না, ঘনাদাকে বাহাত্তর নম্বর ছাড়তে হয়নি। তার বদলে ধনু চৌধুরি দুদিন বাদে পাওনা-টাওনা চুকিয়ে হঠাৎ বিদেয় নিয়ে গিয়েছে।
ধনুর্ভঙ্গটা সুতরাং ঘনাদার-ই।
পৃথিবী বাড়ল না কেন
চিত্রার্পিত কথাটা সবাই নিশ্চয়ই জানে।
আমি জানতাম না।
অন্তত অমন চাক্ষুষভাবে মানেটা বোঝবার সুযোগ কখনও পাইনি।
সেদিন পেলাম।
সেদিন মানে, শুভ ২৪ আষাঢ়, খ্রিস্টাব্দ ৯ জুলাই অ ২৪ আহাব মুং ১৫ জম-য়ল, প্রতিপদ দং ২৫।৩৬।০ ঘ ৩।১৪।৪৯ উত্তরাষাঢ়া নক্ষত্র দং ৪৮।৩০।৫৬ রাত্রি ঘ ১২।২৪।৪৭ ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
তারিখটা তো বুঝলাম, কিন্তু সালটা কী কেউ যদি জিজ্ঞাসা করেন তা হলে বলব পাঁজি দেখে নিন।
আর মানে জানতে চাইলে অকপটে সত্য কথাটা স্বীকার করব।
মানে আমি কিছুই জানি না এবং বুঝিনি।
শুধু দিনটা পার হয়ে যাবার পর তার আশ্চর্য কাণ্ডকারখানার কারণ কিছু কোথাও পাওয়া যায় কি না খোঁজার চেষ্টায় পাঁজি খুলে ওই সব বুকনি পেয়ে মাথাটা আরও গুলিয়ে গিয়েছিল।
দিনটা সত্যিই অদ্ভুত।
অমন যে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের দোতলার আড্ডাঘর—সেখানেও অমন কাণ্ড বুঝি কখনও হয়নি।
সে কাণ্ড বর্ণনা করতে গেলে প্রথমে ওই চিত্রার্পিত দিয়েই শুরু করতে হয়।
হ্যাঁ, আমরা সবাই চিত্রার্পিত।
আমরা মানে আমি,শিবু, শিশির, গৌর তো বটেই, তাঁর মৌরসি আরামকেদারায় স্বয়ং ঘনাদাও তাই।
সবাই মিলে যেন নড়নচড়ন-হীন একটা আঁকা ছবি।
ছবিটা আবার সহজ স্বাভাবিক নয়। যেন একটা সচিত্র রহস্যগল্পের পাতা খুলে বার করা।
রহস্যটাও যে সাধারণ নয় তা ঘনাদা আর আমাদের সকলের চোখমুখের ভাব থেকেই বোঝবার। আমরা সবাই যেন ভূত দেখেছি।
ঘনাদার চেহারাটাই সবচেয়ে দেখবার মতো। চোখগুলো যেন কোটর থেকে ঠেলে বেরিয়ে আসবার জোগাড়। আর মুখটা একেবারে হাঁ।
তা চোখমুখের আর অপরাধ কী?
ব্যাপার যা ঘটেছে তাতে আর কেউ হলে খানিকটা বেহুশ হলেও বলার কিছু থাকত না। ঘনাদা বলেই তাই শুধু চোখদুটো ছানাবড়ার বেশি আর কিছু করেননি।
ধানাই পানাই একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে মনে করে যদি কেউ ধৈর্য হারিয়ে থাকেন। তা হলে ব্যাখ্যাটা আর চেপে রাখা নিরাপদ হবে না। সবিস্তারে খুলেই বলা যাক। ঘটনাটা।
শুক্রবারের সন্ধ্যা, নীচের হেঁশেলে রামভুজ রাতের জন্য স্পেশাল মেনুর আয়োজনে ব্যস্ত। বনোয়ারিকে যখন দেখা যাচ্ছে না তখন সেও সেই বড় ধান্দায় নিশ্চয় কোথাও প্রেরিত হয়েছে ধরে নিতে হবে।
সন্ধের আসর ইতিমধ্যে জমে ওঠবার লক্ষণ দেখা দিয়েছে। রাত্রের স্পেশাল মেনু আগাগোড়া ঘনাদার নির্দেশ মাফিকই তৈরি হয়েছে। ঘনাদা তাই প্রসন্ন মনে একটু আগে আগেই আমাদের আড্ডাঘরে এসে তাঁর মৌরসি কেদারা দখল করেছেন। আমরাও হাজিরা দিতে দেরি করিনি।
আসল নাটকের যবনিকা ওঠবার আগে যেমন সামান্য একটু অর্কেস্ট্রা-বাদন তেমনই রাতের ভুরিভোজের ভূমিকা হিসাবে কিছু টুকিটাকির ব্যবস্থা হয়েছে।
বনোয়ারি অনুপস্থিত। তাই আমরা নিজেরাই পরিবেশনের ভার নিয়েছি। কাঁথামুড়ি-টি-পটের সঙ্গে পেয়ালা-টেয়ালা ইত্যাদি সাজ-সরঞ্জাম সমেত ট্রে-টা শিশির নিজেই নিয়ে এসেছে বয়ে। ট্রের ওপর এখনওনা-খোলা চোখ জুড়োনো সিগারেটের টিনটা সাজিয়ে আনতেও ভোলেনি।
শিশির তার ট্রে-টা একটা টিপয়ে রাখতে-না-রাখতে আমি আর-একটা ট্রে নিয়ে এসে হাজির হয়েছি। সিগারেটের টিনটা না আমার ট্রের প্লেটগুলোর দিকে চোখ দেবেন ঠিক করতে না পেরে, ঘনাদার তখন প্রায় ট্যারা হবার অবস্থা।
আমি আমার ট্রে থেকে জোড়া ফিশরোলের প্লেটটা তাঁর হাতে তুলে দিয়ে সে সংকট কিছুটা মোচন করেছি।
তারপর আমরা নিজেরাও এক একটা প্লেট নিয়ে যথাস্থানে বসবার পর বর-টর দেবার আগে দেবতাদের মতো একটা প্রসন্ন হাসি মুখে মাখিয়ে ঘনাদা তাঁর প্লেট থেকে একটি ফিশরোল সবে তুলতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে
এমন সময়েই সেই তাজ্জব কাণ্ড!
হঠাৎ যেন বাইরের বারান্দায় শুনলাম—অয়মহম্ ভোঃ!
তারপরের মুহূর্তেই তিষ্ঠ শুনে মুখ ফেরবার আগেই ঘনাদার দিকে চেয়ে চক্ষুস্থির।
ঘনাদার প্লেটের ফিশরোল তাঁর হাতে নেই, মুখে নেই, তাঁর ঠিক নাকের ওপরে ঝুলছে!
এমন ব্যাপারে একেবারে চক্ষু চড়কগাছ হয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য যা হলাম তাকে চিত্রার্পিত বলে বর্ণনা করা খুব ভুল হয় কি!
এ ঝুলন্ত ফিশরোলের ধাক্কা সামলাতে না সামলাতে আসরঘরের মধ্যে এক নাটকীয় প্রবেশে আমাদের চটকা ভাঙল।
ঘরের মধ্যে যিনি তখন এসে দাঁড়িয়েছেন, তাঁকে বর্ণনা করব কেমন করে সেইটাই ভেবে পাচ্ছি না।
জটাজুটধারী বলে শুরু করে ওখানেই থামতে হয়। তারপর সন্ন্যাসী আর বলা চলে না। কারণ মাথায় বোটানিকসের বটের ঝুরির মতো জটা আর মুখে একমুখ গোঁফ দাড়ির কঙ্গো থুড়ি জাঈর-এর জঙ্গল থাকলেও তারপর কৌপিন বাঘছাল কমণ্ডলু চিমটে-টিমটে কিছু নেই। নেহাত সাধারণ পাঞ্জাবি পাজামা। তবে ছোপটা একটু অবশ্য গেরুয়া।
এ হেন মূর্তি ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত তুলে যেন ঘনাদাকেই বিশেষভাবে নির্দেশ করে বজ্রস্বরে ভর্ৎসনা করলেন, লজ্জা করে না তোমাদের! অতিথি যখন দ্বারে সমাগত তখন তাঁর পরিচর্যার ব্যবস্থা না করে নিজেদের ভোজনবিলাসে মত্ত হয়েছ?
কথাগুলোয় সংস্কৃতের ঝংকার থাকলেও এবার ভাষাটা মোটামুটি বাংলা। কিন্তু বাংলা বা সংস্কৃত যা-ই হোক ওই ভসনায় আমাদের অবস্থাটা খুব সুবিধের হবার তো কথা নয়।
