না, তুমিই আমার একমাত্র শত্রু। সে দাঁতে দাঁত চেপে সাপের মতো হিসহিসিয়ে উঠল, ইয়ামাদোর সঙ্গে মিলে তুমি আমার কী সর্বনাশ করেছ জানো না।
ও, তুমি তাহলে মাৎসুয়ো! লিমু দ্বীপের মালিক! এতক্ষণে অন্ধকারে আলো দেখতে পেলাম, কিন্তু তোমায় তো আমি কখনও চোখেও দেখিনি, তোমার লিমুতেও কখনও পা দিইনি।
তা দিলে তো তোমায় কুচি কুচি করে কেটে হাঙরদের খাওয়াতাম! মাৎসুয়ো যেন মুখ দিয়ে আগুনের হলকা ছাড়ল, তুমি লিমুতে আসোনি, কিন্তু ইয়ামাদোর হয়ে তার নিফা থেকে কী বিষ মন্তর ঝেড়ে আমার সোনার লিমু ছারখার করে দিয়েছ, জানো! আমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম আর ইয়ামাদো তো নেহাত চাষার ছেলে। আমি বিজ্ঞানের সাহায্য নিয়ে আমার লিমুকে মর্তের স্বর্গ বানিয়ে তুলেছিলাম। সেই স্বর্গ তুমি শ্মশান করে দিয়েছ।
তুমি বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলে! একটু হেসেই বললাম, হ্যাঁ, ইয়ামাদোর অনুরোধে একবার তার দ্বীপে বেড়াতে গিয়ে তোমার সঙ্গে তার রেষারেষির কথা শুনেছিলাম বটে। তোমার নামটাও সেই সময়ে শুনি আর তুমি যে তোমার লিমুকে নন্দন কানন বানাবার জন্য যা কিছু সম্ভব বিজ্ঞানের সাহায্য নিচ্ছ সে খবরও পাই। তখনই তোমার সম্বন্ধে তোমাদেরই একটা জাপানি প্রবাদ আমার মনে এসেছিল রঙ্গো ইয়োমি নো রঙ্গো শিরজু! এখন আমার বিরুদ্ধে তোমার আক্রোশের কারণ শুনেও সেই প্রবাদই আবার শোনাচ্ছি–রঙ্গো ইয়োমি নো রঙ্গো শিরজু।
তখন তুষার পাহাড়ের ঢাল থেকে নীচের বসতিতে পৌঁছে গেছি। সেখানে অ্যাম্বুলেন্স গাড়িতে তুলে মাৎসুয়োকে হাসপাতালে ভর্তি করবার ব্যবস্থা করলাম। তার জন্য যাই করি, মাৎসুয়ো কিন্তু তখনও আমার ওপর সমান খাপ্পা। তার ক্যাবিন থেকে বিদায় নিয়ে চলে আসবার সময় গলায় যেন বিষ ঢেলে বললে, পা খোঁড়া হয়েছে বলে তুমি আমার হাত থেকে পরিত্রাণ পাবে ভেবেছ! আমি অর্ধেক পৃথিবী ঘুরে হোক্কাইদোর স্কি ঘাঁটিতে যেমন তোমায় খুঁজে বার করেছি তেমনই যেখানেই যাও তোমার নিশ্চিত শমন হয়ে দেখা দেবই এই কথাটি মনে রেখো।
আমি তাহলে তোমাদের প্রবাদটাই এবার আমার বাংলা ভাষায় বলি, মাৎসুয়ো। বেশ একটু গম্ভীর হয়েই বললাম, তোমার বেদ মুখস্থ, কিন্তু বুদ্ধি ড়ু টু। তোমার নিজের সর্বনাশ তুমি নিজেই করেছ এইটুকু শুধু বলে যাচ্ছি। আর কথাটা যদি ধাঁধা মনে হয় তাহলে তার উত্তর বার করবার জন্যে ক-টা ইশারাও দিয়ে যাচ্ছি—তোমার আখের খেত, বুফো ম্যারিনাস আর বছরে চল্লিশ হাজার।
এই বলেই চলে এসেছিলাম হোক্কাইদো থেকে। তারপর এতকাল বাদে গড়িয়াহাট মোড়ে কাল বিকেলে আবার দেখা। না, সে মাৎসুয়ো আর নেই। ভাবনায় চিন্তায় দুনিয়াভর টহলদারির ধকলে পাকা আম থেকে শুকিয়ে আমসি হয়ে গেছে। সে খ্যাপা নেকড়েও এখন একেবারে পোষা খরগোশ। আমায় দেখে রাস্তার ওপরই পায়ের ধুলো নেয় আর কী!
পায়ের ধুলো! মুখ দিয়ে কথাটা বেরিয়ে গেল, জাপানিরা আজকাল আবার পায়ের ধুলো নিতে শিখেছে নাকি।
আহা, মাৎসুয়ো আর কি জাপানি আছে নাকি! ঘনাদা ঝটপট সামলে নিলেন, এবাংলায় ও বাংলায় আমায় খুঁজতে খুঁজতে আধা নয়, চৌদ্দ আনাই বাঙালি হয়ে গেছে। এই তোমাদের মতোই প্রায় চেহারা।
ঘনাদা আমাদের চেহারাগুলো একবার যেন চেক করে নিয়ে আবার শুরু করলেন, আফশোসেরও তার সীমা নেই, আমাকে মিছিমিছি শত্রু না মনে করলে কত আগেই তার সব মুশকিল আসান হয়ে যেত সেই কথা ভেবেই তার বেশি দুঃখ। আমি যে তিনটে ইশারা দিয়েছিলাম তাই থেকেই সে তার লিমু দ্বীপের অভিশাপের রহস্য বার করে ফেলে। কিন্তু তার নিজের অতি বুদ্ধির প্যাঁচই এখন তার নাগপাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বলতে বলতে মাৎসুয়ো রাস্তায় দাঁড়িয়েই হাঁফাচ্ছিল। চিনে হলে হবে না, জাপানি রেস্তোরাঁই বা কোথায় পাব। সামনে যে ময়রার দোকান পেলাম তাতেই নিয়ে গিয়ে বেশ একটু ভাল করে মাৎসুয়ো-কে কচুরি শিঙাড়া খাইয়ে চাঙ্গা করে তুললাম।
ঘনাদা থামলেন। ইঙ্গিতটাও মাঠে মারা গেল না। আমরাও বুঝলাম। বাহাত্তর নম্বর থেকে ঠাঁই বদল যখন হবেই না তখন মিছে আর মেজাজ বিগড়ে থেকে লাভ কী! আমাদের দিক দিয়ে অনুষ্ঠানের ত্রুটি যাতে না থাকে শিশির তাই চট করে একবার নীচে থেকে ঘুরে এল। তারপর চ্যাঙাড়ি ভর্তি কচুরি শিঙাড়া তো এলই, টিন ভর্তি সিগারেটও।
ঘনাদা কেমন অন্যমনস্কভাবে গোটা কৌটোটাই হাতাবার সঙ্গে সঙ্গেই অর্ধেক চ্যাঙাড়ি ফাঁক করে যেন মাৎসুয়োর খিদের বহরটাই আমাদের বুঝিয়ে দিলেন। তারপর শিস-দেওয়া কৌটো খুলে শিশিরকে উদার হয়ে একটা বিলিয়ে আর নিজে একটা ধরিয়ে রামটান দিয়ে নতুন করে শুরু করলেন, হ্যাঁ, মাৎসুয়োর দুঃখের কাহিনী শুনে এবার বলতেই হল, আসলে ওই বুফো ম্যারিনাসই যে তোমার লিমু দ্বীপের কাল তা এখন বুঝেছ তো? ইয়ামাদোর নিফা দ্বীপে অতিথি হবার সময়েই আখের খেতের নারকুলে পোকা মারতে তোমার এই বুফো ম্যারিনাস আমদানির কথা শুনে আমি রঙ্গো ইয়োমি নো রঙ্গো শিরজু বলে তোমাদের প্রবাদটা আওড়েছিলাম। সত্যিই এটা পুকুরের বোয়াল মারতে খাল কেটে কুমির আনার শামিল আর বেদ মুখস্থ বুদ্ধি ড়ু টু-র দৃষ্টান্ত। বিজ্ঞানের সাহায্য নিতে গিয়ে তুমি মূর্থের মতো বেয়াকুবি-ই করেছ। তোমার আমদানি করা বুফো ম্যারিনাস এসে প্রথমে আখের খেতের সব পোকা ঠিকই সাবাড় করেছে, তারপর হয়ে উঠেছে রূপকথার সেই অজর অমর রাক্ষুসির পাল। রক্তবীজের মতো দিন দিন বেড়ে এরা তোমার গোটা লিমু দ্বীপটাকেই পেটে পুরতে চলেছে। লম্বায় এরা আধ হাতেরও ওপরে, ওজনে কম-সে কম সওয়া কিলো। ভাল মন্দ সব পোকামাকড় শেষ করেও এদের খিদে মেটে না, খাবার মতো সাপ ব্যাঙ যা পায় এরা অম্লান বদনে গিলে ফেলে। এদের গায়ের গ্রন্থির এক রকম রসে কুকুর বেড়াল মারা যায় আর বছরে প্রায় চল্লিশ হাজার গুণ বেড়ে এরা যেখানে থাকে সেই জায়গাই শ্মশান করে তোলে।
