অবাক হতে হয় সেখানকার দুটি মানুষের আলাপ শুনেও। তাদের একজন ড. লেভিন, আর-একজন মালাঞ্জা এমপালে।
ড. লেভিন তখন জিজ্ঞাসা করছেন, যাঁর খোঁজে গিয়েছিলে বলছ, সত্যিই তাঁর দেখাই পেলে না। তিনি তো আমাদের বন্ধু বলছ।
হ্যাঁ, পরম বন্ধু! হতাশভাবে বললে মালাঞ্জা, তিনি এলে অনেক উপকার আমাদের হত। তাই গোপনে খবর পাঠিয়ে তাঁকে আসতে বলেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ইতুরির জঙ্গলের ভয়েই বোধহয় আসতে পারলেন না।
না, ঠিকই এসেছি, মালাঞ্জা, আর বোধহয় ঠিক সময়েই। নমস্কার ড. লেভিন।
বাইরের বেতের দরজা প্রায় ভেঙে আমায় হঠাৎ ঢুকতে দেখে মালাঞ্জা আর ড. লেভিন দুজনেই একেবারে স্তম্ভিত হতবাক।
তার মধ্যে ড. লেভিনই প্রথম চাঙ্গা হয়ে বললেন, একী—তুমি মি. দাস? তোমায় আনতে গিয়ে মালাঞ্জা খুঁজে পায়নি! তুমি যে আমার খোঁজে আসছ তা আগে আমায় বলেনি কেন?
বলেনি একটু বাধা ছিল বলে বোধহয়, হেসে মালাঞ্জার দিকে তাকিয়ে বললাম, প্রথমত, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় যে বহুদিনের তা ওর জানা ছিল না। দ্বিতীয়ত, আগে থাকতে বললে ইতুরির ঝোলানো ফাঁসে আমাকে লটকাবার ব্যবস্থা করা যেত না।
ফাঁসে লটকানো? কী বলছ তুমি, দাস? ড. লেভিন ভুরু কুঁচকে আমার দিকে তাকালেন, তোমাকে ঝোলানো ফাঁসে লটকাতে যাবে কেন মাঞ্জা?
যাবে, আমার মতো পথের কাঁটা না সরালে ওর আসল মতলব হাসিল হবে না, তাই। কী বলো মালাঞ্জা? মালাঞ্জার দিকে ফিরে তাকিয়ে তাকেই জিজ্ঞাসা করলাম।
মালাঞ্জা একেবারে চুপ। তার বদলে ড. লেভিনই বিমূঢ় এবং একটু উত্তেজিত গলায় বললেন, কী তুমি বলছ কিছুই বুঝতে পারছি না, দাস। আমার এই একা লুকোনো আস্তানার খোঁজ পাওয়াই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তোমার অসাধ্য কিছু নেই। বলেই তা তুমি পেয়েছ বুঝলাম, কিন্তু সে খোঁজ পাবার পর আমার একান্ত বিশ্বাসের সহকারী সম্বন্ধে এ সব মিথ্যা অভিযোগ করতেই কি তুমি এসেছ!
মিথ্যা অভিযোগ নয়, ড. লেভিন, সব সত্য। এবার গম্ভীর হয়ে বললাম, কিন্তু শুধু তার জন্য আমি আসিনি। আমি এসেছি আপনাকে নিয়ে যেতে।
আমায় নিয়ে যেতে! ড. লেভিন এবার গরম হলেন, আমায় তুমি নিয়ে যেতে চাইলেই আমি যাব? আমি কী জন্য এখানে এসেছি তা তুমি জানো?
তা জানি বলেই আপনাকে নিয়ে যেতে চাই। কঠিন হয়ে এবার বললাম, আর আপনার সন্ধান যে পেয়েছি তা আপনার নিরুদ্দেশ হবার কারণ থেকেই। শুনুন ড. লেভিন, আপনি মস্ত বৈজ্ঞানিক, সেই সঙ্গে পৃথিবীতে স্বর্গের স্বপ্ন-দেখা কবি। আপনি পৃথিবীকে আরও বড় করতে চান মানুষের ভালর জন্য।
হ্যাঁ, এবার উৎসাহিত হয়ে উঠলেন ড. লেভিন, মানুষের এত সব সমস্যা, জাতিতে জাতিতে এত মারামারি কাটাকাটি শুধু পৃথিবীতে এখন জায়গার অভাব। বলে। পৃথিবী বড় করতে পারলে মানুষের বারো আনা সমস্যার মীমাংসা হয়ে যাবে।
আপনি পৃথিবীকে বড় করতে চান জেনেই, ড. লেভিনকে বাধা দিয়ে থামিয়ে বললাম, কোথায় আপনি নিরুদ্দেশ হয়ে থাকতে পারেন তার নিশ্চিত হদিস পেয়েছি।
কেমন করে? ড. লেভিন অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
বললাম, পেয়েছি, পৃথিবী বড় করার আসল রহস্যটা বুঝে। পৃথিবী তো সত্যি বেলুনের মতো ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে বড় করা যায় না। পৃথিবী যা আছে তা-ই থাকা। তা সত্ত্বেও পৃথিবীকে আরও বিস্তৃত করতে হলে মানুষকে ছোট করতে হয় এই বুদ্ধি আপনার মাথায় এসেছে। মানুষ যদি এখনকার মাপের বদলে সমস্ত বর্তমান বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ছোট হতে হতে ইঁদুর, আর তারও পরে পিঁপড়ের মতো ছোট হয়ে যায় তা হলে পৃথিবী তার পক্ষে কী বিরাটই না হয়ে যাবে। তাই ভেবেই আপনার জৈব-বিজ্ঞানের সাহায্যে মানুষকে আকারে ছোট করার উপায় আপনি খুঁজতে শুরু করেছেন। সে খোঁজে শেষ পর্যন্ত পৃথিবীর এই একটি দেশ জাঈরের-এর ইতুরি জঙ্গলে আপনাকে আসতেই হবে।
কেন আসতে হবে তা তুমি বুঝেছ? ড. লেভিন বেশ একটু মুগ্ধ বিস্ময় নিয়ে আমার দিকে চাইলেন।
হ্যাঁ, কিছুটা তার বুঝেছি, ড. লেভিন, বিনীতভাবেই জানালাম, পৃথিবীতে বামন জাত, বামন প্রাণী অনেক জায়গাতেই আছে, কিন্তু জাঈর-এর এই ইতুরি-র জঙ্গল যেন সে রহস্যের আসল ঘাঁটি। এখানে শুধু আদ্যিকালের এক বামন জাতের মানুষই নেই, এখানকার আরও অনেক কিছুর আকার ছোটর দিকে, যেমন এখানকার খুদে লাল মোষ, বামন হাতি ইত্যাদি। এখানকার মাটি আর জলে সুতরাং আকার কমাবার কোনও রহস্য লুকোনো আছে। নিজের গবেষণায় যা জেনেছেন তার সঙ্গে এখানকার রহস্যও আপনার না জানলে নয়।
সবই বুঝলাম, এবার ড. লেভিন আবার একটু সন্দিগ্ধ গলায় বললেন, কিন্তু আমার একান্ত বিশ্বাসী সহকারী মালাঞ্জার বিরুদ্ধে তোমার ও সব অভিযোগ কেন?
প্রথমত, ও সত্যি মালাঞ্জা এমপালে নয় বলে। মালাঞ্জার কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে এবার বললাম, দ্বিতীয়ত, আপনার গবেষণার ফল ও নিজের লাভেই লাগাবে বলে মতলব করে আপনাকে এখানে এনেছে বলে অভিযোগ।
এ সব কথা তুমি কীসের জোরে বলছ, দাস? ড. লেভিনের গলা এবার কঠিন হল।
বলছি কীসের জোরে—এই দেখুন! মালাঞ্জার নাক মুখ চোখ থেকে টুক টুক। করে যেন ফুল ঘেঁড়ার মতো হিরে টেনে বার করতে করতে বললাম, মালাঞ্জা চোর। এমবুজি মাঈ থেকে ও এমনই করে হিরে পাচার করে এনেছে।
ঘনাদার কথা শুনে যত না, তাঁর কাণ্ড থেকে তখন আমরা সবাই থ। করছেন কী ঘনাদা। মালাঞ্জার নাক মুখ থেকে হিরে বার করা দেখাতে গিয়ে আমাদের দুর্বাসার জটাজুট দাড়ি থেকেই যে মার্বেলের গুলি আর তার সঙ্গে ক-টা আস্ত ডিম বার করে ফেললেন!
