সে সব মার্বেল আর ডিম টেবিলের ওপর রেখে ঘনাদা আবার বললেন, হিরেগুলো বার করবার পর ঘরের একটা তাক থেকে একটু স্পিরিট হাতে লাগিয়ে মালাঞ্জার গালে একটু জোরে একটা আঙুল ঘসতে যেতেই ড. লেভিন হাঁ-হাঁ করে উঠলেন।
আমি আঙুল ঘসতে আরম্ভ করার সঙ্গেই প্রায় ধমক দিয়ে বললেন, আরে, কহ কী, দাস! মালাঞ্জা যে গায়ে পেস্ট করে আইডাহোতে সাহেব সেজেছিল তা ও আমার কাছে স্বীকার করেছে।
না, ড. লেভিন, আঙুলটা ভাল করে মালাঞ্জার গায়ে ঘসে তুলে নিয়ে বললাম, মালাঞ্জার এখনকার রংটাই পেন্ট করা কি না এই দেখুন। আসলে ও একজন ইউরোপিয়ান, হয়তো ফেরারি নাৎসি। আপনার গবেষণা সফল হলে তাই দিয়ে পৃথিবীর কী সর্বনাশ করা ওর মতলব কে জানে! আপনাকে তাই আমার সঙ্গে চলে আসতে হবে।
কেমন যেন বিহ্বল দিশাহারা হয়ে ড. লেভিন বললেন, কিন্তু আমার গবেষণা? আমার স্বপ্ন?
আপনার গবেষণা আপনার স্বপ্ন মানুষের পক্ষে সর্বনাশা ড. লেভিন!সহানুভূতির সঙ্গেই বললাম, মানুষকে আকারে ছোট করলেই তার বেশির ভাগ সমস্যা মিটবে এ কথা ভাবা আপনার ভুল। শুধু পৃথিবীই তার পক্ষে বিশাল করলে চলবে না, মানুষের মনটাকেও সেই সঙ্গে আরও বড় আরও উদার করতে হবে। তার উপায় যত দিন না হয় ততদিন পৃথিবীর বদলে সারা ব্রহ্মাণ্ড পেলেও সমস্যা মিটবে না। যা ভুল করতে যাচ্ছিলেন তা ছেড়ে এখন আমার সঙ্গে চলুন।
চলুন। হঠাৎ হা হা করে হেসে দাঁড়িয়ে উঠল মালাঞ্জা। খুব তো বড় বড় কথা শোনালে, দাস। কিন্তু চলুন বললেই কি এই ইতুরির জঙ্গল থেকে যাওয়া যায়! আমি ফেরারি নাৎসি বা যে-ই হই, যে গবেষণার জন্যে ড. লেভিনকে এখানে এনেছি তা শেষ না করা পর্যন্ত এখান থেকে এক পা-ও ওঁকে যেতে দেব না। সেই সঙ্গে তোমাকেও যে এখানে বন্দী থাকতে হবে তা বুঝতে পারছ, দাস?
ঠিক পারছি না তো! একটু হেসে ইশারা করার সঙ্গে সঙ্গে মাকুবাসি ঘরে এসে ঢুকতেই তাকে দেখিয়ে বললাম, বরং মনে হচ্ছে চলুন বললেই ইতুরি থেকে যাওয়া যায়। তবে তোমার যখন ইতুরি-র ওপর এত মায়া তখন তোমাকেই কিছুদিন এখানে রাখবার ব্যবস্থা করে যাচ্ছি। ভয় নেই, আলগা করেই বাঁধন দেব। একটু চেষ্টা করলে
একদিনের মধ্যেই যাতে খুলতে পারো।
মালাঞ্জা এমপালেকে সেইরকম ভাবে বেঁধেই সেখান থেকে ড. লেভিনকে নিয়ে মাকুবাসিকে গাইড নিয়ে চলে এসেছিলাম। মাকুবাসিকে ফিরে গিয়ে মালাঞ্জার খোঁজ নিতে বলতেও ভুলিনি।
ঘনাদা কথাগুলো শেষ করেই আচমকা উঠে পড়ে ঘর থেকে চলে যাবার জন্য পা বাড়িয়েছেন। যেতে যেতে দরজার কাছ থেকে ফিরে শুধু বলে গেছেন, আমার ফিশরোল সরানোর জন্য ছাদের সঙ্গে বাঁধা কালো সুতোটা এখনও ঝুলছে। ওটা ছিঁড়ে ফেলো। আর তোমাদের ওই সন্ন্যাসী ঠাকুরকে জটাজুট দাড়ি গোঁফ একটু খুলে আরাম করে বসতে বলো। যা গরম।
টঙের ঘরের সিঁড়িতে ঘনাদার পায়ের আওয়াজ পাওয়া গেছে। আমরা তখন চোরের মতো এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি।
দুর্বাসার দিকে চাইতেই চোখ উঠতে চাইছে না।
অত সাজগোজ শেখানোপড়ানোর পর অমন নাকাল হয়ে যা কটমট করে সে আমাদের দিকে তাকিয়ে!
এরপর তাদের ক্লাব থেকে আর কাউকে কোনওদিনও কিছু সাজিয়ে আনা যাবে।
পৃথিবী যদি বাড়ত (নাটক)
বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন
[বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দোতলার আড্ডা ঘর। বেশ বড় ঘর। ডান দিকে পেছনে বাইরের বারান্দায় যাবার বড় দরজা দেখা যাচ্ছে। বারান্দায় রেলিং ও আরও দূরে ওপরে ছাদে ওঠবার ন্যাড়া সিঁড়িটার খানিকটা দেখা যাচ্ছে। দৃশ্যটি বজায় রেখে ঘরটি নিজেদের সুবিধা ও পছন্দ মতো যেভাবে তোক সাজানো যাবে। তবে কয়েকটি আসবাবপত্র না থাকলেই নয়। যেমন ঘরের মাঝামাঝি একটু বাঁদিক ঘেঁষে দর্শকদের দিকে মুখ করে পাতা একটি আরাম কেদারা। আর ভাল আয়না গোটা দুই ও বাঁ পাশে গোটা তিন-চার চেয়ার। চেয়ারগুলি এক রকমের হবে না। কোনওটা টিনের, কোনওটা কাঠের। কোনওটার হাতল আছে, কোনওটার নেই। কোনওটা আবার শুধু টুল। দর্শকদের লাইনের চেয়ারগুলির পেছনে একটা ছোট সতরঞ্জিপাতা তক্তপোশ আর সামনে একটি নিচু চৌকো টেবিল আর গোটা দুই টি-পয় থাকবে। দর্শকদের ডান দিকের পেছনে বারান্দায় যাবার দরজা। বাঁ দিকে একেবারে পেছনের দেয়ালে সিলিং থেকে মেঝে পর্যন্ত একটি বড় সাদা পর্দা টাঙানো থাকবে। ঘরের সামনের দিকে অভিনয় হবার সময় পর্দাটি আধো-অন্ধকার পেছনের দেওয়াল বলেই মনে হবে। তার ওপর দুটো-একটা কিছুর ছায়াও ফেলে রাখা যেতে পারে। পরে এই পর্দাটি পেছনের উজ্জ্বল আলোয় ছায়ামূর্তি প্রক্ষেপের জন্য ব্যবহার করা হবে।
এ নাটিকার অভিনয়ে এই কটি চরিত্র থাকবে। স্বয়ং ঘনাদা, জটাজুট আর একরাশ দাড়িগোঁফে ঢাকা অথচ ঈষৎ গেরুয়া রঙে ছোপানো ধুতি-পাঞ্জাবি পরা নকল দুর্বাসা, এ ছাড়া গৌর, শিবু, শিশির ও সুধীর। শেষের চারজন কেউ ধুতি-পাঞ্জাবি কেউ প্যান্ট শার্ট পরা থাকতে পারে। ঘনাদার ধুতির ওপর হাত গোটানো শার্ট আর সাধারণ কোঁচানো ধুতি, পায়ে বিদ্যাসাগরি চটি।]
গৌর (ঘর সাজাতে সাজাতে)—আজ্ঞে হ্যাঁ, তা চিকেন বিরিয়ানি আর দুম্বা খাসির রগন জোস তো হেলায় ফেলায় বানাবার জিনিস নয়। রামভুজের সঙ্গে বনোয়ারির তাই আর অন্য কাজের ফুরসুতও নেই।
ঘনাদা (যেন কিঞ্চিৎ আপত্তির সুরে)—তা, রাত্রে অন্য সব হচ্ছে, তার উপর এখন আবার এসব কেন?
