মালাঞ্জা (এবার যেন হতভম্ব)—তারও খোঁজ পেয়েছিস শুধু আমার নাম থেকেই।
ঘনাদা (পেছনের দিকে সরে গিয়ে সবিস্ময়ে)—আজ্ঞে হ্যাঁ, তবে লেভিনের স্বপ্ন আর সাধনা হল পৃথিবীকে বড় করার। তার জন্য এই কঙ্গো বা জাইরে না এসে যাবেন কোথায়?
মালাঞ্জা (গর্জন করে)—শোন, যেমন করেই হোক, এখানে যে পৌঁছেছিস এই তোর ভাগ্য। এবার ড. লেভিনের খোঁজ ছেড়ে সুবোধ ছেলের মতো তোকে ঘরে ফিরে যেতে হবে।
ঘনাদা (সবিনয়ে)–কিন্তু আমার ঘর যে বড় দূর। এই গোটা আফ্রিকা আর আরব সাগর পার হবার পরও যেতে হবে ভারতবর্ষের একেবারে পূর্বপ্রান্তে বাঙালিদের দেশে। তার চেয়ে আপনিই ঘরে ফিরে যান ওই কী বলে—বেলজিয়াম না জার্মানির কোনও লুকনো নাৎসি আস্তানায়। যেখানেই যান ইতুরির জঙ্গলের ধারে কাছে অন্তত থাকবেন না।
মালাঞ্জা (রাগে আগুন হয়ে)–ইতুরি! কী জানিস তুই ইতুরির?
ঘনাদা (একটু যেন বাহাদুরির সঙ্গে)—এইটুকু জানি যে পৃথিবী বড় করার সুবিধে দেখিয়ে সেইখানেই ড, লেভিনকে আপনি লুকিয়ে রেখেছেন। সেখান থেকেই তাকে এবার উদ্ধার করব।
মালাঞ্জা (একেবারে ক্ষিপ্ত হয়ে)–কী! তুই তাকে উদ্ধার করবি?
মালাঞ্জা গোরিলার মতো ঘনাদার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। ঘনাদা কিন্তু ঠিক সময় মতো সরে যাওয়ায় মালাঞ্জা সজোরে দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে নীচে বসে পড়বে। ঘনাদা তাকে তুলতে গেলে সে আবার হুংকার ছাড়বে। ঘনাদা তাই শুনে অন্যদিকের দেওয়ালের কাছে সরে যাবে। মালাঞ্জা সেদিকেই আবার ঝাঁপিয়ে পড়বার আগেই ঘনাদা সরে যাওয়ায় মালাঞ্জা আবার দেয়ালে মাথা ঠুকে ধাক্কা খেয়ে নীচে বসে পড়বে।
এই রকম বার তিন-চার দেওয়ালে প্রচণ্ড ঠোকা খেয়ে মালাঞ্জা একেবারে লুটিয়ে পড়বে নীচের মেঝেয়। নীচের মেঝের দিকটা গোড়া থেকেই অন্ধকারে থাকবে। মালাঞ্জাকে তাই ঠিক আর দেখা যাবে না। সে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘনাদা এক হাতে যেন তার বিশাল দেহটা তুলে দুবার শূন্যে ঘোরাবেন। মালাঞ্জার এ দেহটা আসলে খড়ের। তারপর আবার সে দেহটা মাটিতে আছড়ে আবার আসল মালাঞ্জাকে তুলে একধারে বসাবেন। নীচে মেঝের দিকটা অন্ধকারে রাখার দরুন মালাঞ্জা আর খড়ের ডামি বদলাবদলির সুযোগ হবে। ডামি ঘোরাবার ও আছড়াবার সময় মালাঞ্জার গলায় আর্তনাদ বার করা হবে।
ঘনাদা (সবিনয়ে)—আমি বড়ই দুঃখিত, হের মালাঞ্জা। এই বাংলো বাড়ির দেওয়ালগুলো গদি আঁটা থাকা উচিত ছিল।
মালাঞ্জা (কাতরাতে কারাতে)—আমি দুঃখিত মি. দাস যে, আপনাকে একটু বাজিয়ে দেখতে চেয়েছিলাম। চলুন এবার ইতুরির জঙ্গলে ড. লেভিনের কাছেই আপনাকে নিয়ে যাবার সম্মানটা আমার হোক।
[আবার সেই চোখ ধাঁধানো উজ্জ্বল বিদ্যুৎচমক। তারপর অন্ধকারে যবনিকা নেমে আবার কয়েক সেকেন্ড বাদে উঠে যাবে। খুব জোরালো আবহসঙ্গীত থাকবে।
যবনিকাটা ওঠবার পর আলোকিত মঞ্চে আগের মতো ঘনাদা ইত্যাদি সকলকে নিজের নিজের জায়গায় বসে থাকতে দেখা যাবে।]
ঘনাদা (জটাধারীর দিকে চেয়ে)—মালাঞ্জা তারপর ইতুরি জঙ্গলে নিয়ে গিয়েছিল সত্যিই, তবে ড. লেভিনের কাছে পৌঁছে দেবার ছুতোয় ওখানকার বামনদের মরণফাঁদে ফেলে মারবার ফন্দিই করেছিল ভাল করে। সে ফন্দি ভেস্তে দিয়ে আমি নিজেই ড. লেভিনকে তাঁর গোপন আস্তানায় খুঁজে বার করে তাঁর সর্বনাশা সাধনা ছাড়িয়ে নিয়ে এসেছিলাম।
গৌর (একটা বাঁকাসুরে)—আপনি গিয়ে ডাকলেন আর ড. লেভিন তাঁর গোপন আস্তানা থেকে তাঁর জীবনের পরম সাধনা একডাকে ছেড়ে দিয়ে সুড়সুড় করে আপনার সঙ্গে চলে এলেন?
ঘনাদা (যেন পরম ঔদার্যে সব ধৃষ্টতা ক্ষমা করে)—তাই এলেন! প্রথমে তাঁর স্বপ্ন আর সাধনার কথা জেনেই যে তাঁর গোপন গবেষণার আস্তানার হদিস পেয়েছি তা জানাতে একটু অবাকই হলেন।
শিশির (বাধা দিয়ে)—সত্যি! সে হদিসটা কী করে পেলেন। শিবু—যোগবলে নিশ্চয়!
ঘনাদা (ক্ষমার অবতার হয়ে)–না, যোগবলে নয়। দুই-এ দুই-এ চারের হিসেবে। সেই কথাটাই ড. লেভিনকে বুঝিয়ে দিয়ে বলেছিলাম—আপনি পৃথিবী বড় করতে চান। কিন্তু পৃথিবী তো বেলুনের মতো ফুলিয়ে বড় করা যায় না। তখন বুঝলাম যে আপনার পৃথিবী বড় করা মানে মানুষকেই ছোট থেকে আরও ছোট করবার একমাত্র স্বপ্ন। যেখানে বামন মানুষ, বামন ছাগল-মোষ, বামন হাতি পাওয়া যায়, সেইখানেই আকার কমবার রহস্যের হদিস পাবেন ভেবে আপনি ইতুরি এসেছেন। কিন্তু শুনুন ড. লেভিন, আপনার গবেষণা, আপনার স্বপ্ন মানুষের পক্ষে সর্বনাশা। মানুষ ছোট হতে হতে পিঁপড়ের মতো হলে পৃথিবী তার পক্ষে বিরাট হবে সত্যি! মানুষের মনটা কিন্তু আরও বড়, আরও উদার না হলে আপনার সব স্বপ্নসাধনা ব্যর্থ হতে বাধ্য।
(এরপর ঘনাদা দাঁড়িয়ে ওঠার চেষ্টা করতেই শিবু, শিশির সবাই হাঁ-হাঁ করে উঠবে।]
শিবু, শিশির ইত্যাদি (সমস্বরে)—আরে, যাচ্ছেন কোথায় ঘনাদা। বনোয়ারি যে ফিশরোল ভাজিয়ে এল বলে।
ঘনাদা (তবু দাঁড়িয়ে উঠে জটাধারীর কাছে যেতে যেতে) হ্যাঁ, সেই জন্যই রোল আর ফ্রাই-এর উপযুক্ত অভ্যর্থনার জন্য যোগীবরের জঙ্গলের বাধাটা একটু সাফ করে দিচ্ছি। (ঘনাদা একটানে জটাধারীর মাথার জটা আর মুখের নকল দাড়ি খুলে ফেলে দিয়ে) অপরাধ নেবেন না, যোগীবর, আপনার জটাজুট আর গোঁফ দাড়ি আমার ফিশরোল সরানো সিলিং থেকে ঝোলানো কলো সুতোয় বেঁধেই পাচার করে দিচ্ছি।
