম, ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছি না। হঠাৎ এই এত ডাক্তারবদ্যি যন্ত্রপাতি কেন?
কেন? শিশির আমাদের বুদ্ধির জড়তা আর স্মৃতিশক্তির অসাড়তায় যেন স্তম্ভিত—এ ঘরে কেন এত ডাক্তার বদ্যি জিজ্ঞেস করছ তোমরা? কিছুই তোমরা জানো না? গোনা-গুনতি এই তিন জন ডাক্তারকে দেখেই বিরক্ত হচ্ছ? এখনও তো আর সবাই এসেই পৌঁছননি?
আরও কেউ কেউ আসবেন নাকি? শিবুর শঙ্কিত বেফাঁস প্রশ্ন।
বাঃ, আসবেন না? শিশির আমাদের অজ্ঞতাকে যেন তিরস্কার করলে, ই-এন-টি মানে ইয়ার-নোজ-থ্রোট, আই স্পেশ্যালিস্ট, ডার্মাটোলজিস্ট, কিরোপডিস্ট, এক্স-রে ফটোগ্রাফার, মায় সাইকোঅ্যানালিস্ট পর্যন্ত আসছেন। এঁরা কেন আসছেন এখনও জিজ্ঞাসা করতে চাও? বলতে চাও যে অতবড় গুরুতর ব্যাপারটা ভুলেই গেছ? কী হয়েছিল মনেই পড়ছে না?
না, না, পড়ছে পড়ছে। আমরা যেন হঠাৎ স্মরণশক্তি ফিরে পেয়ে অস্থির হয়ে উঠলাম, আমাদের খুব দেরি হয়ে গেছে কিন্তু। সেই আগের হপ্তা থেকে ঘনাদার শরীর খারাপ, আর আমরা চুপ করে বসে আছি।
চুপ করে বসে আছি! শিশির এবার আমাদের ওপর চটল। চুপ করে থাকলে এঁরা সব এলেন কোথা থেকে! সেই শনিবার থেকেই এই ধান্ধায় লেগে আছি। ঘনাদার একেবারে থরো চেকিং না করিয়ে ছাড়ব না।
যাঁর উদ্দেশে এত বড় নাটক তিনি এই মোক্ষম চালে কুপোকাত না হয়ে যাবেন। কোথায়?
তাঁর দিকে ফিরে অত্যন্ত যেন কুণ্ঠিত হয়ে শিশির এবার মিনতি জানাল, আপনার ওপর একটু অত্যাচার করব, ঘনাদা।
বেশি কষ্ট অবশ্য দেব না। আশ্বাসও দিলে তারপর, এই ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যেই এঁদের যা করবার এঁরা সেরে ফেলবেন।
বেশি কিছু তো নয়। শিশির ভরসা দেবার কারণগুলো ব্যক্ত করলে, আপনার প্রেশার উঠছে না নামছে হাত বেঁধে একটু দেখা, হৃৎপিণ্ডটায় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে কি না ইলেকট্রো কার্ডিয়োগ্রামে তার একটা ছাপ নেওয়া, শরীরের ভেতরের কলকবজা হাড়গোড়ের গলদ ধরবার জন্যে এক্স-রে ফটো তোলা, আর চিনি কোলেস্টেরল ইউরিয়া ঠিক মাপ মতো আছে কিনা পরীক্ষা করবার জন্য শিরা থেকে একটু রক্ত টেনে নেওয়া। তা-ও বড়জোর পো খানেক।
পো খানেক? আমরা রিহার্সেল মাফিক যথারীতি শিউরে উঠলাম—পো খানেক রক্ত নেবে?
হ্যাঁ, নেবে তো হয়েছে কী? শিশির আমাদের ধমকালে, ঘনাদা কি দুধের বাচ্চা যে পো খানেক রক্ত দিয়ে একেবারে দেউলে হয়ে যাবেন? এই রক্তটুকু থেকে কাজ কী হবে ভাবো দেখি? সব কিছু পুরো পরীক্ষার পর ডাক্তারদের আর আন্দাজে ঢিল ছুড়তে হবে না। রোগের জড়টি নির্ভুলভাবে ধরে উপড়ে ফেলে দেবেন।
এঁরা তা হলে কাজ শুরু করুন, কী বলেন? শেষ অনুমতি-ভিক্ষাটা ঘনাদার কাছে।
আমরাও তখন উৎসুকভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে। মেগাটন গোছের কিছু একটা ফাটবে আমাদের আশা।
ঘনাদা তখনও অবশ্য শেলফের কাছেই দাঁড়িয়ে। হাতে ছোট একটা কাগজের পুরিয়া বলেই মনে হল। এত শেলফ ঘাঁটাঘাঁটি করে এইটিই বার করেছেন নাকি!
তা যাই করুন, ওই কাগজের পুরিয়া এ সংকট থেকে তো তরাবে না! যে বেড়াজালে ঘেরা হয়েছে, তা কেটে বেরুতে, হয় হার মেনে নাকে খত দিতে হয়, না হয় বোমার মতো ফাটতেই হবে।
আর তা হলেই যে জ্বালায় এই কদিন উনি আমাদের জ্বালাচ্ছেন সব তার শোধবোেধ।
