ওই আজেবাজে জিনিস!
শিশির অপরাধীর মতো সভয়ে প্লেটটা ঘনাদার মুখের কাছে থেকে সরিয়ে নিয়ে প্রায় গলবস্ত্র হয়ে বললে, মাপ করবেন, ঘনাদা। এ সব যে আপনার বারণ তা বনোয়ারি আর কী করে জানবে।
হুঁ! ঘনাদার নয় যেন একটা সদ্য জাগা আগ্নেয়গিরির ভেতরের গোমরানি শোনা গেল।
ঘনাদা তখন আরামকেদারা ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে মূর্তিমান প্রভুভক্ত শ্রীমান ধনু চৌধুরির প্রবেশ।
কিন্তু কই? যা ভেবে রেখেছিলাম তা হল কোথায়? আমাদের অত তোড়জোড়ই তো মিথ্যে! আগ্নেয়গিরির গুরুগুরু ধ্বনিই শুনলাম, ফেটে আগুনের হলকা আর ছুটল না!
ধনু চৌধুরি অক্ষত শরীরে আড্ডাঘরের ভেতরে দাঁড়িয়ে আমাদের প্লেটগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে যেন শিউরে উঠল।
এইসব আপনারা দাসবাবুকে খাওয়ালেন? ধনু চৌধুরি বুঝি কেঁদেই ফেলে।
আমাদের কিছু বলতে হল না। আমাদের হয়ে ধনু চৌধুরির দাসবাবুই জবাব দিলে, না। কেমন করে খাওয়াবে? তুমি না বারণ করে গেছ!
এ কি ঘনাদার গলা! আমাদেরই দুবার তাঁর দিকে তাকাতে হল। একসঙ্গে স্নেহ, প্রশংসা আর কৃতজ্ঞতা উথলে-ওঠা এমন গলা তো আমাদের শোনার ভাগ্য কখনও হয়নি।
ধনু চৌধুরি তখন কৃতার্থ হয়ে সলজ্জ একটু হাসি হাসছে, আজ্ঞে আপনার জন্য যেটুকু পারি না করলে এখানে আছি কেন?
হ্যাঁ, তাই তো দুঃখ হচ্ছে আরও বেশি! ঘনাদা একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আবার তাঁর কেদারায় গা ঢাললেন, তোমার মতো মানুষের দেখা যখন পেলাম তখনই আবার ডেরা তুলতে হবে।
ডেরা তুলতে হবে! শুনেই আমাদের হাত-পা ঠাণ্ডা। কঠিন চিকিচ্ছে করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হল নাকি? আগাছা নিড়োতে ফসলই সাবাড় করলাম!
ডেরা তোলার কথা কী বললেন যেন? নেহাত সহজভাবে হালকা সুরে বলার ভান করলাম। কিন্তু গলার কাঁপুনি যাবে কোথায়?
কিন্তু কাকে কী বলছি! আমরা যে ঘরে আছি তা-ই যেন ভুলে গিয়ে ঘনাদা তখন তাঁর ভক্ত প্রবরকে নিয়ে ব্যস্ত।
উদাস সুরে তাকে জানালেন, এখানে থেকে তোমাদের বিপদ বাধাতে তো আর পারি না!
কেন? আমাদের বিপদ কেন? এবার ধনু চৌধুরি উদ্বিগ্ন। কেন এখনও বুঝতে পারোনি? ঘনাদা যেন একটু ক্ষুণ্ণ হয়ে বললেন, সেদিন আমার ছাদে গিয়ে কী পেয়েছিলে?
ছাদে পেয়েছিলাম? ধনু প্রথমটা একটু ভাবিত।
দেশলাইয়ের বাকস! ধনুর স্মরণশক্তি একটু উসকে দিতে হল।
হ্যাঁ হ্যাঁ, দেশলাইয়ের একটা খালি বাকস! ধনু সবিস্ময়ে জানালে, সে তো আপনাকে দেখালাম।
হ্যাঁ, দেখিয়েছ, ঘনাদা দুঃখের সঙ্গে বললেন, শুধু খালি বাকসটা। তার ভেতর কী ছিল তা তো জানো না।
ভেতরে মানেধনু একটু হতভম্ব–ছিল তো দেশলাইয়ের কাঠি।
হুঁ—ঘনাদা তাঁর পেটেন্ট নাসিকা ধ্বনি করলেন-এক হিসেবে দেশলাইয়ের কাঠিই বটে, তবে সাক্ষাৎ শমনের হাতে তৈরি। মাপে আধ ইঞ্চিও হবে না, কিন্তু একটু ছোঁয়ালে নখের ডগা থেকে ব্রহ্মর পর্যন্ত জ্বলে যাবে।
হাওয়া বুঝে আমরা বোবা হয়ে থাকাই উচিত বুঝেছি। ধনু চৌধুরিই সভয়ে জিজ্ঞাসা করলে, কী ছিল তা হলে ও বাকসে?
লক্সোসেলেস রেকলুস! ঘনাদা তাঁর খুদে বোমাটি ছাড়লেন।
আমাদের মতো ঘাগীরাই এবার কাত। ধনু চৌধুরির অবস্থা আরও কাহিল। সামলে উঠবার আগেই ঘনাদা আবার জিজ্ঞাসা করলেন বেশ উদ্বিগ্ন হয়ে, এ ক-দিনের মধ্যে কোথাও কিছু কামড়ায়-টামড়ায়নি তো?
এ ক-দিনে? ধনুর মুখ প্রায় ফ্যাকাশে—না, কামড়াবে আবার কী! ওই কালো একটা বিষ পিঁপড়ে—
বিষ পিঁপড়ে! ধনুর মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ঘনাদা প্রথমটা অস্থির হয়ে উঠলেন। বিষ পিঁপড়ে—ঠিক দেখেছ তো, ভুল হয়নি তো কিছু?
না, ভুল কেন হবে! ধনু এবার দিশাহারা—বিষ পিঁপড়েই তো দেখলাম।
হ্যাঁ, বিষ পিঁপড়েই হবে। ঘনাদা এতক্ষণে ভেবেচিন্তে আশ্বস্ত হলেন, তা না। হলে এতক্ষণে আর দেখতে হত না। জ্বর, বমি, পেটের অসহ্য কামড় তো শুরু হয়ে যেতই। তারপর কামড়ের জায়গায় ঘা থেকে গ্যাংগ্রিন হতেই বা কতক্ষণ। হয় একেবারে কেটে বাদ, কি চামড়া বদল ছাড়া সারাবার কোনও উপায় নেই।
এ সব হত ওই আপনার কী বললেন—লকলকে কীসের কামড়ে? ধনু চৌধুরির গলায় দু আনা অবিশ্বাসের সঙ্গে চোদ্দো আনা আতঙ্ক।
লকলকে কী নয়, লক্সোসেলেস রেকলুস। ঘনাদা এবার ব্যাখ্যা করলেন, নেহাত খুদে একরকম মাকড়সা, মাপে আধ ইঞ্চি, কিন্তু বিষ একেবারে সর্বনাশা, আলোয় দেখা দেয় না। কোণে-কানাচে, কাপড়-জামার ভাঁজে ছায়া-ছায়ায় লুকিয়ে থাকে। সহজে ধরাও যায় না।
কিন্তু আমাদের দেশে তো এমন মাকড়সা নেই। এ সর্বনাশা তা হলে আসবে কোথা থেকে? ধনু চৌধুরির শেষ আশার কুটো ধরবার চেষ্টা।
আসবে ওই দেশলাইয়ের বাকসে আর পাঠাবে টেকসাস-এর সেই লুই মার্ডেন, যাকে শয়তানির জন্য একবার আড়ংযোলাই দিয়েছিলাম। মনে পড়ছে মার্ডেনের কথা?
শেষ প্রশ্নটা আমাদের প্রতি। ঘনাদার কৃপাদৃষ্টি আমাদের দিকে পড়া মাত্র কী চটপট যে আমাদের স্মরণশক্তি সাফ হয়ে গেল! গৌরই আমাদের হয়ে তার লক্ষ্মণের ফল ধরে রাখার মতো না-ছোঁয়া পুরো প্লেটটা ঘনাদার দিকে যেন তুলে বাড়িয়ে দিয়ে উৎসাহে মুখর হয়ে উঠল, মার্ডেনের কথা আর মনে নেই। সেই যে আপনার কাছে প্রায় কীচক বধ হয়ে যে প্রতিজ্ঞা করেছিল একদিন আপনাকে দেখে নেবেই। সে-ই তা হলে এতদিন বাদে ঠিকানা পেয়ে এই শোধ নেবার ব্যবস্থা করেছে?
হ্যাঁ, ঘনাদা অন্যমনস্কভাবে চিংড়ির কাটলেটে কামড় দিয়ে ফেলে হতাশভাবে বললেন, তাই এ ডেরা আমায় ছাড়তেই হবে। একটা দেশলাইয়ের বাকস পাঠিয়ে সে তো আর থামবে না। এরপর কিলবিল করবে এ বাড়িতে লক্সোসেলেস রেকলুস! সে বিপদে তোমাদের কী বলে ফেলব! এখনও তোমরা কিন্তু সাবধানে থাকবে। খুদে শয়তানগুলো কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে!
