বেচারার আর দোষ কী? আমায় তাগ করে যেখানেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, সেখানে শুধু দেয়ালের সঙ্গেই মোলাকাত হয়। আমি তার আগেই সরে গেছি।
পাঁচ-পাঁচবার এমনই দেয়ালবাজি দেখাবার পর সত্যিই ধরে তুলতে হল মালাঞ্জাকে। ধরে তুলে আমার চেয়ারটাতেই বসিয়ে দিয়ে বললাম, আমি বড়ই দুঃখিত, হের মালাঞ্জা। এ বাংলোবাড়ির দেয়ালে গদি আঁটা থাকা উচিত ছিল।
আমিও দুঃখিত যে, ধুকতে ধুকতে হাঁফাতে হাঁফাতে বললে মালাঞ্জা এমপালে, আমার কথাটা আপনাকে ঠিক বোঝাতেই পারিনি। আমি এতক্ষণ শুধু আপনাকে পরীক্ষা করছিলাম, মি. দাস? ড. লেভিনের নিজের হুকুমেই এত কড়া পরীক্ষা করতে হয়েছে। বুঝতেই তো পারছেন, ড. লেভিন যা করতে যাচ্ছেন অমন আশ্চর্য একটা গবেষণার কথা একেবারে যোলো আনা খাঁটি মানুষ ছাড়া কাউকে জানানো যায়! আপনাকে এখান থেকে ড. লেভিনের কাছেই নিয়ে যাবার জন্য আমি এসেছি— পরীক্ষাটা আগে শুধু করে নিলাম।
আমায় পরীক্ষা করছিলেন? চোখ দুটো আপনা থেকেই কপালে উঠল।
অবাক হবার তখনও কিছু তবু বাকি।
মালাঞ্জা যন্ত্রণায় মুখটা একটু বেঁকিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললে, হ্যাঁ, সে পরীক্ষা আমার শেষ হয়েছে, শুধু শেষ হুঁশিয়ার করাটা এখনও বাকি। এখান থেকে আপনার যাবার আসল বাধাটা তাই কাটিয়ে দিই।
আসল বাধা? সন্দিগ্ধ ভাবে বললাম, সে আবার কী?
এই দেখুন, বলে মালাঞ্জা এবার যা দেখাল তা সত্যি তাজ্জব করার মতো ব্যাপার।
গাছ থেকে ফুল তোলার মতো আমার মাথা মুখ নাক কান হাতা পকেট যেখানে খুশি হাত দিয়ে সে একটার পর একটা ছোট বড় হিরে বার করে আনতে লাগল।
তারপর সেগুলো সামনের টেবিলে রেখে ওই রক্ত-মাখা মুখেই একটু কাতরানির হাসি হেসে বললেন, যতই আপনি ম্যানেজারের বন্ধু হন, এই সব চোরাই হিরে নিয়ে আপনি এমবুজি মাঈ ছেড়ে যেতে পারতেন? এবার বুঝতে পারছেন আমি আপনার বন্ধু, না শত্রু! শত্রু হলে এই সব হিরে দিয়েই আপনাকে আমি ধরিয়ে দিতাম না?
আমার মুখে তখন আর কথা নেই। এ ম্যাজিকের পর আর বলার কী বা থাকতে পারে?
শত্রু না বন্ধু মালাঞ্জার সঙ্গেই তারপর এমবুজি মাঈ থেকে বোয়ামা জলপ্রপাতের শহর কিসানগানি হয়ে এপুলু গেলাম। সেখান থেকে দুনিয়ার সব চেয়ে রহস্যময় জঙ্গল ইতুরি। ইতুরি-র জঙ্গলে মালাঞ্জার সাধ্য নেই একা পথ চিনে যাবার। তাই সেথো নেওয়া হল মাকুবাসি নামে ইতুরির বিখ্যাত বামন জাতের এক সর্দারকে। মাকুবাসি মাথায় চার ফুটের বেশি লম্বা নয়, পরনে তার নেংটি। হাতে যেন খেলাঘরের একটা ছোট ধনুক। কিন্তু যেমন সে ধনুকের তিরের অজানা অব্যর্থ বিষ তেমনই আশ্চর্য তার সব ক্ষমতা। গহন জঙ্গলের সঙ্গে তার যেন গোপন দোস্তি আছে। এমনই তার সেখানকার সব কিছু সম্বন্ধে জ্ঞান।
এই মাকুবাসিকেও কিন্তু মালাঞ্জার বিশ্বাস নেই। দুদিন মাকুবাসির কথা মতো চলবার পর তিনদিনের দিন এক জায়গায় রাত কাটিয়ে ভোর না হতেই মালাঞ্জা আমায় ঘুম থেকে তুলে দিয়ে বললে, এবার আপনাকে একটু কষ্ট করতে হবে, দাস!
হেসে বললাম, এতক্ষণ কি শুধু আরাম করেছি?
না, না, লজ্জিত হয়ে বললে মালাঞ্জা, এবার খানিকটা পথ আপনাকে ও আমাকে একলা একলা আলাদা যেতে হবে। মাকুবাসি রাত থাকতেই উঠে জালে শিকার ধরতে গেছে। সে আসবার আগেই আমাদের পালাতে হবে। ড. লেভিনের গোপন আস্তানা ওই বামন জাতের কাউকেও আমরা জানাতে চাই না।
একটু চুপ করে থেকে ব্যাপারটা বুঝে নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, একলা অমন কতদূর যেতে হবে? পথ চিনতে পারব তো!
খুব পারবেন!ভরসা দিলে মালাঞ্জা, এখান থেকে সোজা গেলেই মাইল খানেক দূরে একটা প্রকাণ্ড বাওবাব গাছ দেখতে পাবেন। সেই বাওবাবের প্রকাণ্ড একটা কোটরের ভেতর দিয়ে মাত্র মিনিট দুইয়ের একটা সুড়ঙ্গ, ড. লেভিনের গোপন আস্তানায় যাবার রাস্তা। আমি ভিন্ন রাস্তায় সেখানেই যাচ্ছি। আপনি আগে বেরিয়ে পড়ুন। কোনও ভাবনা নেই। শুধু একটু দেখে শুনে যাবেন মাকুবাসির নজরে না পড়েন।
দেখে শুনেই যাচ্ছিলাম। তাতে এক মাইলও যেতে হল না। তার আগেই মাকুবাসির নজরে পড়ে যাব কে জানত!
ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে কোনওরকমে পথ করে যাচ্ছি। হঠাৎ পেছনে জামায় টান পড়ে থেমে যেতে হল। ফিরে তাকিয়ে দেখি কাঁধে এমবোলোকো নামে ছোট্ট খুদে একটা নীল হরিণ নিয়ে মাকুবাসি। সে উত্তেজিত ভাষায় যা বলল তা প্রথমটা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। বোঝাবার জন্যই কাঁধের ছোট্ট নীল হরিণটা সে আমার সামনে এক পা দূরে ছুড়ে ফেলে দিলে।
বুঝতে আর তখন কিছু বাকি রইল না। হরিণটা সেখানে পড়া মাত্র মাটির ওপর পাতা জংলি-লতা ফাঁস তার পা দুটোতে জম্পেশ করে আটকে তাকে এক ঝটকায় শূন্যে ঝুলিয়ে দিলে। মাকুবাসি মোক্ষম সময়ে টেনে না ধরলে ইতুরি-র জংলি বামনদের ফাঁদে আমারও ওই অবস্থাই হত।
মাকুবাসি তার হরিণটা ঝোলানো ফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে তখুনি আমাদের রাতের আস্তানায় ফিরে যেতে চাইছিল, তাকে তা দিলাম না। কোনও রকমে আমার মনের কথাটা তাকে বুঝিয়ে রাত পর্যন্ত তাকে রেখে দিলাম সঙ্গে।
তারপর—
হ্যাঁ, তারপর নাটকের শেষ দৃশ্যটা একরকম জমাটি-ই হল।
ইতুরি-র জঙ্গলের মাঝখানে সত্যিই বেশ মজবুত করে তৈরি বাঁশ বেত আর জংলি লতাপাতার একটা ছোটখাটো বাসা। তার একটা ঘর গবেষণাগারের সাজ-সরঞ্জামেই সাজানো! কী কষ্ট করে শুধু সে সমস্ত লটবহর নয়, ঘরের জোরালো হ্যাসাক বাতিটাও আনানো হয়েছে ভাবলে অবাক হতে হয়।
