সুধীর (বড় বড় দুটি ফিশ রোলের প্লেট ট্রে-তে নিয়ে গিয়ে ঘনাদার হাতে তুলে দিতে দিতে)—আজ্ঞে, ডি লুক্স কাফের ফিশ রোল। ওদিক দিয়েই আসছিলাম। সবে টাটকা ভাজছে দেখে না নিয়ে এসে পারলাম না।
(শিশির তখন তার সিগারেটের টিন রাখা ট্রেটাও সামনে এনে ধরেছে। ঘনাদা কোনটা আগে নেবেন ঠিক করতে না পেরে বেশ দোনামনা ভাবে দুদিক চাইছেন।)।
সুধীর (ফিশ রোলের প্লেটটা ঘনাদার হাতে ধরিয়ে দিয়ে)—নিন, ঠাণ্ডা হতে দেবেন না।
(ঘনাদা প্লেটটা নেবার পর সুধীর, গৌর, শিশির, শিবু এক-একটি আসন নিয়ে বসতে যাচ্ছে আর ঘনাদা বেশ প্রসন্ন হাসি হেসে একটি ফিশ রোল তুলে নিতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে বারান্দার দরজার বাইরে নেপথ্যে গর্জন।)
নেপথ্য থেকে—অয়ম্ অহম্ ভোঃ! তিষ্ঠ–
(হঠাৎ সবাই দরজা থেকে সরে ঘনাদার দিকে মুখ ফিরিয়ে যেন হতভম্ব। ঘনাদার প্লেটের ফিশরোলটা তাঁর হাত থেকে শূন্যে উঠে ঠিক তাঁর নাকের ওপর ঝুলছে। এই অবস্থায় বারান্দার দরজা দিয়ে মাথায় একরাশ জটা আর মুখে দাড়ির বিরাট জঙ্গল নিয়ে গেরুয়া ধুতি-পাঞ্জাবি চাদর গায়ে দেওয়া এক অদ্ভুত মূর্তির আবির্ভাব)।
জটাজটধারী (ঘনাদার দিকে হাত তুলে)—-লজ্জা করে না তোমাদের! অতিথি পরিচর্যা ভুলে নিজেদের ভোজন বিলাসে মত্ত। যে লোভে অতিথির অমর্যাদা করেছ সেই লোভের গ্রাসেই তাহলে ছাই পড়ুক।
(ঘনাদার প্লেটের ফিশরোল দুটি অভিশাপের সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে যেন লাফ দিয়ে উঠে গিয়ে ছাদে ঠেকে ছত্রাকার।)।
শিবু শিশির (সবাই দাঁড়িয়ে উঠে যেন স্তম্ভিত আতঙ্কে)—আরে, আরে, একী কাণ্ড!
ঘনাদা (দাঁড়িয়ে উঠে সবিনয়ে)–ননুক্ৰিয়াতামাসন পরিগ্রহঃ। অবহিতোহস্মি!
(ঘনাদা নিজের আরাম কেদারাটাই জটাজুটধারীর দিকে ঠেলে দিতে যাচ্ছিলেন, জটাধারী তার আগেই নিজে থেকে একটা চেয়ার টেনে তাতে বসতে বসতে…)
জটাজুটধারী (চেয়ারটায় বসে)-যাক আমি প্রীত হয়েছি তোমার বিনয়ে আর দেবভাষা প্রয়োগে! আমার ক্রোধ আমি সংবরণ করলাম! (ক্ষমায় উদার ও প্রসন্ন হবার সুরে) হ্যাঁ, তোমাদের মধ্যে ঘনশ্যাম কার নাম বলো তো!
গৌরা (চাপা স্বরে শঙ্কিতভাবে)—এইরে, সব বুঝি দিলে গুবলেট করে!
শিশির (চাপা গলায় আশ্বাস দিয়ে)—না, না, বোধহয় ভয় নেই। ঘনাদার চেহারাটাই দেখ না।
ঘনাদা (বিগলিত বিনয়ে)আজ্ঞে অধীনের নামই ঘনশ্যাম। আপনার প্রতি অসম্মানের অপরাধে মার্জনা ভিক্ষা করছি। সত্যিই প্রথমে আপনাকে চিনতে না পেরে সেই মালাঞ্জা এমপালে বলে ভুল ভেবেছিলাম।
জটাজুটধারী (বেশ একটু সন্ত্রস্ত অস্বস্তির সঙ্গে)-মালাঞ্জা এম-পালে!
ঘনাদা (যেন অত্যন্ত অনুতপ্ত স্বরে)—আজ্ঞে হ্যাঁ, সেই যে সাংকুর নদীর ধারে এমবুজি মাঈ থেকে চোরাই হিরে পাচার করার জন্য আমায় ম্যাজিকের ধোঁকা দিয়ে এপুলু-তে নিয়ে গিয়ে মিথ্যে খবরে ইতুরির গহন বনে পাঠিয়ে জংলিদের ঝোলানো ফাঁদের ফাঁসিতে লটকে মারবার চেষ্টা করেছিল। আর যার মতলব হাসিল হলে পৃথিবীটা আরও দশ-বিশগুণ বেড়ে গিয়ে আমাদের কী দশা যে হত জানি না, সেই মালাঞ্জা এমপালে ভেবে আপনাকে একটু তাচ্ছিল্য করেছিলাম গোড়ায়, তবে (ঘনাদা যেন একটা বিশ্রি স্মৃতি ঢাকবার জন্যে দীর্ঘশ্বাস ফেলে) থাক সে কথা।
শিবু, শিশির, গৌর, সুধীর ( প্রায় এক সঙ্গে দাঁড়িয়ে উঠে)—সে কী! থাক কী বলছেন!
জটজুটধারী (সমান আগ্রহের সঙ্গে)না, না থাকবে কেন? মনে যখন হয়েছে তখন বলেই ফেলল। বদখদ কিছু হলে সে স্মৃতি পেটে রাখতে নেই। ওই কী বলে— তাতে আবার বদ হজম হয়।
ঘনাদা (হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে)-না, বদহজম আর কী হবে, পেটে যখন কিছু পড়েনি।
জটাজুটধারী (অপ্রস্তুত ও ব্যতিব্যস্ত)—তাই তো বটে! তাই তো বটে! আমি আবার অভিশাপটা দিয়ে ফেলে খাওয়াটাই নষ্ট করে দিয়েছি। তা তোমরা
(জুটজুটধারীর কথা শেষ হতে না হতেই বারান্দার দরজায় বনোয়ারির আবির্ভাব।)
বনোয়ারি (দরজা থেকে)-মাফি মাঙছি, হামাকে রামভুজজি ভেজে দিলে। পুছ। করতে পাঠালো আর গরমাগরম পিশরুল আসবে কি না।
জটাজুটধারী (সবিস্ময়ে)—গরমাগরম পিশরুল! সে আবার কী?
গৌর, শিশির, সুধীর, শিবু (একসঙ্গে)-হ্যাঁ, হ্যাঁ, বহুৎ খুব আনবে! গরম গরম ভেজে আনবে। যা যা, জলদি যা। (জটাজুটধারীর দিকে ফিরে) পিশরুল হল ফিশরোলের বনোয়াবি বুলি। (ঘনাদার দিকে ফিরে) ফিশরোলগুলো তো এখুনি আসছে। তার আগে ওই আপনার ইতুরি না ফিতুরির জঙ্গলে ঝোলানো ফাঁস থেকে আপনার ওই বৃত্তান্তটা যদি একটু ধরেন।
[ওপরের কথাগুলো চারজনে যে-যেটা-ইচ্ছে একটা একটা টুকরো পর-পর বলবে]
ঘনাদা (যেন দ্বিধাভরে)—সে বৃত্তান্ত শুরু করতে বলছ? কিন্তু জটাজুটধারীর দিকে চেয়ে) কিন্তু এসব কথা ওঁর সামনে বলা ঠিক হবে?
গৌর শিশির ইত্যাদি (সমস্বরে)—খুব হবে, খুব হবে!
জটাজুটধারী—হ্যাঁ, হ্যাঁ শুরু করুন, শুরু করুন।
ঘনাদা (যেন ভরসা পেয়ে)—আসল কথা কী জানো! ওঁকে ম্যালাঞ্জা এমপালে ভাবার জন্য এখন লজ্জা হচ্ছে। কোথায় উনি আর কোথায় সেই শয়তানের শিরোমণি। চেহারায় মিল আছে ঠিক। মালাঞ্জা অবশ্য আরও ফর্সা ছিল। আরও মোটাসোটা জোয়ান চেহারা! তবে এঁকে দেখে ভেবেছিলাম, নিজের শয়তানির সাজাতেই মালাঞ্জা বুঝি অমন শুঁটকো মর্কট-মাকা হয়ে গেছে।
[জটাজুটধারীর আর শিবু-সুধীর ইত্যাদির বেশ একটু অস্বস্তিকর অবস্থা। গলা খাঁকারি দিয়ে শিবু কিছু যেন বলতে যাবার মুখে ঘনাদা আবার শুরু করবেন—]
