কিন্তু কই? নরম গরম কোনও লক্ষণই যে দেখা যাচ্ছে না।
সেই যে বলে অল্প শোকে কাতর আর অধিক শোকে পাথর—তাই হয়ে গেলেন নাকি! আমাদের আর ডাক্তারদের নিয়ে সপ্তরথীর বেষ্টনে একেবারে ভ্যাবাচাকা ভোম!
একটু উসকে দিতে হল তাই।
আর দেরি করবেন না, ঘনাদা! ডাক্তারবাবুরা অনেকক্ষণ থেকে অপেক্ষা করছেন। রোগটা যখন আপনার অমন বেয়াড়া, তখন হদিস পেতে এসব পরীক্ষা তো করালে নয়।
পরীক্ষা করাতেই তোমরা বলছ? ঘনাদা যেন নেহাত সরলভাবে আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন।
উত্তর দেব কী, বুকের ধুকপুকুনি তখন বেড়ে গিয়ে আমরা চোখে প্রায় অন্ধকার দেখছি। এত মাথা খাটিয়ে সাজানো এত কষ্টের আয়োজন এমনই করে পণ্ড হবে নাকি? ঘনাদা অকুতোভয়ে সব পরীক্ষায় রাজি হয়ে আমাদের উলটো ফ্যাসাদে ফেলবেন?
করো কার্ডিয়োগ্রাম, নাও রক্ত বলে ঘনাদা যদি এখন এক কথায় তাঁর তক্তপোশে গিয়ে শুয়ে পড়েন তা হলে কেলেঙ্কারির যে কিছু আর বাকি থাকবে না। ডাক্তার সাজিয়ে যাদের আনা হয়েছে তারা যে সব জাল। হাতের শিরা থেকে রক্ত নিতে গেলে নিজেরাই ভির্মি যাবে। রক্ত নেওয়া তো দূরের কথা, প্রেশার মাপবার যন্ত্রের টিউবটাও যে তারা বাঁধতে জানে না।
আগের শনিবার থেকে অসুখের ছুতো করে এ ক-দিন ঘনাদা যা জ্বালাচ্ছেন তারই শোধ হিসেবে ঘনাদাকে একটু শিক্ষা দিতে সবাই মিলে এই ফন্দিটি এঁটেছিলাম।
যেমন অসুখ বলে ঘনাদা আমাদের সব উৎসাহে এ কদিন জল ঢেলেছেন, তেমনই তাঁর চুড়ান্ত চিকিৎসার ব্যবস্থাই করেছি। নিজেদের নয়, বেপাড়ার থিয়েটার ক্লাব থেকে ডাক্তার সাজবার লোক এনেছি ভাড়া করে, তাদের দু-চারটে বোল-চালই শেখানো হয়েছে,ঘনাদাকে ভড়কে দেবার জন্য।
কিন্তু এখন সব কিছুই যে যায় ভণ্ডুল হয়ে। শুধু ভণ্ডুল নয়, আমাদের অস্ত্রই বুমেরাং হয়ে আমাদের ওপর চড়াও হবার উপক্রম! তা হলে উপায়?
উপায় নেই। তবু উলটো গাওয়া শুরু করে একবার শেষ চেষ্টা করে দেখি।
পরীক্ষার ঝামেলা অবশ্য বড় কম নয়। আমি যেন খুঁত না ধরে পারি না। ডাক্তারদের তো মায়া-দয়া নেই—পরীক্ষার নামে কাটা-ছেঁড়া বাঁধা-ছাঁদা ফুটো করে একেবারে জান কয়লা করে দেবে।
ঠিক বলেছ। শিবুর পোঁ ধরতে দেরি হল না—রোগের চেয়ে চিকিচ্ছের জ্বালা বেশি।
আমি হলে তো এখুনি বিদেয় করে দিতাম। গৌর শিশিরের ওপরই যেন গরম হল—শিশিরের যেমন বুদ্ধি!
না, না, শিশিরের দোষ কী? আমাদের সকলকে থ করে শিশিরের ওকালতি করতে এগিয়ে এলেন স্বয়ং ঘনাদা।
বুমেরাং-এর মার এড়াবার আশা তখন ছেড়েই দিয়েছি। বিশেষ করে ঘনাদা শিশিরের সপক্ষে যা যুক্তি দিলেন তাতে। ও তো অন্যায় করেনি, ঘনাদা শিশিরকে পূর্ণ সমর্থন জানালেন, রোগটা যেখানে বাঁকা আর বেয়াড়া সেখানে তার হদিস পেতে পুরো পরীক্ষাই তো করা দরকার।
এরপর আর কী আমাদের করবার থাকতে পারে। হাল ছেড়ে দিয়ে শেষে বেইজ্জতির জন্য যখন তৈরি হচ্ছি, তখন ঘাটের কাছে এসে ড়ুবতে ড়ুবতে নৌকো আবার ভাসল।
ভাসালেন ঘনাদা নিজেই। শিশিরকে আপাতত ঠেকো দিয়ে বাঁচিয়ে তিনি যা বললেন তাতে অকূলে কূল পেয়ে আমাদের ধড়ে প্রাণ ফিরে এল।
ধড়ে প্রাণটা ফিরলেও মাথায় কিন্তু তখন চরকি পাক লেগেছে। লেগেছে ঘনাদার কথাতেই।
পরীক্ষার জন্য এঁদের সব ডাকিয়ে ভালই করেছে শিশির। ডাক্তার সাজা তিন মূর্তির দিকে যেন অভয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন ঘনাদা, কিন্তু এই পুরিয়াটা পেয়ে গেলাম কিনা!
পুরিয়া? তার মানে? ও পুরিয়াটা আবার কীসের? তা পেয়ে হলটা কী?
গলার আওয়াজে নয়, আমাদের, মায় সাজা-ডাক্তারদের হতভম্ব মুখের দৃষ্টিতেই কাতর প্রশ্নগুলো ফুটে উঠল।
সে দৃষ্টি দেখেই বুঝি সদয় হলেন ঘনাদা। একটু বিশদ হয়ে জানালেন, পুরিয়াটা যখন পেয়ে গেছি তখন পরীক্ষা-টরিক্ষার আর দরকার নেই।
ওই পুরিয়া পাওয়ার জন্যই আর দরকার নেই? বিমূঢ় বিস্ময়টা নবাগতদের মধ্যে ব্লাডপ্রেশারের গলাতেই সরবে প্রকাশ পেল।
ওই পুরিয়াই তা হলে মুশকিল আসান? কার্ডিয়োগ্রামের বিস্ময়ে যেন একটু সন্দেহ মেশানো।
পুরিয়াটা কীসের? রক্ত পরীক্ষকের প্রশ্নে স্পষ্ট যেন অবিশ্বাসের সুর। আমরা তখন আবার প্রমাদ গুনতে শুরু করেছি। ভাগ্যের জোরে অনুকূল হাওয়া সবে যখন বইতে আরম্ভ করেছে, তখন এই ডেকে আনা আহম্মকগুলো দেয় বুঝি সব বানচাল করে।
শিশির তাড়াতাড়ি তাল সামলাতে তাই বলেছে, পুরিয়ায় নিশ্চয়ই আছে আসল মৃগনাভি। একেবারে তিব্বত থেকে আনা।
না, না, মৃগনাভি কেন হবে! শিবু শিশিরের ওপর টেক্কা দিয়েছে, পুরিয়ায় আছে সূচিকাভরণ, আসল শঙ্খচূড়ের বিষ ঘেঁকে তৈরি। ছুঁচের ডগায় ঠেকালেই মরা-মানুষ চাঙ্গা—
উঁহু। সূচিকাভরণ নয়। আমি গুরুগম্ভীর গলায় বলেছি, পুরিয়ায় আছে জিন সেঙ। নেপালের নিরেস রিন-সেন নয়, সাইবেরিয়ার টাইগা থেকে ভোলা আসল মাল। একরত্তি পেটে গেলে কাটা মুণ্ডু জোড়া লাগে! তাই না, ঘনাদা!
নাগাড়ে মাঠফাটানো খরার পর আকাশে কোদালে কুড়ুলে মেঘের দিকে চাষি যেমন করে চায় তেমনই করে ঘনাদার দিকে চেয়েছি এবার।
বিফলও হয়নি সে চাওয়া।
না। ঠিক যেমনটি চেয়েছিলাম তেমনই অনুকম্পাভরে আমাদের সকলের ওপর চোখ বুলিয়ে বলেছেন ঘনাদা, মৃগনাভি, সূচিকাভরণ, জিন-সেঙ, কিছুই নয়।
তবে? আমরা যেন বিমূঢ় বিহ্বল।
পুরিয়াতে আছে, ঘনাদা একেবারে মাপা এক সেকেন্ডের নাটকীয় ছেদ দিয়ে বলেছেন, শুধু একটু ছাই!
০২. এক পুরিয়া ছাই
ছাই!
