ঘনাদার দিকে একবার চেয়ে তাঁর অবস্থাটাও বুঝে নিতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তার আর ফুরসত মিলল না।
আধা-সন্ন্যাসী আগন্তুকের বজ্রস্বর আবার শোনা গেল আর সেই সঙ্গে আর-এক ভোজবাজি!
যে লোভে অতিথির অমর্যাদা করেছ, দুর্বাসার আধুনিক সংস্করণ তখন গর্জন করছেন, সেই লোভের গ্রাসেই তা হলে ছাই পড়ুক!
এই অভিশাপবাণী মুখ থেকে খসতে না খসতে ঘনাদার নাকের সামনে ঝুলন্ত ফিশরোল যেন লাফ দিয়ে ছাদে গিয়ে ঠেকে ছত্রাকার হয়ে খুঁড়িয়ে পড়ল চারদিকে।
আমরা তখন হাঁ হাঁ করে সবাই দাঁড়িয়ে উঠেছি।
আমাদের শোক তখন ছাদে ঠেকে ছত্রাকার ফিশরোলের জন্য নয়। আমাদের সব উদ্বেগ ঘনাদার মুখের দিকে চেয়ে।
ব্যাপারটা কেমন মাত্রাছাড়া হয়ে গেল কি?
কী করবেন এবার ঘনাদা?
এসপার ওসপার একটা কিছু করে ফেলবেন নাকি? আরাম-কেদারা ছেড়ে উঠেই চলে যাবেন নাকি গটগটিয়ে তাঁর টঙের ঘরে? না, দুর্বাসার নতুন এডিশনকে পালটা গর্জন শুনিয়ে ছাড়বেন?
ভুল, সব অনুমান আমাদের ভুল।
ঘনাদাকে অত সহজে যদি চেনা যেত তা হলে আমরা এমন কৃতাঞ্জলি হয়ে তাঁর কাছে নাড়া বেঁধে থাকি!
দ্বিতীয় দুর্বাসার প্রতি গর্জন বা নিজের টঙের ঘরে সটান প্রস্থান, কিছুই করলেন না ঘনাদা।
তার বদলে আমাদের সকলকে একেবারে থ করে নিজে থেকেই দাঁড়িয়ে উঠে ঘনাদার সে কী বিনয়ের ভঙ্গি!
ননুক্রিয়াতামাসনপরিগ্রহঃ। অবহিতোহস্মি!
কিন্তু এ সব আবোলতাবোল বলছেন কী ঘনাদা! হঠাৎ নাকের ডগা থেকে ফিশরোল উধাও হয়ে গেছে বলে মাথাটাই বিগড়ে গেল নাকি!
আমরা যখন ভ্যাবাচাকা মেরে দাঁড়িয়ে, ঘনাদা তারই মধ্যে নিজের কেদারাই ঠেলে দিয়েছেন দু নম্বর দুর্বাসার দিকে।
দুর্বাসা ঠাকুরও কি একটু দিশাহারা!
তাঁর দাড়ি গোঁফের জঙ্গল ভেদ করে ভাবটা ঠিক বোঝা গেল না। তবে ঘনাদার বিনয়েই বোধহয় রাগটা তখন তাঁর প্রায় জল হয়ে গেছে মনে হল। ঘনাদার এগিয়ে দেওয়া কেদারাটা না নিয়ে তিনি নিজেই কোণ থেকে আর-একটা চেয়ার টেনে বসে একটু প্রসন্ন কণ্ঠেই বললেন, যাক আমি প্রীত হয়েছি তোমার বিনয়ে আর দেবভাষার প্রয়োগে! আমার ক্রোধ আমি সংবরণ করলাম।
আমাদের ভাগ্য ভাল যে যত খটমটই হোক, দ্বিতীয় দুর্বাসার কথাটা এবার বাংলা বলেই বুঝলাম। কিন্তু দেবভাষার কথা কী বললেন উনি।
দেবভাষা মানে তো সংস্কৃত। আবোলতাবোল নয়, ঘনাদা তা হলে সংস্কৃতই বলেছেন জবাবে!
এবার দুর্বাসা দ্য সেকেন্ডের সঙ্গে আলাপে তিনি যদি সেই সংস্কৃত চালান তা হলেই তো গেছি!
না। সে বিপদটা কলির দুর্বাসার একটা চালের দরুনই কাটল বলা যায়। দুর্বাসা ঠাকুর শুধু ক্রোধ সংবরণ করেই তখন ক্ষান্ত হলেন না, সেই সঙ্গে ক্ষমায় উদার হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, তোমাদের মধ্যে ঘনশ্যাম কার নাম?
প্রশ্নটা শুনেই চমকে উঠেছিলাম। যত উদার ভাবেই করা হোক, চালটা নেহাত কাঁচা হয়ে গেল না? বাহাত্তর নম্বরে ঢুকে ঘনশ্যাম কার নাম ঘনাদাকেই জিজ্ঞাসা করা!
এই এক বেয়াড়া প্রশ্নেই অন্যদিন হলে তো সব বানচাল হয়ে যেত।
আজ কিন্তু যাকে বলে অঘটন ঘটার দিন। শুধু ফিশরোল-এর বেলা নয়, সব কিছুতেই যেন ভোজবাজি হয়ে যাচ্ছে! কাঁচা চালেই কাজ হয়ে গেল।
অমন একটা প্রশ্নেও ঘনাদা চটলেন না, বরং বিনয়ে গলে গিয়ে সংস্কৃত থেকে সরল না হোক, কাঁকরবালি সমেত অন্তত বোধগম্য বাংলায় নেমে এলেন।
আজ্ঞে, অধীনের নামই ঘনশ্যাম! ঘনাদার মুখে লজ্জিত স্বীকৃতি শুনে আমরাই তাজ্জব, আপনার প্রতি অমনোযোগের অপরাধে মার্জনা ভিক্ষা করছি। সত্যিই আপনাকে প্রথমে চিনতে পারিনি।
প্রথমে চিনতে পারোনি! দুর্বাসা ঠাকুরের গলা যেন একটু কাঁপা, এখন পেরেছ নাকি?
না। কুণ্ঠিতভাবে জানালেন ঘনাদা, তবে গোড়ায় আপনাকে সেই মালাঞ্জা এমপালে বলে ভুল করেছিলাম।
মা-লা-ঞ্জা এম-পা-লে! দুর্বাসা মুনির গলার স্বরটা এবার দাড়ি গোঁফের জঙ্গলেই যেন প্রায় চাপা পড়ে গেল, আমাকে ওই—ওই—তাই ভেবেছিলে!
আজ্ঞে হ্যাঁ, ঘনাদা নিজের ভুলের জন্য যেন অত্যন্ত অনুতপ্ত হয়ে বললেন, সেই যে সাংকুর নদীর ধারে এমবুজি মাঈ থেকে চোরাই হিরে পাচার করার জন্য আমায় ম্যাজিকের ধোঁকা দিয়ে এপুলু-তে নিয়ে গিয়ে মিথ্যে খবরে ইতুরি-র গহন বনে পাঠিয়ে জংলিদের ঝোলানো ফাঁদে ফাঁসিতে লটকে মারবার চেষ্টা করেছিল, আর যার মতলব হাসিল হলে পৃথিবী আরও বিরাট হয়ে দুনিয়ার কী দশা হত জানি না, সেই মালাঞ্জা এমপালে ভেবেই আপনাকে একটু তাচ্ছিল্য করেছিলাম গোড়ায়। তবে— অত্যন্ত বিশ্রী কষ্টকর স্মৃতি মনে না আনবার জন্যই ঘনাদা যেন চেপে গিয়ে দুঃখের নিশ্বাস ফেলে বললেন, থাক সে কথা!
থাকবে মানে! আমরা অস্থির হয়ে উঠলাম। বলেন কী ঘনাদা! চোরাই হিরে ম্যাজিকে পাচার করার ব্যাপারে ইতুরি না ফিতুরির জঙ্গলে ঘনাদা-ঝোলানো-ফাঁস থেকে ফাঁসি যেতে যেতে বাঁচলেন, আর দুনিয়া তাতে আরও বিরাট হতে না পেরে কী দশা থেকে বাঁচল কেউ জানে না—এতদূর শুনে আমরা ঘনাদাকে থাক বলে থামতে দেব! কিন্তু আমাদের মুখ খুলতে হল না।
না, না, থাকবে কেন?আমাদের আগে দুর্বাসাই নাছোড়বান্দা হলেন, মনে যখন হয়েছে তখন বলেই ফেলল। বদখত কিছু হলে সে স্মৃতি পেটে রাখতে নেই, বুঝেছ। কিনা? তাতে আবার বদহজম হয়।
না, বদহজম আর কী হবে? ঘনাদা একটু যেন হতাশ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, পেটেই যখন কিছু পড়েনি।
