আমি না হয় রেফারেন্স ভুল করেছি, আর উনি বুঝি একেবারে ধোয়া তুলসি পাতাটি! গৌর শিশিরকে ভেঙাচ্চে, চেহারা দেখেই উনি চরিত্র গুণে বলে দিতে পারেন! দেখিস বাহাত্তর নম্বরের একেবারে আদর্শ বোর্ডার হবে! কী বিনয়! কী আদবকায়দা দুরস্ত। ঘনাদাকে পর্যন্ত দুদিনে মোহিত করে দিয়েছে। সামলাও এবার তোমার মোহিত মোহনকে!
হ্যাঁ, ওই মোহিত করার জ্বালাতে জ্বলেই নিরুপায় হয়ে নিজেরা খাওয়া-খাওয়ি করে মরছি। সেই সঙ্গে দু-দুবার ঠেকেও কিছু না শিখে সেই পুরনো ভুলটা করার জন্য ধিক্কার দিচ্ছি নিজেদের। সত্যি তিন-তিনবার এমন ভুলটা কী বলে করলাম।
হাঁস খাইয়ে পেটে যে চড়া পড়িয়ে দিয়েছিল সেই বাপি দত্তর কথাটা না হয় ছেড়েই দিলাম। বিশেষণটা তার বুনো হলেও মানুষটা এমনিতে সাদাসিধে আর সরল ছিল একথা মানতেই হবে। জ্বালা যদি সে কিছু দিয়ে থাকে তা হলে পেয়েছে অনেক বেশি।
কিন্তু তারপর সেই ছাতার মালিক সুশীল চাকী! নতুন বোর্ডার নেবার সুখ সে তো হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়ে গেছে!
এই সব নজিরের পর আমাদের মতো ন্যাড়ার আর বেলতলায় যাওয়া উচিত?
তা ছাড়া বোর্ডার নিতে গেলাম কিনা ধনু চৌধুরিকে?
বাহাত্তর নম্বরে আমাদের ভাগীদার নেওয়াটাই আহাম্মুকি হয়েছে একথা স্বীকার করবার পরও অবশ্য আমাদের তরফের কিছু বলার থাকে। চোখে তো আমাদের সেরকম এক্সরে যন্ত্র নেই যে বুকের হাড়-চামড়া কুঁড়ে একেবারে ভেতরের চেহারাটা দেখিয়ে দেবে। ধনু চৌধুরির সার্টিফিকেটগুলো বাইরে থেকে দেখলে তো সবই মিলে যায়। সেই অতি সভ্য-ভব্য ছেলে! সাত চড়ে রা নেই। যেমন আদব কায়দা দুরস্ত তেমনই বিনয়ী। ব্যবহারে একেবারে মোহিত হতে হয়। ঘনাদাকে পর্যন্ত মোহিত করে দিয়েছে!
কিন্তু ওই মোহিত করা যে এমন সর্বনাশা তা কি আগে ভাবতে পেরেছি! গায়ে। যেন বিছুটির জ্বালা ধরিয়ে ছাড়ছে।
ওপর থেকে দোষ ধরবার কিছু নেই। প্রথম দিনই বিকেলে আমাদের আড্ডাঘরে ভক্ত হনুমানটির মতো একটি কোণে এসে বসেছে। আমাদের পাঁচজনের দয়ায় ঘনাদার একটু দর্শন পেয়ে আর বাণী শুনেই যেন ধন্য। তার স্বরূপটির একটু আঁচ পাওয়া গেছে প্লেট সাজানো ট্রে নিয়ে বনোয়ারির ঘরে ঢোকার পরেই।
ঘনাদাকে টোপে ধরবার জন্য সামান্য একটু চায়ের ব্যবস্থা হয়েছিল। প্লেটে একটি করে স্পেশ্যাল কবিরাজি কাটলেট। ঘনাদার প্লেটে অবশ্য দুটো।
প্লেটটা হাতে নিয়ে ঘনাদা যে খুশি হয়েছেন তা তাঁর রসিকতার নমুনা থেকেই বোঝা গেছে।
কবিরাজি কাটলেট বুঝি? তা এক সঙ্গে চরক-সুশ্রুতকেই আমদানি করেছ যে হে।
হ্যাঁ, যথারীতি কৃতার্থ ভঙ্গিতে বলেছি আমরা, স্পেশ্যাল অর্ডার দিয়ে এসেছিলাম সকালে।
তাই নাকি! বলে ঘনাদা সোৎসাহে স্পেশ্যাল কবিরাজির মান রাখতে যাবেন। এমন সময়ে বিনীত গলার কুণ্ঠিত প্রশ্ন আমাদের চমকে দিয়েছে—
ওই কাটলেট কি ওঁর খাওয়া ঠিক হবে?
কাটলেট-এর টুকরো তুলতে গিয়ে ঘনাদার হাতটা মুখের কাছেই থমকে থেমে গেছে। আর আমাদের কপাল, ভুরু কুঁচকে গেছে নিজেদের কানগুলোকে বিশ্বাস করতে না পেরে?
কী বললেন? শিবু বেশ সন্দিগ্ধভাবে ধনু চৌধুরির দিকে চেয়ে জানতে চেয়েছে।
বলছিলাম কী, ধনু চৌধুরি যেন অতি সংকোচের সঙ্গে ভয়ে ভয়ে নিবেদন করেছে, আপনারা নিজেরা যা খান না-খান, বাজারের আজেবাজে জিনিস ওঁর না খাওয়াই ভাল, নয় কি?
বাজারের আজেবাজে জিনিস! গৌরের স্তম্ভিত গলায় কথাগুলো যেন আটকে গেছে, আমাদের পাড়ার কমরেড কেবিনের কবিরাজি কাটলেট আজেবাজে বাজারের জিনিস! আপনি খেয়ে দেখেছেন কখনও?
আজ্ঞে না! সেই বিনয়ে গলে পড়া কিন্তু কিন্তু ভাব—দোকানের ও সব বনস্পতিতে ভাজা জিনিস তো খাই না, দাসবাবুর খাওয়া বোধহয় উচিত নয়!
একে কমরেড কেবিনের কবিরাজি কাটলেটের নামে বনস্পতিতে ভাজার কলঙ্ক। তার ওপর আবার দাসবাবু!
আমাদের মুখে খানিকক্ষণ আর কথা সরেনি! ঘনাদাই অত্যন্ত শঙ্কিত গলায় শুধু আমাদের নয়, বিশ্বসংসারকে যেন প্রশ্ন করছেন, তা হলে কী হবে? এ তো গোলমেলে ব্যাপার দেখছি!
আমরা সভয়ে এবার ঘনাদার প্লেটের দিকে তাকিয়েছি। শেষে তাঁর খাওয়াটাই মাটি হল নাকি এই উজবুকের তোলা ফ্যাকড়ায়?
না, তা হয়নি। ঘনাদা তাঁর প্লেটের দ্বিতীয় কাটলেটটার শেষ টুকরো মুখে দিয়েই তাঁর ও পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে ভাবিত হয়ে উঠেছেন।
অনেক কষ্টে বাকশক্তি ফিরে পেয়ে তাঁকে আমরা এবার আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছি।
গোলমাল আবার কোথায়? শিশির তাঁকে সাহস দিয়েছে।
গোলমাল যদি থাকে তো কারও মাথায় আছে! শিবু তার সন্দেহটা জানিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু ওই যে শুনছি, বনস্পতি না কী? ঘনাদা তাঁর উদ্বেগটা প্রকাশ করেছেন।
শুনলেই হল! আমি ক্ষুব্ধ প্রতিবাদ জানিয়েছি, কাটলেট কীসে ভাজা তা কি কানে শুনে বুঝবেন?
কমরেড কেবিন কোনওদিন ঘি ছাড়া আর কিছু ব্যবহার করে! গৌর জোর গলায় ঘোষণা করেছে।
ঘি-এ ভাজলেই ভাল। আবার সেই মোলায়েম গলার সবিনয় মন্তব্য শোনা গেছে, কিন্তু বাজারের ঘি-ও ভেজাল কিনা।
ঠিকই বলেছ! ঘনাদা চিন্তিতভাবে বনোয়ারির নিয়ে আসা চায়ের পেয়ালায় চুমুক দিতে দিতে বলছেন, খাঁটি বলে কিছু কি আর আছে! যা তা খেয়ে বেশ একটু ভাবনাই হচ্ছে তাই।
ঘনাদার ভাবনা সামলাতে হজমি-গুলি, চূরণ-জোয়ানের আরক সমেত অনেক কিছুরই ব্যবস্থা করতে হয়েছে। তাতেও আমাদের আসর কিন্তু আর জমানো যায়নি।
