দুজনের বন্ধুত্বে সেইখানেই দাঁড়ি। নিজের নিজের দ্বীপকে একেবারে অতুলনীয় স্বর্গ বানিয়ে ফেলার রেষারেষিতে দুজনেই যেন দুজনের মাথা নিতেও পেছপাও নয়।
ঠিক সেই সময় আমার সঙ্গে মাৎসুয়োর দেখা। দেখা না বলে ঠোকাঠুকিই বলা উচিত। জাপানের হোক্কাইদো দ্বীপের পাহাড়ে তুষার-ঢাল দিয়ে সে রাত্রে মশাল হাতে নিয়ে আমি কি করে নামছি।
কী করে নামছেন? শিবুর প্রশ্নটার ধরনে ভক্তিভাবের একটু যেন অভাব মনে হল।
স্কি করে, ঘনাদা প্রশান্তভাবেই বলে চললেন, রাত্তিরে মশাল নিয়ে স্কি করায় একটা আলাদা উত্তেজনা আছে। জাপানে মশাল নিয়ে স্কি করায় তাই খুব উৎসাহ। তবে দক্ষিণের সব স্কি-ঘাঁটিতে এ খেলা চললেও ঢাল একটু বেশি আর বিপজ্জনক বলে হোক্কাইদোতে মশাল নিয়ে স্কি কেউ বড় করে না।
মশাল নিয়ে মনের আনন্দে নামতে নামতে সেই জন্যই বেশ একটু অবাক হচ্ছিলাম কিছুক্ষণ থেকে। আমার পেছনে মশাল নিয়ে আর-একজন কে যেন নেমে আসছে। আর নামছে রীতিমতো বেগে। হোক্কাইদোর তুষার পাহাড়ের ঢাল রাত্তিরবেলা একেবারে নির্জন। অন্য কোথাও হলে এক আধজন স্কিয়ার তবু দেখা যায়। এখানে ওপরের লজ কেবিন পর্যন্ত বন্ধ। স্কিলিফট নেই বলে আমি সিঁড়ি-পা ফেলে ফেলে পাহাড়ের মাথায় উঠেছি। আমার মতো এই রাত্রে স্কি করবার বেয়াড়া শখ আবার কার!
কিন্তু শখই শুধু বেয়াড়া নয়, লোকটা যে একেবারে রাম আনাড়ি মনে হচ্ছে। নামছে একেবারে পাগলা ঘোড়ার মতো, কিন্তু কোথায় নামছে তার যেন ঠিক নেই। এত চওড়া তুষার ঢাল পড়ে থাকতে আমারই ঘাড়ের ওপর পড়তে যাচ্ছে যে!
গোঁয়ার্তুমি করে এই রাত্রে স্কি করতে নেমে এখন তাল সামলাতে পারছে না নাকি? সত্যিই পেছন থেকে ঘাড়ের ওপর এসে পড়লে তো সর্বনাশ। দুজনের শরীর স্কি আর চাকা লাঠিতে জড়াজড়ি হয়ে গড়াতে গড়াতে একেবারে গুঁড়ো হয়ে যাব যে!
এ বিপদ এড়াবার জন্যে যা যা সম্ভব সবই করলাম। প্রথম স্টেম বোগেন নিলাম।
কী নিলেন! স্টেনগান? আমাদের হাঁ করা মুখের প্রশ্ন—গুলি করবার জন্য?
না, স্টেন গান নয়, স্টেম বোগেন! ঘনাদা অনুকম্পার হাসি হাসলেন একটু ওটা হল স্কি করার সময় এক রকম বাঁক নেওয়া। মোঙ্গল আর ল্যাপদের কাছে। বিদ্যেটা শিখলেও নরওয়ে-সুইডেনই প্রথম স্কি-টা ইউরোপে চালু করে বলে শব্দটা স্ক্যান্ডিনেভিয়ান।
আমাদের জ্ঞান দিয়ে ঘনাদা আবার তাঁর বিবরণ শুরু করলেন—স্টেম বোগেন-এ খুব সুবিধা হল না। লোকটার আমার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়াই যেন নিয়তি।
কিন্তু সত্যি কি তাই?
স্টেম বোগেন-এর পর স্টেম ক্রিস্টিয়ানা বাঁক নিলাম, কিন্তু লোকটা তখনও যেন আঠার মতো পেছনে লেগে আছে। যে রকম আনাড়ি তাকে ভেবেছিলাম তা-ও তো সে নয়। শক্ত শক্ত উত্রাই-এর ঢাল আর বাঁক বেশ ভালই সামলাচ্ছে। মরিয়া হয়ে নামছে বলে প্রায় ধরেও ফেলেছে আমায়।
তাহলে আমায় জেনেশুনে জখম কি খতম করা কি তার মতলব? কেন? লোকটাই বা কে?
এ সব প্রশ্নের জবাব ভাববার তখন সময় নেই, যেমন করে হোক লোকটার মতলব ভেস্তে দিতে হবে।
তা-ই দিলাম। পর পর দুটো স্টেম বোগেন আর স্টেম ক্রিস্টিয়ানা বাঁক নিয়ে তাকে ঝেড়ে ফেলতে না পেরে ওই শক্ত তুষারেই নরম তুষারের সুইস টেলেমার্ক বাঁক নিয়ে ঘুরেই লাঙ্গল-পা করে থেমে গেলাম।
লোকটা আমার একেবারে গা ঘেঁসে ছিটকে গিয়ে খানিক দূরে ঘাড়মুড়ো গুঁজে পড়ল।
ভাবলাম ঘাড় ভেঙে শেষই হয়ে গেল বুঝি। কিন্তু তা হয়নি। খুব কড়া জান। হাড়গোড় ভাঙা নয়, একটা পা মচকানোর ওপর দিয়েই ফাঁড়াটা গেছে।
ধরেটরে কোনও রকমে তুললাম। এখন তাকে নীচে নিয়ে যাওয়াই সমস্যা।
কিন্তু নিয়ে যাব কাকে? খোঁড়া হয়েও লোকটার কী রোখ! আর আমারই ওপরে।
জাপানিতে সে যা বললে বাংলার চেয়ে হিন্দিতে বললেই তার ঝাঁঝটা বুঝি একটু ভাল বোঝানো যায়।
তাকে ধরে তোলবার আগে থেকেই সে আমার ওপর তম্বি শুরু করেছে। তুমকো হাম খুন করেঙ্গে, মারকে কুত্তাকো খিলায়েঙ্গে—এই হল তার বুলি।
ব্যাপারটা কী? লোকটা পাগল-টাগল নাকি!
না, তা তো নয়। মশালটা ভাল করে মুখের কাছে ধরতে মুখটা চেনাচেনাই লাগল। সঠিক মনে পড়ল তার পরেই।
হ্যাঁ, টোকিওর উয়েনো স্টেশন থেকে রওনা হবার সময় ছুটির দিন পড়ায় স্কিয়ারদের দারুণ ভিড় হয়েছিল। কলেজের ছেলেমেয়ে আর কমবয়সি চাকরেদের ভিড়ই বেশি। স্কি নিয়ে তারা সবাই জাপানের কোনও-না-কোনও স্কি রিসর্ট-এ যাচ্ছে। ট্রেন আসবার পর ঠেলাঠেলি করে ওঠবার সময় কে যেন পেছন থেকে আমায় টেনে চলন্ত গাড়ি থেকে ফেলে দেবার চেষ্টা করেছিল। তখুনি ফিরে চেয়ে হাতেনাতে কাউকে ধরতে পারিনি, কিন্তু এই মুখটাই যেন তার ভেতর দেখেছিলাম মনে হচ্ছে।
শুধু উয়েনো স্টেশনে কেন, তার আগে আরও দু-তিন জায়গায় এই মুখটা দেখেছি বলে মনে পড়ল। লোকটা যেন বেশ কিছুকাল ধরে আমার পিছু নিয়েছে। কেন?
দুটো স্কিকে জুড়ে একটা স্ট্রেচার গোছের বানিয়ে তার ওপর লোকটাকে শোওয়াবার ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করে ফেলেছি। সেই অবস্থায় তাকে তুষারের ওপর দিয়ে টেনে টেনে নিয়ে যেতে যেতে সেই কথাই জিজ্ঞাসা করলাম—কে তুমি? আমার পিছু নিয়েছ কেন?
ওই অবস্থাতেই লোকটা গজরে উঠল, তোমায় খুন করবার জন্য!
বেশ সাধু উদ্দেশ্য! হেসে বললাম, কিন্তু খুন করাই যদি তোমার নেশা হয় এই মহৎ কাজটার জন্য আমার চেহারাটাই পছন্দ হল কেন! এ পৃথিবীতে তো শুনি তিনশো কোটি মানুষ গিজ গিজ করছে। তাদের কাউকে মনে ধরল না!
