যা দরকারি তা অন্যকে দিয়ে আমি করাই না।মালাঞ্জা এমপালে আমার এক কাঁধ ছেড়ে আর কাঁধে চাপ দিয়ে বললেন, আর এ-ই আমার আসল রং। আইডাহোতে যা লোকে দেখেছে সে রং মেক-আপ করা নকল। কিন্তু আইডাহো থেকে আপনি এই জাঈর-এ আমার খোঁজে এলেন কী করে?
সামান্য একটু বুদ্ধি তার জন্য খাটাতে হয়েছে। আবার যেন এমপালের হাতের চাপটা সরাতে গিয়ে হার মেনে কাতর গলায় বললাম, তা ছাড়া আপনি নিজেই একটা সোজা স্পষ্ট খেই রেখে এসেছিলেন কিনা!
আমি সোজা স্পষ্ট খেই রেখে এসেছিলাম? সত্যিই চমকে উঠে কাঁধের ওপর চাপ দেওয়া ছেড়ে আমার নড়া ধরে ঝাঁকুনি দিয়ে বললে, কী খেই?
আজ্ঞে, আপনার নামটা! গলাটা যেন যন্ত্রণায় নাড়তে নাড়তে বললাম।
আমার নামটা! আর ভদ্রতার মুখোশ না রাখতে পেরে এমপালে হিংস্র গলায় জিজ্ঞাসা করলে, ওই নাম থেকে তুই এখানে আমার খোঁজ করতে আসার হদিস পেয়েছিস।
শুধু আপনাকে নয়, আপনি যাকে সঙ্গে এনে লুকিয়ে রেখেছন সেই ড. লেভিনকে খোঁজ করার হদিসও ওই নামটা থেকে অনেকটা পেয়েছি! যেন ভয়ে ভয়ে বললাম, বাকিটা পেয়েছি ড. লেভিনের ল্যাবরেটরির কাজকর্ম দেখে আর হেলস ক্যানিয়নে তাঁর একটা বাতুল ইচ্ছের কথা জেনে।
আমার কথায় হতভম্ব হয়ে এমপালে এবার বোধ হয় আমায় শারীরিক শাস্তি দিতে ভুলে গেল। শুধু দাঁত খিঁচিয়ে জানতে চাইলে, ও সব বাজে বাকতাল্লা ছেড়ে আমার নাম শুনে কী করে এখানে এলি তাই আগে বল।
আজ্ঞে! এটা আপনার কাছে এত শক্ত মনে হচ্ছে কেন? একটু রেহাই পেয়ে যেন সভয়ে একটা দেয়ালের দিকে ঘেঁষে গিয়ে দাঁড়িয়ে বললাম, দুনিয়ার সব জায়গায় নামের বিশেষত্ব আছে জানেন তো! আপনাদের এই অঞ্চলেরই পশ্চিম টাঙ্গানাইকা হ্রদের ওপরে টানজানিয়া কি দক্ষিণ পূর্বে জামবিয়ায় যে ধরনের নাম, জাঈর-এর নামের ধরন তা থেকে আলাদা। মালাঞ্জা এমপালে শুনেই তাই বুঝেছিলাম আসল বা ছদ্মনাম যা-ই হোক নামটা এই জাঈর অঞ্চলের। এ নাম যে নিয়েছে জাঈর-এর সঙ্গে তার সম্পর্ক যে নিশ্চিত আছে, ড. লেভিনের গবেষণার ধারা জেনে আর তাঁর পৃথিবী বড় করার ইচ্ছের কথা শুনে সে বিষয়ে সম্পূর্ণ নিঃসন্দেহ হই।
আমার নাম শুনে জায়গাটা না হয় আঁচ করেছিস বুঝলাম, কিন্তু ড. লেভিনের পথিবী বড় করার ইচ্ছে থেকে নিশ্চিত বুঝলি আমরা জাঈর-এ এসেছি! চালাকি করবার আর জায়গা পাসনি! হতভম্ব থাকার দরুনই এবারও এমপালে আমায় মারধোর দেবার চেষ্টা করলে না।
চালাকি করবার এই তো এখন জায়গা! একটু যেন সাহস পেয়েছি ভাব দেখিয়ে জোর গলায় বললাম, আর পৃথিবী বড় করার মতো আশ্চর্য চালাকি এই জাঈর ছাড়া পৃথিবীর আর কোথাও সম্ভব নয়। তাই জেনেই ড. লেভিনকে বোঝাতে এখানে তাঁর খোঁজে এসেছি।
সে খোঁজ তা হলে তোকে ছাড়তে হবে। এবার আর দাঁত খিচুনি নয়, এমপালের গলায় যেন বজ্রের হুমকি, কোথায় তোর দেশ জানি না। তা যে চুলোতেই হোক, ঘরের ছেলে ভালয় ভালয় ঘরে ফিরে যা।
আমার ঘর যে বড় দূর! যেন দুঃখের সঙ্গেই বললাম, সেই গোটা আফ্রিকা আর আরব সাগর পার হবার পরও যেতে হবে ভারতবর্ষের একেবারে পুব প্রান্তে। তার চেয়ে আপনার ঘরে ফিরে যাওয়াই সোজা নয়? প্লেন যদি না জোটে তা হলে মাতাদির বন্দর থেকে জাহাজে চেপে সোজা উত্তরে আপনার বেলজিয়মে গিয়ে পৌঁছতে পারেন। অবশ্য বেলজিয়াম যদি আপনার আসল দেশ হয়। আমায় মসিয়ে বলে সম্বোধন করেও যেরকম ভাঙা ফ্লেমিশ-এ কথা বলছেন তাতে মনে হয় বেলজিয়মও আপনার দেশ নয়। যুদ্ধে হারবার পর শয়তান নাৎসিদের অনেকে অসংখ্য পাপের শাস্তির ভয়ে দেশবিদেশে পালিয়ে লুকিয়ে আছে শুনেছি। কে জানে আপনি তাদেরই একজন কি না, পৈশাচিক এক মতলব নিয়ে ছদ্মনামে আর চেহারায় এই ঘোর জঙ্গলের দেশে পড়ে আছেন। এখন চলে গেলে ড. লেভিনকে তাঁর স্বপ্ন আর আদর্শের টোপ দিয়েই ভুলিয়ে নিয়ে এসে সে মতলব হাসিল করা আপনার আর হয়ে উঠবে না বটে, তবে আমি যখন এসে গেছি তখন সে উদ্দেশ্য সফল তো আপনার আর হবার নয়। তাই ভালয় ভালয় আপনারই এখন চলে যাওয়া ভাল। বেলজিয়মে জায়গা না জোটে জাঈর ছেড়ে যেখানে খুশি গেলেই হবে। জাঈর-এর ইতুরি-র জঙ্গলের অন্তত ধারে কাছে থাকবেন না।
ভেতরে ভেতরে জ্বলে পুড়ে গেলেও শুধু আমি কতটা কী ধরে ফেলেছি তা জানবার অদম্য কৌতূহলেই নিশ্চয়ই, আমার দীর্ঘ বক্তৃতায় এতক্ষণ কোনও বাধা দেয়নি মালাঞ্জা। এবার ইতুরি কথাটা আমার মুখ থেকে খসতেই একেবারে বোমার মতো সে ফেটে পড়ল।
ইতুরি! কী জানিস তুই ইতুরি-র? এমপালে চোখের আগুনেই আমায় যেন ভস্ম করবে।
কিছুই এখনও জানি না, সহজ সরল ভাবে ভালমানুষের মতো বললাম, শুধু অনুমান করছি যে পৃথিবী বড় করবার পরীক্ষা চালাবার পক্ষে ইতুরি-র চেয়ে ভাল জায়গা আর হতে পারে না। সেইখানেই আপনার গুপ্ত ঘাঁটি বসিয়ে ড. লেভিনকে এনে রেখেছেন মনে হচ্ছে—
আর কিছু বলতে হল না। জাঈর-এর দুর্দান্ত পাহাড়ি গোরিলার মতোই মণ পাঁচেক কয়লার বস্তার ভার নিয়ে এমপালে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
দড়াম করে একটা শব্দ হল দেওয়ালে। বেচারার মাথাটা ফেটে রক্তারক্তি।
ধরে তুলতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু সুযোগ দিলে না। মালাঞ্জার জেদ আছে বটে। ফাটা মাথা নিয়েই আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার ওপর। একবার দুবার নয়, পাঁচ-পাঁচবার। কপাল মাথা কিছু আর আস্ত রইল না।
