ম্যাকের এ কথায় বিশেষ কান দিইনি। ড. লেভিনের মতো মানুষ সাধারণের কাছে। একটু অদ্ভুত মনে হবেন এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে?
কিন্তু ম্যাকের পরের কথায় একটু চমকে উঠে কানটা খাড়া করতে হয়েছে।
ড. লেভিন এইসব খোদাই দেখতে দেখতে কী বলেছিলেন জানেন? ম্যাকে তখন আমায় শোনাচ্ছে—বলেছিলেন যে পৃথিবীটাকে আরও বড় করতে হবে, অনেক বড়। শুনে আমার তো তখন হাসি পাচ্ছে। পৃথিবী আবার বড় করবে কী? পৃথিবী কি বেলুন যে ফুঁ দিয়ে ফুলিয়ে বড় করবে! তাঁর লোকটা কিন্তু খোসামোদ করে তাঁকে যেন তাতিয়ে বলল—একা আপনিই তা পারেন হুজুর। এই পাহাড়ের খোদাইকার জাতের মতো কাউকে তা হলে আর দুনিয়া থেকে মুছে যেতে হবে না।
ম্যাকের মুখে ড. লেভিনের পৃথিবী বড় করার কথা শুনেই তখন আমার মাথার ভেতর ভাবনার চাকা ঘুরতে ঘুরতে শুরু করেছে। তার ওপর আর একটা প্রশ্নও খোঁচা দিচ্ছে অবাক করে। ড. লেভিনের লোকটা আবার কে? তাঁর সঙ্গে কেউ কি আরও ছিল?
সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম ম্যাকেকে। ম্যাকের কাছে যা জানলাম তা এমন কিছু অদ্ভুত নয়। ড. লেভিনের সঙ্গে তাঁর একজন অনুচর গোছের ছিল। অমন অনুচর থাকাই স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ড. লেভিনের অন্তর্ধান সম্বন্ধে যা যা বিবরণ আমায় দেওয়া হয়েছে তার মধ্যে এ রকম অনুচরের বক্তব্যও কি থাকা উচিত ছিল না? যত তুচ্ছই হোক এ বিষয়ে কারও কথাই তো উপেক্ষা করবার নয়।
আগেকার সন্ধানের এ-ত্রুটি শোধরাতে হবে ঠিক করে আসল কাজের জন্য আইডাহোর রাজধানী বয়েস-এ ড. লেভিনের নিজের ল্যাবরেটরিতেই গিয়ে হাজির হলাম। তারপর তাঁর সহকারীদের সাহায্যে তন্নতন্ন করে ড. লেভিন সম্প্রতি যে-গবেষণার কাজে মেতে ছিলেন তার সন্ধান নিতে কিছু বাকি রাখলাম না।
যা আঁচ করেছিলাম সে রকম কিছু সত্যিই তার মধ্যে পেলাম। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার। তাঁর সঙ্গে যে অনুচর হেলস ক্যানিয়ন-এ স্নেক নদীর পাড়িতে গিয়েছিল, তার সম্বন্ধে কিছুই জানা গেল না। লোকটার কোনও পাত্তাই নেই। ড. লেভিন একা তাঁর যে বাসায় থাকতেন সেখানে তাঁর নিয়মিত জ্যানিটরের বদলি লোকটা নাকি কিছুদিন মাত্র কাজ করেছিল। নেহাত ক-দিনের বদলি বলে তার সম্বন্ধে খোঁজখবরের কথা কেউ ভাবেনি।
ড. লেভিনের আসল জ্যানিটরও লোকটাও সম্বন্ধে কিছুই বলতে পারল না। সে ক-দিনের ছুটিতে যাবার সময় তাদের ইউনিয়ন থেকেই চিঠি নিয়ে লোকটা নাকি বদলিতে এসেছিল। জ্যানিটরের কাছে অনেক কষ্টে লোকটার নামটা শুধু উদ্ধার করা। গেল।
সে নামটা বেশ অবাক করবার মতো। নাম হল মালাঞ্জা এমপালে।
নাম শুনেই সন্দিগ্ধ ভাবে জ্যানিটরকে জিজ্ঞাস করেছিলাম, নামটা ঠিক তোমার মনে আছে তো?
আজ্ঞে হ্যাঁ, বলেছিল জ্যানিটর, নামটা অদ্ভুত বলেই মনে আছে। আমাদের এ দিকে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান, কাফ্রি ও কিছু কিছু এস্কিমোও আছে। তাদের নানা রকম মজার নামের ভেতর এরকম বেয়াড়া নাম কখনও পাইনি।
মালাঞ্জা এমপালে যার নাম বলছ, সে লোকটা কি চেহারায় কাফ্রি, আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ান বা এস্কিমোদের মতো? এবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম।
আজ্ঞে না, বলেছিল জ্যানিটর, নামটা উদ্ভুট্টে হলেও চেহারায় আমাদেরই মতো!
নাম মালাঞ্জা এমপালে, অথচ চেহারায় ইউরোপীয় এই রহস্যটা মাথায় নিয়ে সেখান থেকে চলে এসেছিলাম।
তারপর ড. লেভিনের ল্যাবরেটরির কাগজপত্র ঘেঁটে যা পেয়েছি আর মালাঞ্জা এমপালে নাম থেকে যা হদিস মিলেছে তাই সম্বল করে বারো আনা পৃথিবী ঘুরে একবার ফিলিপাইনস আর তারপর উত্তর বর্মা হয়ে সোজা জাঈর-এ গিয়ে রাজধানী কিনশাসা, আর কানাঙ্গা হয়ে এমবুজি মাঈতে এসে উঠলাম।
দুই-এ দুই-এ চার জুড়তে ভুল যে আমার হয়নি দুদিন ওই ছোট শহরে একটু শোরগোল তোলবার পরই তার অকাট্য প্রমাণ পাওয়া গেল।
ওখানকার প্রধান মাইনিং কোম্পানির ম্যানেজারের সুপারিশেই হোটেলের বদলে সাংকুরু নদীর ধারে নির্জন একটা ছোট বাংলো বাড়িতে থাকবার সুবিধে পেয়েছিলাম। তিন দিনের দিন সন্ধ্যার পর সেই বাংলোতেই এক দর্শনপ্রার্থী এসে হাজির।
কেউ একজন আসবে বলেই অনুমান করেছিলাম। কিন্তু আমার চাকরের আনা কার্ডে যে নামটা ছাপানো সেটা আমার কাছেও অপ্রত্যাশিত।
নামটা মালাঞ্জা এমপালে!
চাকরকে তক্ষুনি রাত্রের মতো ছুটি দিয়ে আগন্তুককে বসবার ঘরে ডাকলাম।
কার্ডের নামটা পড়ে যেমন মানুষটাকে স্বচক্ষে দেখে তেমনই অবাক হতে হল।
আইডাহোর রাজধানীতে ড. লেভিনের বাসার জ্যানিটরের কাছে যার বর্ণনা শুনেছিলাম, ইউরোপিয়ানদের মতো ফরসা চেহারা। আর এ লোকটি পোশাক-আশাক থেকে চেহারাতেও ঝামা-ইটের রং-এর বান্টু।
কথাবার্তা আর উচ্চারণে কিন্তু নির্ভুল ফ্লেমিশ।
সেই ভাষাতেই প্রথম ঢুকেই জিজ্ঞাসা করলে, খুব অবাক হয়েছেন, না ঘঁসিয়ে দাস?
তা একটু হয়েছি! যেন লজ্জার সঙ্গে স্বীকার করলাম।
কীসে অবাক হয়েছেন? আমার ঘাড়ের ওপর সচাপটে একটা হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করলেন এমপালে, এত তাড়াতাড়ি হাজির হয়েছি বলে?
না। কাঁধ থেকে তার হাতের চাপটা সরাবার যেন বৃথা চেষ্টা করে একটু অস্বস্তি দেখিয়ে বললাম, আপনাকে খোঁজার জন্য আমার যত গরজ, আপনার আমাকে। খোঁজার গরজও যে তার চেয়ে কম নয় তা জানতাম। তবে নিজেই প্রথমে দর্শন দেবেন এটা আশা করতে পারিনি, আর গায়ের রংটা আইডাহো থেকে জাঈর-এ এসেই রোদে পুড়ে এতটা পালটাবে সেটা ধারণার মধ্যে ছিল না।
