যা তা খাওয়ার ভাবনায়, শরীরটায় কেমন যেন জুত পাচ্ছেন না বলে ঘনাদা তাঁর টঙের চলে গেছেন তাড়াতাড়ি।
ধনু চৌধুরিকে তখনকার মতো একা পাবার সুযোগও আমাদের হয়নি। শরীর খারাপ শুনে ব্যস্ত হয়ে সে তার দাসবাবুকে উপরে তুলে দিতে সঙ্গে গিয়েছে।
ওই দিয়েই কলির শুরু। তারপর ধনু চৌধুরির আদিখ্যেতায় বাহাত্তর নম্বর আমাদের কাছে বনবাস হয়ে উঠেছে।
এত বড় ভক্ত গরুড়পক্ষী ঘনাদার ছিল কে আর জানত! ঘনাদার তোয়াজ-তদ্বির ছাড়া ধনু চৌধুরীর আর কোনও চিন্তাই নেই।
খেতে বসেছি এক সঙ্গে সবাই রাত্তিরে। বাপি দত্ত ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে শুক্রবারের বদলে শনিবার রাত্রের খ্যাঁটটাই একটু এলাহি হয়।
রামভুজ হয়তো পারশে ঝালের সবচেয়ে ডাগর মাছটা ঘনাদার পাতে দিতে যাচ্ছে, হঠাৎ চমকে রামভুজের হাত থেকে মাছের গামলাটাই প্রায় পড়ে পড়ে।
চমকে উঠি আমরাও। ঘনাদাও বাদ যান না।
আমাদের চমকিত সকলের দৃষ্টিই গিয়ে পড়ে অবশ্য একই জায়গায়। সেখানে ধনু চৌধুরি হঠাৎ সন্ত্রস্ত হয়ে হাঁ-হাঁ করে উঠেছে, আরে করছ কী, ঠাকুর! ওই বড় মাছটা দাসবাবুকে দিচ্ছ?
হতভুদ্ধি রামভূজ, হতভম্ব আমরা, আর স্বয়ং ঘনাদাও কেমন ভ্যাবাচাকা। বলে কী ধনু চৌধুরী? সবচেয়ে বড় মাছটা ঘনাদাকে দেওয়া হচ্ছে বলে আপত্তি?
রামভুজ হাতের গামলার সঙ্গে নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বলে, হাঁ, এই সবসে বড়াঠোই তো বড়বাবুকে লিয়ে রাখিয়েছি। ইসমে ডিমভি আছে?
ওই ডিম আছে বলেই তো ভাবনা। ধনু চৌধুরি তার বীরপূজার সঙ্গে বিচক্ষণতার পরাকাষ্ঠা দেখায়, ডিম থাকলেই মাছ আগে নষ্ট হয় কিনা! তাই বলছি ও মাছটা দাস বাবুকে না-ই দিলে। হাজার হোক, সকালের মাছ তো।
আচ্ছা, জো হুকুম আপনাদের! রামভুজ নিতান্ত অনিচ্ছায় পুরো দেড় বিঘত মাপের পারশে কুলতিলকটিকে আবার গামলায় রাখতে যায়।
আমাদের বাকযন্ত্র তখনও বিকল। ঘনাদাই মৃদু একটু আপত্তির সঙ্গে উদার আত্মত্যাগের দৃষ্টান্ত দেখান, থাক থাক! মাছটা আর তুলে রেখে কী হবে! খেয়ে খারাপ যদি কিছু হবার হয় তো আমারই হোক। আমি থাকতে তোমাদের তো আর বিপদে ফেলতে পারি না?
কিন্তু আমরা সব আর আপনি এক কথা হল! ধনু চৌধুরি ভক্তির পরীক্ষায় আমাদের উপর ট্রিপল প্রমোশন নিয়ে এগিয়ে যায় তো বটেই, সেই সঙ্গে যেভাবে আমাদের দিকে তাকায় তাতে মনে হয় বানর-সেনা হয়ে আমরা যেন স্বয়ং শ্রীরামচন্দ্রকেই খামচে দিয়েছি।
এরপর এসপার-ওসপার একটা কিছু করে ফেলবার গোঁ হয় কি না?
বিশেষ করে সেইদিনকার ওই যজ্ঞনাশের পর।
ধনু চৌধুরি আসবার পর থেকে ঘনাদাকে একবারের জন্যও মুখ খোলাতে তো পারিনি! সেদিন অনেক কষ্টে সলতেটা প্রায় ধরে ধরে হয়েছে। হয়েছে, বাগড়া দিয়ে জলের ছাট দেবার ধনু চৌধুরি তখন আড্ডাঘরে নেই বলে নিশ্চয়।
কিন্তু হায় আমাদের কপাল!
সবে সলতেটা দু-একটা ফুলকি ছাড়ছে, ঠিক সেই সময়েই ধনু চৌধুরির আবির্ভাব। মুখে গভীর বেদনার ছায়া আর হাতে একটা যেন কী?
সেই বস্তুটাই ঘনাদার সামনের সেন্টার টেবিলটায় নামিয়ে রেখে প্রায় বুক-ফাটা গলায় ধনু চৌধুরী বলেছে, দেখেছেন?
আণুবীক্ষণিক কিছু নয়। একটা দেশলাইয়ের বাকস! ঘনাদার সঙ্গে দেখতে আমরাও পেয়েছি। শুধু তার ভিতর এমন শোকাবহ কী আছে বুঝতে পারিনি।
ধনু চৌধুরি আকুল আক্ষেপে সেটা তারপর বুঝিয়ে দিতে দেরি করেনি, আপনার ওপরের ছাদটা একটু দেখতে গেছলাম। ফাটা ছাদ তো মেরামত না করলে নয়, তার ওপর কেউ একটু ঝাঁট দেবার ব্যবস্থা করায় না। আপনার ছাদে এইসব জঞ্জাল জমে থাকে!
জমে আছে তো! তুমি বলে তা-ই দেখলে! ঘনাদা জমে থাকা জঞ্জালটা দু আঙুলে তুলে ঘুরিয়ে দেখতে দেখতে একটি করুণ দীর্ঘনিশ্বাস ছাড়লেন। সেই দীর্ঘনিশ্বাসেই আমাদের ধরে-আসা আশার সলতে নিবে গেল সেদিনকার মতো।
যা হয় হোক, অপারেশন ধনুর্ভঙ্গ আর শুরু না করে পারি! যেমন বেয়াড়া ব্যামো তেমনই কড়া চিকিৎসার একেবারে নিখুঁত আয়োজন সারাদিন ধরে করে রেখেছি সেদিন।
সন্ধেবেলা তাঁর সরোবর-সভা সেরে বাহাত্তর নম্বরে ঢুকতে না ঢুকতেই গন্ধটা নিশ্চয় পেলেন ঘনাদা। সিঁড়ি দিয়ে উঠে আড্ডাঘরে ঢুকে একেবারে চাক্ষুষই পেলেন দেখতে।
চোখ কি তখন তাঁর কপালে উঠেছে? উঠলেও আমরা আর দেখব কী করে! আমরা তখন যে যার প্লেটে দিস্তেখানেক করে হিং-এর কচুরি সামলাতে ব্যস্ত।
বসুন, ঘনাদা, ওরই মধ্যে কোনও রকমে যেন ভদ্রতাটুকু করবার অবসর পেল শিশির।
ঘনাদা বসলেন। জেগে আছেন না স্বপ্ন দেখছেন ঠিক করবার জন্য নিজেকে যদি দুবার চিমটি কেটে থাকেন তাতেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। ঘনাদা বর্তমানে বাহাত্তর নম্বরে তাঁকে বাদ দিয়ে এ-রকম ভোজসভার দৃশ্য সত্যই তো বিশ্বাসের অতীত।
একটু উসখুস করে ঘনাদা জিজ্ঞাসা করলেন, ধনু গেল কোথায়?
ধন? এতক্ষণে আমরা মুখ তুলে চাইবার ফুরসত পেলাম, এইখানেই তো ছিলেন। এ সব বাজারের মাল তাঁর আবার দুচক্ষের বিষ কিনা। তাই হয়তো আপনাকে সাবধান করতে বেরিয়ে গেছেন।
আমাকে সাবধান করতে! ঘনাদার গলার গর্জন না আর্তনাদ বোঝা শক্ত। আমাকে সাবধান কী জন্য!
যে জন্য সাবধান, বনোয়ারি ট্রেতে করে সেই মুহূর্তেই তা চাক্ষুষ এনে হাজির। ট্রে-র ওপর চার চারটি প্লেটে দুটি করে প্রমাণ সাইজের চিংড়ির কাটলেট!
বনোয়ারি অভ্যাস মতো প্রথমেই একটা প্লেট ঘনাদার অর্ধেক বাড়ানো হাতে তুলে দিতে যাচ্ছিল। আমরা হাঁ-হাঁ করে উঠলাম সমস্বরে, আরে করছিস কী? ঘনাদাকে
