তাও তো বটে। তাও তো বটে! দুর্বাসা ঠাকুরই এবার ব্যতিব্যস্ত, আমি আবার অভিশাপটা ভুল করে দিয়ে ফেলে খাওয়াটাই নষ্ট করে দিয়েছি। তা তোমরা—
দুর্বাসা আমাদের দিকে ফিরলেন। ফেরার অবশ্য দরকার ছিল না। ঘনাদার মুখের খেদটুকু শেষ হতে না হতে শিশির-শিবু দুজনেই ছুটে নেমে গেছে নীচে।
দুর্বাসা যখন মুখ ফেরালেন তখন দুজনেই ফিরে দরজা পেরিয়ে ঘরের ভেতরে এসে হাজির দুটি প্রমাণ সাইজের প্লেট হাতে নিয়ে।
তার একটা ঘনাদার আর অন্যটি দুর্বাসার হাতে দিতে দুর্বাসাই অত্যন্ত বিব্রত। আমি মানে-আমি প্লেটটার জোড়া ফিশরোলের দিকে চেয়ে তাঁর যেন করুণ আর্তনাদ—আমি তো কী বলে—
তা দুর্বাসার আর্তনাদ নেহাতই অকারণ নয়। মাথার জটা ছাড়া দাড়ি গোঁফের যা জঙ্গল তিনি মুখে গজিয়েছেন তার ভেতর দিয়ে কিছু চালান করাই তো সমস্যা।
ঘনাদা নিজের প্লেটটির প্রতি যথাবিহিত মনোযোগ দিতে দিতেই আমাদের সেজন্যে ভর্ৎসনা করলেন, কী তোমাদের আক্কেল! ওঁকে ওই সব খাবার দিয়ে অপমান করছ!
অপমান! আমরা সত্যিই সন্ত্রস্ত—অপমান কী করলাম?
অপমান নয়? ঘনাদা বেশ ধীরে সস্তে তাঁর ফিশরোল দটির সদগতি করে চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বললেন, ওঁকে কিছু খেতে বলাই তো অপমান। তোমার আমার মতো গাণ্ডেপিণ্ডে খেলে ওঁর এমন যোগশক্তি হয়, না ওই জটাজুটের ভার উনি বইতে পারেন? যিনি স্রেফ হাওয়ার সঙ্গে হয়তো দু-ফোঁটার বেশি জল মেশান না, তাঁকে দিয়েছ কিনা ফিশরোল! ছি ছি তোমাদের লজ্জা হওয়া উচিত।
আমাদের লজ্জা থেকে বাঁচাতে ঘনাদা এখন চায়ের পেয়ালা রেখে দুর্বাসা দ্য সেকেন্ডের কাছেই গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন। অত্যন্ত সম্রমের সঙ্গে ফিশরোলের প্লেটটা দুর্বাসার কোল থেকে সরিয়ে নিজের আসনে এসে বসতে বসতে বললেন, চোখের ওপর জিনিসটা নষ্ট হতে দিতে খারাপ লাগে—তাই, নইলে ওঁর সামনে কিছু মুখে দিতেই সংকোচ হয়।
ঘনাদার ডান হাতের কাজ তখন আবার শুরু হয়ে গেছে। তা দেখে আমরা যদি অবাক হওয়ার সঙ্গে একটু মজা পেয়ে থাকি, আমাদের দুর্বাসা ঠাকুরের চেহারাটা যেন হতভম্ব হওয়ার চেয়ে বেশি কিছু মনে হল। দাড়ি গোঁফের অরণ্যের ভেতর দিয়ে তাঁর দুচোখের দৃষ্টির প্রায় জ্বলন্ত ভাবটাও খেতে দেওয়ার অপমান থেকে বাঁচাবার জন্য ঘনাদার প্রতি কৃতজ্ঞতা কি না ঠিক বোঝা গেল না।
ঘনাদা ইতিমধ্যে অবশ্য আমাদের সকলের হয়ে তাঁর প্রায়শ্চিত্তটা সেরে ফেলে পেয়ালায় নতুন করে চা ঢেলেছেন। শিশিরও তার যথাকৰ্তব্য ভোলেনি।
শিশিরের এগিয়ে ও জ্বালিয়ে দেওয়া সে সিগারেট থেকে বার করা ধোঁয়ার বহর দেখে একটু ভরসা পেয়ে কেমন করে আবার আসল কথাটা তুলব ভাবছি, এমন সময় ঘনাদা নিজে থেকেই সদয় হলেন।
আমাদের যোগীবর দুর্বাসার কাছ থেকেই যেন অনুমতি চেয়ে বললেন, পেটের কথা চেপে রাখতে নেই বলছিলেন না! আপনার উপদেশই মানতে চাই। শুধু ভাবছি এ সব বিশ্রী কথা আপনার সামনে বলা কি ঠিক হবে?
খুব হবে! খুব হবে! দুর্বাসার হয়ে আমরা এবার সমস্বরে উৎসাহ দিলাম।
আমাদের উৎসাহটুকুর জন্যই ঘনাদা যেন অপেক্ষা করছিলেন।
এর পর আর তাঁকে উসকে দেবার দরকার হল না। নিজের স্টিমেই বলে চললেন, আসল কথা কী, জানো? ওঁকে মালাঞ্জা এমপালে ভাবার জন্যই এখন লজ্জা হচ্ছে। কোথায় উনি আর কোথায় সেই শয়তানের শিরোমণি। চেহারায় মিল আছে ঠিকই। মালাঞ্জা অবশ্য আরও ফরসা ছিল, আরও মোটাসোটা জোয়ান চেহারার। তবে ওঁকে দেখে ভেবেছিলাম নিজের শয়তানির সাজাতেই বুঝি মালাঞ্জা এমন শুটকো মর্কট মার্কা হয়ে গেছে।
ঘনাদা গলা খাঁকরি দেবার জন্য একটু থামলেন। আমাদের তখন যোগীবর দুর্বাসার দিকে একবার তাকাবারও সাহস নেই।
মালাঞ্জার ম্যাজিকও ছিল উঁচু দরের, ঘনাদা আবার শুরু করে আমাদের যেন বাঁচালেন, প্রথমে ম্যাজিক দেখিয়েই সে আমায় মোহিত করে। একটা মানুষের খোঁজে প্রায় অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে তখন এমবুজি মাঈ শহরে এসে কদিনের জন্য আছি। এমবুজি মাঈ শহর হিসেবে এমন কিছুই নয়, কিন্তু সেখান থেকে মাসে দুবার নিতান্ত ছোট দু এঞ্জিনের এমন একটা প্লেন ছাড়ে যা হুমকি দিয়ে একবার হাইজ্যাক করতে পারলে, মঙ্গলগ্রহে না হোক, চাঁদে অমন পাঁচটা রকেট নামানোর খরচ উঠে যায়! ঘনাদা দুর্বাসাকে সবিনয়ে জিজ্ঞাসা করলেন হঠাৎ। এমবুজি মাঈ-এর কথা আপনি তো সবই জানেন!
আমি…মানে…আমি—দুর্বাসার অবস্থা যেন একটু কাহিল বলে মনে হল।
আপনার তত সশরীরে যাবারও দরকার নেই। ঘনাদা ভক্তিভরে বললেন, যোগবলেই সব জানতে পারেন। তার সময় পাননি বুঝি? আমিই তা হলে বলে দিই, এমবুজি মাঈ আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তের এক রাজ্যের এমন এক শহর যার চারিধারের মাটি আঁচড়ালেও হিরে পাওয়া যায়। পৃথিবীতে শখ করে পরবার দামি হিরের অন্য অনেক বড় খনি আছে, কিন্তু যা দিয়ে সত্যিকার কাজ হয় শিল্পের দিক দিয়ে সে রকম দামি হিরের অদ্বিতীয় আকর হল ওই এমবুজি মাঈ শহরের চারদিকে কাসাই প্রদেশের লাল মাটি।
সেখানে একটি মাত্র সরকারি কোম্পানি মিবাই হিরে তোলবার অধিকারী। তারা প্রতিদিন যে পরিমাণ হিরে তোলে তার দাম কম পক্ষে দশ লক্ষ টাকা।
এ এমবুজি মাঈ শহর আর কাসাই প্রদেশ হল জানতি পারো নার জ-দেওয়া জাঈর রাজ্যের অংশ। এ জাঈর রাজ্যের আগের নাম ছিল কঙ্গো। ১৯৬০ সালে এ রাজ্য স্বাধীন হবার পর নাম বদলে জাঈর রাখা হয়।
