[ঘনাদার কথা শেষ করে যেন এক হাতে টান দেবেন আর জটাজুট আর দাড়ি গোঁফের চুল শূন্যে উঠে ছাদে চলে যাবে। সবাই হাত তালি দিয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বনোয়ারিকে ট্রে নিয়ে ঢুকতে দেখা যাবে। যবনিকাও আবহসঙ্গীতের সঙ্গে এবার নেমে আসবে।]
মঙ্গলগ্রহে ঘনাদা (উপন্যাস)
০১. বাহাত্তর নম্বরের একেবারে চক্ষুস্থির
বাহাত্তর নম্বরের একেবারে চক্ষুস্থির।
হ্যাঁ, চক্ষুস্থির ছাড়া আর কী বলে অবস্থাটা বোঝাব?
বাহাত্তর নম্বর মানে তো তিনি, ওই নম্বরের বনমালি নস্কর লেনের একটি বেশ বয়স্ক বাড়ির তেতলার টঙের ঘরে যিনি বেশ কিছুকাল বিরাজ করছেন।
আসল তিনি, আর ফাউ হিসেবে আমরা কজন।
তা সেই তেতলার টঙের ঘরে তিনি, মানে একমেবাদ্বিতীয় ঘনাদার সঙ্গে আমাদের, মানে শিবু শিশির গৌর ও আমার চক্ষুস্থির তো তখন বটেই।
চক্ষুস্থির না বলে চক্ষুচড়কগাছও বলা যায় অবশ্য, আর আমাদের তালিকাটা একটু সংশোধন করে শিশিরকে বাদ রাখা যায়। শিশির তখন সত্যি অনুপস্থিত।
শিশির থাকুক বা না থাকুক আমাদের চোখের অবস্থায় তাতে হেরফের কিছু অবশ্য হবার নয়। দুদিন ধরে রীতিমত রিহার্সালে নিজেদের পাকিয়ে, জোড়া জোড়া চোখ একেবারে ছানাবড়া করে আমরা তখন যে যার পার্ট সিনেরিও মাফিক করে যাচ্ছি।
সত্যি কথা বলতে গেলে পার্ট যা করতে হচ্ছে তা এমন কিছু শক্ত নয়। ব্যাপার যা তখন ঘটেছে, তার হাড়-হদ্দ জানা থাকলেও চোখগুলো বুঝি আপনা থেকেই কপালে উঠে যায়।
চিত্রনাট্যটা গোড়া থেকে শোনালেই ব্যাপারটা বোঝার অসুবিধা থাকবে না।
প্রথম লং শট। বাহাত্তর নম্বরের বনমালি নস্কর লেনের তেতলার টঙের ঘরে যাবার ন্যাড়া সিঁড়ি।
ব্যস্তসমস্ত হয়ে শিবু সেখান দিয়ে ওপরে উঠেছে। শিবু তেতলার ছাদ পর্যন্ত ওঠার পরই কাট। তারপর ছাদ থেকে ক্যামেরা শিবুকেই ধরে প্যান করে টঙের ঘরের ভেতর। সেখানে পাতা তক্তপোশের ওপর গৌর ও আমি বসে অবাক হয়ে শিবুর দিকে তাকাচ্ছি আর ঘনাদা ওই তক্তপোশেরই অন্য প্রান্তে আমাদের দিকে পিছন ফিরে বসে অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে একটি ছোট আয়নায় নিজেকে নিরীক্ষণ করছেন।
পরের শট-এ অ্যাকশন, মানে যাকে বলে খেল শুরু।
ব্যাপার কী! শিবুর বিমূঢ় জিজ্ঞাসা, বাহাত্তর নম্বরটা হাসপাতাল হয়ে উঠল নাকি?
হাসপাতাল? সে আবার কী? গৌর ও আমি উঠে কি দাঁড়িয়ে পড়েছি তখন!
হাসপাতাল না হলে এত ডাক্তার বদ্যি, যন্তরপাতির আমদানি কেন?
আড়চোখে ঘনাদার দিকে তখন একবার তাকিয়ে নেওয়া হয়ে গেছে।
না, শিবুর ভগ্নদূতের পার্টটা একেবারে বিফলে যায়নি, ঘনাদার নিজের মুখ নিরীক্ষণ করায় একটু ছেদ পড়েছে। মুখটা না হলেও কানটা এদিকে ফেরানো।
তারস্বরে এবার তাই বিমূঢ় বিস্ময় প্রকাশ করতে হয়েছে। ডাক্তার-বদ্যি, যন্ত্রপাতি আসছে বাহাত্তর নম্বরে? কী বলছিস, কী! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোর?
মাথা খারাপ হওয়ার অপরাধ কী? শিবুর ক্ষুব্ধ স্বর—চেয়েই দেখোনা একবার।
সেই চেয়ে দেখার পর চক্ষুস্থির না হয়ে পারে? সিঁড়ি দিয়ে যেন মিছিল করে যাঁরা উঠে আসছেন তাঁদের পরিচয় সাজ-সরঞ্জামেই অনেকখানি মালুম।
এটা কি মি. দাসের ঘর? প্রথম জনের জিজ্ঞাসা, তাঁর হাতের ব্যাগটার মর্ম যদি প্রথমে না-ও বোঝা যায়, গলায় ঝোলানো স্টেথিস্কোপটা ভুল করবার নয়।
আজ্ঞে হ্যাঁ। বলে তাঁর প্রশ্নের উত্তর দিয়ে তাই নিজেদের বিস্মিত কৌতূহলটা
প্রকাশ করেছি, কিন্তু আপনি?
আমি ডাক্তার সোম। গম্ভীরভাবে যেন আমাদের বকুনি দিয়ে বলছেন ভদ্রলোক, মি. দাসের প্রেশার নিতে এসেছি।
কী নিতে এসেছেন? প্রশ্নটা সবিস্ময়ে করে ফেলার পর আমাদের হাঁকরা মুখগুলো যেন আর বোজাবার অবসর মেলেনি।
প্রেশার যিনি নিতে এসেছেন তাঁর পেছনে ব্যাগ হাতে আর-এক মূর্তি আর এ দুজনের পেছনে বাহকের মাথায় ছোটখাটো একটা যন্ত্রাগারের নমুনা চাপিয়ে অন্য একজন।
আমাদের অনুচ্চারিত প্রশ্নগুলো যেন অনুমান করে নিজেরাই তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিয়েছেন।
প্রেশার নেবার জন্য যিনি আগে ঢুকেছেন তাঁর পরের জন আমাদের যেন আশ্বস্ত করবার সুরে বলেছেন, ভাবনার কিছু নেই। আমি শুধু একটু রক্ত নেব।
আঁ! রক্ত নেবেন? ঘনাদার?
আমাদের সম্মিলিত আর্তনাদের ওপরই তৃতীয় জন যেন বরাভয় দেবার মতো করে তাঁর পরিচয় দিয়েছেন, আমার কার্ডিয়াগ্রাম।
ভ্যাবাচাকা ও ভয়ে-কোঁকড়ানো চেহারা নিয়ে ওরই মধ্যে ঘনাদার দিকে একবার চেয়ে দেখে নিয়েছি।
হ্যাঁ, ওষুধ ধরেছে বলেই মনে হচ্ছে। ঘনাদা অন্তত আর্শিটা নিয়ে দাঁড়িয়ে উঠে তাঁর ঘরের দেওয়ালের কেরোসিন কাঠের শেলফে সেটা রেখে যেভাবে কী খোঁজাখুঁজি করবার ভান করছেন সেটা দিশাহারা অবস্থাটা ঢাকবার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু বোধহয় নয়।
চিকিৎসা-জগতের তিন প্রতিনিধির তখন ঘরের ভেতরে ঢুকে কোনও অস্বস্তি কি আড়ষ্টতার চিহ্নমাত্র নেই, যেন নিত্যই এখানে আসেন-যান এমনই স্বচ্ছন্দে নিজেদের মধ্যে তাঁরা একটা আপস করে ফেলেছেন ইতিমধ্যেই।
আপনি রক্তটা আগে নিন ড. গুপ্ত! প্রেশার মাপার সোম সৌজন্য দেখিয়েছেন রক্ত নেবার গুপ্তকে।
না, না, তা কি হয়! গুপ্ত পাল্টা বিনয় দেখিয়েছন, আপনার প্রেশার আগে। আপ উঠিয়ে ভদ্রতা মিনিট দশেক ধরে চলেছে তারপর।
বিনয়ের পাল্লা দুজনের কেউ হারতে না চেয়ে প্রেশারের সোম আর রক্তের গুপ্ত শেষ পর্যন্ত হৃদয়কেই প্রাধান্য দেওয়া উচিত বলে সাব্যস্ত করেছেন।
