ঘনাদা—প্রথমে ম্যাজিক দেখিয়েই মালাঞ্জা আমায় মোহিত করে। একটা মানুষের খোঁজে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে তখন এমবুজি মাঈ শহরে এসেছি। (জটাজুটধারীর দিকে চেয়ে) এমবুজি মাঈ-এর কথা আপনি তো সবই জানেন।
জটাজুটধারী (বিব্রত)—আমি—আমি—আমি–
ঘনাদা (যেন ভক্তিভরে)—-আপনার তো সশরীরে যাবার দরকার নেই। যোগবলেই তো সব জানতে পারেন। ও, তার সময় পাননি বুঝি। আচ্ছা, আমিই বলে দিচ্ছি। আগে যার নাম ছিল কঙ্গো আর এখন হয়েছে জানতি পারোনার জয়ের জাইর রাজ্যের একটা শহর এম্বুজি মাঈ, এটা আফ্রিকার পশ্চিম দিকের জাইর রাজ্যের এমন এক শহর যার চারধারের মাটি আঁচড়ালেও হিরে পাওয়া যায়। হিরের খোঁজে নয়, দুনিয়ার এমন একজনের খোঁজে সেখানে এসেছি যার দাম একটা হিরের খনির চেয়ে, আমার কাছে কেন, সমস্ত পথিবীর কাছে বেশি। তিনি আর কেউ নন, পৃথিবীর অসামান্য এক জৈব-রসায়নের বিজ্ঞানী। যিনি হঠাৎ তাঁর আইডাহোর ল্যাবরেটরি থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন আর দুনিয়ার সব দেশের সেরা সব গোয়েন্দা বিভাগ হন্যে হয়ে খুঁজেও তাঁর কোনও সন্ধান পায়নি। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার এই যে ড. লেভিন নিরুদ্দেশ হয়েছেন স্বেচ্ছায়। তাঁর ল্যাবরেটরিতে তাঁর নিজের হাতে লেখা আর সই করা একটি চিঠিতে তিনি জানিয়ে গেছেন যে তিনি স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়ে যাচ্ছেন। সুতরাং কেউ যেন তাঁর খোঁজ করবার চেষ্টা না করে।
কিন্তু ড. লেভিনের মতো বৈজ্ঞানিকের বেলায় দুনিয়ার মানুষ কি ওই চিঠি পড়ে হাত গুটিয়ে থাকতে পারে! ফল কিন্তু কিছু হয়নি। ড. লেভিন সাধনা সফল করতে স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হয়ে গেছেন লিখে গেছেন। কী তাঁর সেই সাধনা অনেক চেষ্টায় সেটা আবিষ্কার করে অবাক হয়েছি। ড. লেভিনের সাধনা আজগুবি ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। তিনি নাকি পৃথিবীর সব সমস্যার সমাধান করতে পৃথিবীকে আরও বড় করতে চান। পৃথিবী বড় করবেন মানে কী? পৃথিবী কি বেলুন যে ফুঁ দিয়ে হাওয়া পাম্প করে ফাঁপিয়ে তুলবেন! ব্যাপারটা আজগুবি। তবু লেভিন তাঁর নিরুদ্দেশ যাত্রার একমাত্র অনুচর হিসেবে যাকে সঙ্গে নিয়েছেন তার নাম থেকেই তাঁকে কোথায় খোঁজা উচিত তার একটু হদিস পেয়েছি। সেই হদিস থেকে সোজা জাইর-এর এমবুজি মাঈতে গিয়ে উঠলাম।
সেখানে সাংকুর নদীর ধারে নির্জন একটা ছোট্ট বাংলো ভাড়া করলাম থাকবার জন্য।
নির্জন বাসায় থাকলেও হিরে কেনার হাঁক-ডাক করে শহরে তখন খুবই শোরগোল তুলেছি ইচ্ছে করে। ফলও ফলল ক-দিনের মধ্যে। কদিন বাদেই আমার সঙ্গে যে নিজে থাকতে ভিজিটিং কার্ড পাঠিয়ে দেখা করতে এল সে স্বয়ং মালাজা এমপালে। কিন্তু আইডাহোতে ড. লেভিনের অনুচর হিসেবে তার যা চেহারা ছিল তা থেকে এখানে একটু আলাদা। সেখানকার ফর্সা শ্বেতাঙ্গ চেহারাটা এখানে হয়েছে ঝামা ইটের রঙের মতো।
মালাঞ্জা ঘরে ঢুকে হাতের কড়া ছিঁড়ে দেবার মতো করমর্দন করে বললে, খুব অবাক হয়েছেন, না, মঁসিয়ে দাস!
যেন উত্তর দিতে না পেরে তার দিকে বোকার মতো চেয়ে রইলাম।
এই কথার ওপরে মঞ্চটা হঠাৎ একটা চোখ ধাঁধানো বিদ্যুৎ চমকের পর একেবারে অন্ধকার হয়ে যাবে কয়েক সেকেন্ডের জন্য। সেই সঙ্গে বেশ জোরে উপযুক্ত কিছু বাজনাও বাজবে। তারপর সামনের দিকটা অন্ধকার হয়ে পেছনের পর্দাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠে দুটি ছায়ামূর্তি দেখা যাবে সিলুটের মতো।
একটি ঘনাদার, আর-একটি তার চেয়ে লম্বায় চওড়ায় প্রকাণ্ড মালাঞ্জা এপালের। ঘনাদার ইউরোপিয়ান পোশাক আর মালাঞ্জার ঢোলা আলখাল্লা। কোমরে চাদর বাঁধা। মাথায় বাবরি চুলে ফেট্টি বাঁধা।
এ দুটি ছায়ামূর্তি অবশ্য আলাদা দুজন অভিনেতার। এরা মূক অভিনয় করবে। গলা দেবে মঞ্চে দেখা ঘনাদা ও জটাজুটধারী। বিদ্যুৎ চমকের পর মঞ্চ অন্ধকার হবার সময় তারা দুজন উইংস দিয়ে পেছনে চলে গিয়ে দুজনে ঝোলানো পর্দার দুধারে দাঁড়িয়ে গলা দেবে।]
মালাঞ্জা (আবার)–কী মঁসিয়ে দাস, বেশ একটু অবাক হয়েছেন, না!
ঘনাদা (আমতা আমতা করে)—তা মানে—তা একটু হয়েছি।
মালাঞ্জা (ঘনাদার কাছে এসে তার ঘাড়ে একটা হাত রেখে চাপ দিতে দিতে)–কীসে অবাক হয়েছেন? এত তাড়াতাড়ি হাজির হয়েছি বলে?
ঘনাদা (যেন চেষ্টা করে কাঁধের চাপটা সইতে না পেরে একটু কাতর ভাবে)–না, আপনার চেহারাটা এত পালটেছেন বলে। আইডাহোতে ছিলেন ফর্সা বেলজিয়ান আর এখানে হয়েছেন বান্টু।
মালাঞ্জা (ঘনাদার পিঠে যেন ঠাট্টা করে একটা প্রচণ্ড চাপড় দিয়ে)—আরে এইটেই আমার আসল চেহারা, সেইটে ছিল মেক-আপ করা নকল। কিন্তু আইডাহো থেকে আমার খোঁজে এখানে এলেন কী করে?
ঘনাদা (যেন চাপড় খেয়ে টলে পড়তে পড়তে)—সামান্য একটু বুদ্ধি খাটিয়ে। তাছাড়া আপনি তো হদিসটা রেখেই এসেছিলেন।
মালাঞ্জা (অবাক হয়ে ও রাগী গলায়)—আমি রেখে এসেছিলাম? কী—
ঘনাদা (যেন ভয়ে ভয়ে)—আজ্ঞে, আপনার নামটা। আপনার সে বিদ্যাবুদ্ধি তো নেই। থাকলে জানতেন যে সব দেশের মানুষের নামের কিছু কিছু আলাদা বিশেষত্ব থাকে। যেমন আপনার মালাঞ্জা এমপালে—এ নাম আপনি ট্যানজানিয়া কি সুদানে পাবেন না।
মালাঞ্জা (যেন ক্ষিপ্ত হয়ে ঘনাদার ঘাড় ধরে নেড়ে)—শুধু নাম দেখেই তুই এখানকার হদিস পেয়েছিস?
ঘনাদা (যেন কাতরাতে কাতরাতে)–শুধু আপনার নয়, ড. লেভিনকেও যে ভুজুং দিয়ে এখানে এনে লুকিয়ে রেখেছেন তারও খোঁজ পেয়েছি।
