আজ্ঞে ঠিকই বলেছেন, আমার কথার পর ককিয়ে উঠল মাৎসুয়ো। ওই বুফো ম্যারিনাস-ই সব সর্বনাশের মূল জানবার পর আমি আমার সমস্ত লোকজন নিয়ে দ্বীপ থেকে তাদের নির্মূল করবার আয়োজন করেছি। কিন্তু অমন করে মেরে কটাকে শেষ করা যায়। বছরে চল্লিশ হাজার যারা ডিম পাড়ে, তাদের একশোটা যখন মারি তখন হাজারটা নতুন করে জন্মায়। নিরুপায় হয়ে আমি টোঙ্গা সামোয়া থেকে ভাড়া করা ধাঙড় আনালাম। একটা বুফো মারলে দশ টাকা। কিন্তু তাতেও রক্তবীজের ঝাড় বেড়েই যাচ্ছে। একেবারে হতাশ হয়ে শেষ পর্যন্ত আপনার খোঁজেই এসেছি, এ অভিশাপ কাটাবার উপায় কিছু আছে কি না জানতে। তা যদি না থাকে তো লিমুতে আর ফিরব না। একেবারে নিরুদ্দেশ হয়ে যাব।
নিরুদ্দেশ তোমায় হতে হবে না, মাৎসুয়ো! একটু সান্ত্বনা দিয়ে এবার বললাম, এ সমস্যা তোমার শুধু ওই লিমু দ্বীপের নয়! অস্ট্রেলিয়ার মতো বিরাট দেশও আজ এই সমস্যা নিয়ে দিশাহারা। তবে হতাশ হয়ো না। উপায় আছে। একমাত্র গান দিয়েই তোমার লিমুকে এখন বাঁচানো যায়।
গান! আমাদের চোখই ছানাবড়া—গান দিয়ে লিমুকে বাঁচাবেন!
হ্যাঁ, মাৎসুয়ো-ও ওই প্রশ্ন করেছিল, অবোধকে বোঝাবার হাসি হাসলেন ঘনাদা, তাকে তাই বলতে হল যে ওষুধপত্র গুলিবারুদ কোনও কিছুতে কিছু হবে। বুফো ম্যারিনাস-এর সমস্যার ফয়সালা যদি কিছুতে হয় তো গানে-ই হবে। চৌরঙ্গির একটা বড় রেডিও গ্রামোফোন ইত্যাদির দোকানে তাকে নিয়ে গিয়ে টেপ রেকর্ডে খানিকটা গান তুলে দিয়ে বললাম, যেটুকু মনে আছে তাতে এই টেপটুকু যেমনভাবে বলে দিচ্ছি সেইভাবে বাজালেই কাজ হাসিল হবে বলে বিশ্বাস। নির্দেশগুলো তারপর একটু ভাল করে বুঝিয়ে দিয়ে চলে এসেছি। মাৎসুয়ো কৃতজ্ঞতায় গদগদ হয়ে আজ-কালের মধ্যেই লিমুর জন্য রওনা হবে। সুতরাং আর কোনও উপদ্রবের ভয় নেই।
তা তো নেই, কিন্তু বুফো ম্যারিনাস কী বস্তু আর আপনি সব সংকট-মোচন যে টেপটা তাকে দিলেন সেটি কীরকম গানের?
বুফো ম্যারিনাস হল এক জাতের কোলা ব্যাঙ। ঘনাদা সদয় হয়েই আমাদের বোঝালেন, আদি জন্ম দক্ষিণ আমেরিকায়। সেখান থেকে হাওয়াই ঘুরে অস্ট্রেলিয়ায় আমদানি হয়েই সর্বনাশ করতে শুরু করেছে। টেপে তুলে যে গানটা মাৎসুয়োকে দিলাম সেটা এই ব্যাঙ বাবাজি বুফো ম্যারিনাস-এরই বিয়ের গান বলতে পারো। মদ্দা ব্যাঙ গলা ফুলিয়ে এই গান গাইলে তার টানে দলে দলে কনে ব্যাঙেরা সব হাজির হয়। সুবিধে-মতো জায়গায় এ গান বাজিয়ে তাই চল্লিশ হাজারি ডিমের ব্যাঙবউদের ধরে কোতল করা যায়। কিছু দিন একাজ করতে পারলেই বুফো ম্যারিনাস-এর বংশ সব নির্বংশ।
কিন্তু ওই কোলা ব্যাঙের বিয়ের গান আপনি গাইলেন কী করে?
ঠিক কি আর গাইতে পেরেছি! ঘনাদা বিনয় দেখালেন, তবে দক্ষিণ আমেরিকায় ঘোরবার সময় বনে বাদাড়ে শুনে যেটুকু মনে ছিল তাই একটু গেয়ে দিয়েছি। ওতেই অবশ্য কাজ যা হবার হবে। ব্যাঙবরেরাও সবাই নিশ্চয় কালোয়াত নয়।
কিন্তু, আমাদের প্রশ্ন তখনও শেষ হয়নি, আপনার ওই মাৎসুয়ো আপনার ওপর অত ভক্তিমান হয়ে উঠবার পরও অমন ভয় দেখানো কার্ড পাঠাচ্ছিল কেন?
ওটা ভয়ে! ভয়ে! ঘনাদা যেন স্নেহের প্রশ্রয়ের হাসি হাসলেন, প্রথমেই সোজাসুজি আমার কাছে আসতে সাহস করেনি। তাই আগেকার ধরনটাই রেখে তারই ভেতর আমায় পরীক্ষা করে দেখবার কায়দা করেছিল। আমি অবশ্য গোড়াতেই কার্ডগুলো দেখেই বুঝেছিলাম। ওতে ছবিগুলো ভয়ের, কিন্তু সেই সঙ্গে মাৎসুয়োর নামটাও, জাপানি গুপ্ত হরফে লেখা।
তাই লেখা নাকি!
আমরা পরস্পরের মুখের দিকে চেয়ে বেশ একটু ঘুরপাক খাওয়া মাথা নিয়েই নীচে নেমে গিয়েছি এরপর। এ অবস্থায় শিশিরের সিগারেটের গোটা টিন-টাই ফেলে আসা খুব স্বাভাবিক নয় কি?
শেষ চমকটা অবশ্য তখনও বাকি ছিল।
বড় রাস্তায় চায়ের দোকানে গিয়েই সেটা পেলাম। সেখানকার চা-পরিবেশনের ছোকরাকে সেদিন থেকে আর রাত্রে কড়া না নাড়বার কথা জানাতে গেছলাম। তার দরকার হল না।
আমাদের দেখেই একটু বিষণ্ণ মুখে বেরিয়ে এসে সে বললে, আজ থেকে আর মাঝরাত্রে কড়া নাড়তে হবে না তো বাবু!
না, হবে না। কিন্তু তোমায় বললে কে?
আজ্ঞে, ওই আপনাদের বড়বাবু! কাল বিকেলে আর ক-দিন একাজ করতে হবে জানতে যাচ্ছিলাম। উনি তখন বেড়াতে বার হচ্ছেন। ওঁকেই জিজ্ঞাসা করতে জানিয়ে দিলেন যে আজ থেকে কড়া নাড়া বন্ধ।
সকালে একবারের বেশি চা আমরা কেউ খাই না। কিন্তু এরপর ওইখানেই বসে পড়ে পর পর কড়া করে দুকাপ না গলায় ঢেলে আর উঠতে পারলাম না।
ঘনাদার ধনুর্ভঙ্গ
আবার সেই ভুল।
আর সেই ভুলেই বুঝি বাহাত্তর নম্বরের বারোটা বেজে যায়!
সবাই তখন আফশোসে হাত কামড়াচ্ছি আর গালাগাল দিচ্ছি পরস্পরকে!
সব দোষ তো এই আহাম্মকের! শিবু আমার ওপরই গায়ের ঝাল ঝাড়ছে, মেসের খরচার দিকটাও তো ভাবতে হবে বলেছিলেন। ভাবো এখন খরচার দিক। বাহাত্তর নম্বরই যে এখন খরচার খাতায়!
আর তুমি! আমিও পালটা ঘা দিতে ছাড়ছি না, সুপারিশটা কে করেছিল? তুমি? না, না খুব ভাল ছেলে! সাত চড়ে রা নেই। শুধু পড়াশুনা নিয়েই নাকি রাতদিন থাকবে। আমরা টেরই পাব না কেউ আছে! কেমন? টের কি এখনও পাওয়া যাচ্ছে!
শিবুকে দুষে কী হবে! শিশির শিবুর পক্ষ নিচ্ছে, আসল আসামি তো গৌর। শিবু তো ওর গ্রামোফোন ছাড়া কিছু নয়। গৌর যা গায় তাই ও বাজায়! গৌরই তো খবর এনেছে প্রথম। ওঁর মোহনবাগানের সি-টিমের কোন হবু প্লেয়ারের মাসির সইয়ের বকুল ফুলের ভাগনে না ভাইপো শুনেই উনি গদগদ হয়ে লাইন ক্লিয়ার লিখে দিয়েছেন।
