হিরের খোঁজে এমবুজি মাঈ শহরে আসিনি। এসেছি এমন একজনের খোঁজে দুনিয়ার সব হিরের চেয়ে যার দাম তখন আমার কাছে বেশি।
তার খোঁজ শুরু করেছিলাম উত্তর আমেরিকায় পৃথিবীর এক গভীরতম গিরিখাতে।
তার মানে গ্র্যান্ড ক্যানিয়নে! গৌর বিদ্যে জাহির করবার সুযোগটা ছাড়তে পারলে না।
না কানমলাও খেল তৎক্ষণাৎগ্র্যান্ড ক্যানিয়ন-এর চেয়ে অন্তত আড়াই হাজার ফুট বেশি গভীর গিরিখাত ওই আমেরিকাতেই আছে। ঘনাদা অনুকম্পাভরে জ্ঞান দিলেন, আইডাহো আর ওরিগন স্টেট যা প্রায় দুশো মাইল ধরে ভাগ করে রেখেছে সেই স্নেক নদী-ই কমপক্ষে বিশ লক্ষ বছর ধরে পাহাড় কেটে এই গিরিখাত তৈরি করেছে। নাম তার হেলস ক্যানিয়ন।
নামে হেলস ক্যানিয়ন, অর্থাৎ নরকের নালা, কাজেও তাই। তা দিয়ে স্নেক অর্থাৎ যে সাপনদী বন্যাবেগে দক্ষিণ থেকে বয়ে যায় নামের মর্যাদা সেও রেখেছে।
লিকলিকে সাপের মতো আঁকাবাঁকাই তার গতি নয়, এক-এক জায়গায় দারুণ স্রোতের বেগে সংকীর্ণ গিরিখাত তোলপাড় করা ঘূর্ণিতে জল যেন বিষের ফেনায় সাদা করে তুলে তার প্রচণ্ড ঝাপটা দিচ্ছে ছোবলের মতো।
এই দুরন্ত স্নেক দিয়ে জেট বোটে উজানে যেতে যেতে বোটের ক্যাপ্টেন ডিন ম্যাকের কাছ থেকে ড. লেভিনের কথা জানবার চেষ্টা করছিলাম।
এত জায়গা আর এত লোক থাকতে একটা প্রায় অজানা বিপজ্জনক গিরিখাতে নগণ্য একজন জেট বোটের ক্যাপ্টেনের কাছে ড. লেভিনের খোঁজ করতে আসা একটু আহামুকি মনে হতে পারে, কিন্তু খোঁজখবর নেবার আর কোথাও কিছু তখন বাকি নেই বলেই শেষ এই হতাশ চেষ্টা। ড. লেভিন সম্পূর্ণ নিরুদ্দেশ হয়ে যাবার আগে এই হেলস ক্যানিয়নেই এসেছিলেন। এসেছিলেন নাকি এখানকার গিরিখাতের একদিকের পাহাড়ের গায়ে পাঁচ হাজার বছর আগেকার কোনও অজানা আদিবাসীদের খোদাই করা সব লেখা আর ছবি দেখার জন্য।
তিনি কি তা হলে এই দুরন্ত সাপ-নদীর স্রোতে কোথাও ড়ুবে-টুবে গেছেন নাকি? যা ভয়ংকর গিরিখাত আর জলের তোড় তাতে সেরকম কিছু ঘটা অসম্ভব নয় মোটেই।
কিন্তু সেরকম কিছু যে হয়নি তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ রয়েছে। হেলস ক্যানিয়নের অভিযান থেকে ফেরার পর তাঁকে স্বচক্ষে সেখান থেকে প্লেনে উঠতে দেখেছে এমন সাক্ষীর অভাব নেই। তা ছাড়া ড, লেভিনের নিজের ল্যাবরেটরিতে রেখে যাওয়া তাঁর লেখা চিরকুটটাই যে এ সব কল্পনার বিরুদ্ধে অকাট্য প্রমাণ।
ড. লেভিন তাঁর ল্যাবরেটরিতে ঢুকলেই-চোখে-পড়ে এমন ভাবে একটা কাগজ এঁটে রেখে গিয়েছিলেন। সে কাগজে তাঁর নিজের হাতে যা লেখা তার মর্ম হল— আমি স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হচ্ছি। কেউ যেন আমার খোঁজ না করে।
কিন্তু কেউ যেন খোঁজ না করে বলে লিখে গেলেই কি ড. লেভিনের মতো মানুষের সম্বন্ধে তাঁর নিজের দেশ ও পৃথিবী হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারে! খোঁজ তাই তখন থেকেই সমানে চলছে। শুধু এত দিনের এত চেষ্টা সত্ত্বেও ধরে এগোবার মতো একটা খেই-ও কোথাও পাওয়া যায়নি।
ড. লেভিনের মতো মানুষের নিরুদ্দেশ হতে চাওয়াটাই যে অবিশ্বাস্য। জৈব রসায়নের অসামান্য গবেষক হিসেবে যাঁর নাম নোবেল প্রাইজ-এর জন্য বহু জায়গা থেকে প্রস্তাবিত হয়েছে, অত্যন্ত আদর্শবাদী ও সফল বিজ্ঞানসাধক হিসেবে যাঁর জীবনে কোনও দিকে কোনও দুঃখের কিছু নেই, তিনি হঠাৎ স্বেচ্ছায় নিরুদ্দেশ হতে যাবেন কেন? আর তা হয়ে থাকলে কোথায় বা গিয়ে লুকিয়ে থাকতে পারেন দুনিয়ার সেরা সন্ধানীদের চোখ এড়িয়ে? রহস্যটা সত্যিই যেন একেবারে আজগুবি। – আমেরিকার এফ বি আই-ও কোন কিনারা করতে পারেনি বুঝি? চোখেমুখে মুগ্ধ বিস্ময় ফুটিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
কই আর পারল! ঘনাদা একটু করুণা ফোটালেন দৃষ্টিতে।
শিবু তোয়াজটা বাড়াবার জন্য একটু উলটো গাইল, জেমস বন্ডকে তো ডাকলে পারত!
আরে তা কি আর ডাকেনি! শিশির ধমক দিল শিবুকে, তাতে কিছু হয়নি বলেই না শেষ পর্যন্ত ঘনাদার শরণ নিয়েছে! না নিয়ে যাবে কোথায়? ছাগল দিয়ে কি যব মাড়ানো চলে!
ঠিক বলেছ! শিশিরকে গলা ছেড়ে সমর্থন করবার এমন সুযোগ আর ছাড়। বললাম, কীসে আর কীসে! ধানে আর শিষে! আরে জেমস বন্ড তো সেদিনের মাতব্বর। তার জন্ম হবার অন্তত বিশ বছর আগে ঘনাদা মশা মেরে নুড়ি তুলেছেন সে হুঁশ কারও আছে!
যেতে দাও, যেতে দাও ও সব কথা! ঘনাদা উদার মহত্ত্বে নিজের প্রসঙ্গ চাপা দিলেন, ব্যাপারটা হাতে নেবার পর থেকে আমিও কোথাও ছিটেফোঁটা একটা খেইও পাইনি। হতাশ হয়ে তাই তাঁর শেষ অভিযানের জায়গা সেই হেলস ক্যানিয়নে গেছলাম হার স্বীকার করার আগে আর-একটিবার অপ্রত্যাশিত কিছু সূত্র সেখানে মেলে কি না দেখতে।
যাওয়াই পণ্ডশ্রম মনে হয়েছে। স্নেক নদী দিয়ে জেট বোটে পাড়ি দেওয়ার উত্তেজনা মিলেছে যথেষ্ট, কিন্তু আসল লাভ কিছুই হয়নি। জেট বোটের ক্যাপ্টেন ডিন ম্যাকেকে নানারকমে জেরা করেও কোনও ফল না পেয়ে নিজের বুদ্ধির ওপরই অবিশ্বাস এসেছে। মনে হয়েছে আমার এ চেষ্টাটাই পাগলামি। এত দিকের এত রকম সন্ধানে যে রহস্যের এতটুকু কিনারা হয়নি, তার খেই মিলবে ডা. লেভিনের মোটমাট একদিনের একটা বোটের পাড়িতে?
তাই কিন্তু মিলেছে আশাতীতভাবে অকস্মাৎ।
গিরিখাতের ধারের পাহাড়ের গায়ে পাঁচ হাজার বছর আগেকার লুপ্ত কোনও জাতির খোদাই-এর কাজ দেখাতে দেখাতে ম্যাকে হঠাৎ বলেছে, আপনাদের ডা. লেভিন কিন্তু একটু খ্যাপাটে ছিলেন।
